বাংলাদেশ এখন প্রযুক্তির এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হাতে স্মার্টফোন, সামনে ইন্টারনেট আর এক ক্লিকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, অফিস-আদালতের কর্মচারী থেকে ফ্রিল্যান্সার সবাই কোনো না কোনোভাবে এর সুবিধা নিচ্ছেন। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে অনেকেই মেশিন লার্নিং সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছাড়াই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। যার ক্ষতিকর দিক কেউ জানছেন না, বুঝছেন না। নিজের অজান্তেই নিজেকে অতল গহ্বরে তলিয়ে ফেলছেন। যদিও প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা অনেক বড় বিষয়গুলো সহজ সমাধান করছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। গ্রামাঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও এখন ঘরে বসেই এআইয়ের কল্যাণে বিশ্বমানের তথ্য পেতে পারছে।
একসময় যে জ্ঞান শুধু শহরের গ্রন্থাগারে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন হাতের মুঠোয়। এটি নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির বড় অর্জন। তবে যেকোনো কিছুর ভালো দিকের সঙ্গে সঙ্গে কিছু খারাপ দিকও থাকে। আর আমাদের ব্যবহার সচেতন এবং ভবিষ্যৎ ভাবনায় না হলে তা আমাদেরই ক্ষতি করে। যেমনটা করছে এআই। এআই কয়েক সেকেন্ডের ভেতর পরিপাটিভাবে যেকোনো কিছুর সমাধান কর দিতে পারে। কিন্তু পরিপাটি হওয়া আর গভীর হওয়া এক জিনিস নয়।
যন্ত্র তথ্য সাজাতে পারে, কিন্তু জীবনযাপনের ঘ্রাণ, অভিজ্ঞতার উত্তাপ, সামাজিক বাস্তবতার ব্যথাÑএসব মানুষের ভেতর থেকে আসে। আর এখন অত্যধিক মানুষ এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে হতে ক্রমে ক্রমে তাদের সৃজনশীলতার ভেতর থেকে এই গুণাবলিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ দিনের নির্দেশ করছে। মেশিন লার্নিং যেমন জীবন সহজ করছে, অন্যদিকে মানুষের কল্পনাশক্তি ও নিজস্ব চিন্তার চর্চা কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে। মানুষের কল্পনা শক্তি এবং নিজস্ব চিন্তার চর্চা যদি কমে যায়, তাহলে মানুষ আর মানুষ থাকে না বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। মানুষ তার দীপ্ত বুদ্ধির জন্যই সৃষ্টির সেরা জীব। চিন্তার স্বাধীনতা এবং মনের গভীরে থাকা কল্পনা জগৎকে প্রকাশ করা শুধু মতপ্রকাশের অধিকার নয়; এটি নিজের যুক্তি গড়ে তোলার ক্ষমতা। নিজস্বত্ব প্রকাশ করার মাধ্যম। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা তার নিজের যুক্তি বুদ্ধি জ্ঞান এবং কর্মতৎপরতায়। যদি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যন্ত্রের কাছে খুঁজে নেই এবং সেটাই জীবনে প্রয়োগ করি, তাহলে পৃথিবীতে বসবাসরত প্রত্যেকের সমাধান তো একই হবে। তাহলে নিজস্বতা হারিয়ে গেল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো এআই মূলত বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে উত্তর দেয়। কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে সমাধান চাইলেন, এটি একটি প্রস্তাব দিল। কিন্তু সেই সমাধান আপনার বাস্তব পরিস্থিতির জন্য যথাযথ কি নাÑতা যাচাই না করে অনুসরণ করলে ঝুঁকি থেকেই যায়। বিশেষ করে, স্বাস্থ্য, আইনি বা বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক হতে পারে। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব মানুষেরই। মূলত মানুষ হিসেবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে, তবে মাথায় রাখতে হবে প্রযুক্তি যেন মানুষকে ব্যবহার করতে না পারে। যদি কোনোভাবে প্রযুক্তি মানুষকে ব্যবহার করা শুরু করে, তাহলে মানুষ তার স্বাধীনতা নিজের হাতে হারাবে, যা কখনোই কাম্য নয়। পাশাপাশি এআইয়ের কারণে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এআই বিভিন্ন ছবি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে সেগুলো ব্ল্যাকসাইডে কিংবা অনৈতিকভাবে বিক্রি করে দেয়। কী ভয়াবহ বিষয়! মানুষ এআইয়ের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, মানুষ তার নিজের অজান্তেই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজের তথ্য শেয়ার করছে। যার ফলে স্বর সাইবার অপরাধ ও ডেটা হ্যাকিংয়ের ঘটনা বাড়ছে। ব্যক্তিগত তথ্য ভুল হাতে পড়লে তা সামাজিক ও আর্থিক উভয় ক্ষেত্রেই হুমকি তৈরি করছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাই সচেতনতার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আর একটা বিষয় হলোÑপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অনেকেরই এখন বর্তমান মতামত হয়ে গেছে যে দ্রুত হতে হবে। এই দ্রুত করতে গিয়েই মানুষ এআইয়ের জালে ফেঁসে যাচ্ছে। বরং আমাদের মনে রাখা উচিত, অধ্যবসায়, নিজস্বতা, মৌলিকতা এবং ইউনিকভাবে ভাবতে পাড়ার এবং কাজ করতে পারার সক্ষমতায় সমাধান এবং সফলতা এনে দেয়। দ্রুততা সাময়িক কাজ সামলে নিলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এআই আমাদের সহায়ক প্রযুক্তি। এটি জ্ঞান অর্জন, গবেষণা ও সৃজনশীলতাকে সহায়তা করে। কিন্তু নিজের মেধা ও বিচারবুদ্ধি ছাড়া এর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা আমাদের মানব জাতিটাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই সব তথ্য যাচাই করে বিশ্বাস করা, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া, এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে নয়, এআইয়ের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে কিন্তু নিজের জীবনের সব সমস্যা সমাধান কিংবা সবকিছুর ওপরে নিজের আয়ত্ত এবং নিজস্বতা রাখা এবং ব্যক্তিগত গোপন তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হবে। আজকে তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আর তরুণ প্রজন্মই প্রযুক্তি গ্রহণে সবচেয়ে এগিয়ে। তরুণ প্রজন্মের এই প্রযুক্তির ব্যবহারকে ইতিবাচক পথে ব্যবহার করতে হবে। এআইকে শিক্ষার সহায়ক বানাতে হবে, বিকল্প নয়। লেখালেখিতে দিকনির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু নিজের ভাষা ও ভাবনার চর্চা থামানো যাবে না। নিজস্ব চিন্তা এবং বুদ্ধির প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।
আমরা এআই ব্যবহার করব, কিন্তু এআই যেন আমাদের ব্যবহার না করে। প্রযুক্তি আমাদের হাতিয়ার, আমাদের প্রভু নয়। চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু প্রযুক্তিকে সন্দেহ করা নয়, বরং নিজেকে সক্রিয় রাখা, প্রশ্ন করা, যাচাই করা এবং মানবিক বোধকে অটুট রাখা। যে সমাজ নিজের মেধাকে গুরুত্ব দেয়, সেই সমাজই টিকে থাকে। সেই সমাজেই পৃথিবীতে রাজত্ব করে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানবিক বুদ্ধিমত্তাকে জাগ্রত রাখা। তবেই একদিন আজকে তরুণ প্রজন্ম তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি এবং কর্মদক্ষতায় পৃথিবী রাজত্ব করবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর