হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব

হরমুজ প্রণালি সংকট

ব্রি. জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

পারস্য উপসাগর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক সংকটকেন্দ্রগুলোর একটি। এখানে যেকোনো সংঘাতের প্রভাব হবে বৈশ্বিক। হরমুজ প্রণালি শুধু একটি জলপথ নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন—সামরিক অবরোধ, হামলা, বা উত্তেজনা বৃদ্ধি—সরাসরি প্রভাব ফেলে বৈশ্বিক তেলের দাম, জাহাজ চলাচলের খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায়।

সংঘাত থেকে বহু দূরে থাকা দেশগুলোও যেমন বাংলাদেশ, এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে আঘাত হানে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যা মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।

ফলে এই প্রণালি শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। ইতিহাসে বহুবার এই পথকে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’-এ এই অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা।

বর্তমান সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং প্রণালিটির আংশিক বা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক ধাক্কা দিয়েছে। তেলের সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এক ধরনের ‘শক ওয়েভ’ হিসেবে সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষি খাতে সার ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ বেড়েছে।

এর ফলে খাদ্যদ্রব্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি তীব্রতর হয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর মতো জটিল সংকটে পড়তে পারে, যেখানে একদিকে প্রবৃদ্ধি কমে যায়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়তেই থাকে। এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, বাণিজ্য এবং আর্থিক বাজারের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। যেহেতু বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়, তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ কৌশলগত পথ অচল হয়ে গেলে তার প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী অনুভূত হয়। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পণ্য পরিবহন বিলম্বিত হচ্ছে, বীমা খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে উন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশ—সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইরানের ক্ষেত্রেও এই সংঘাত দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। একদিকে যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা একটি কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছে। অর্থাৎ, এই প্রণালি ইরানের জন্য একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও কাজ করছে, যা দিয়ে তারা বিশ্ব শক্তিগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে বারবার নাড়া দিয়েছে।

১৯৭৩ সালের আরব তেল নিষেধাজ্ঞা, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব এবং ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ—প্রতিটি ঘটনাই তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় একটি নতুন অধ্যায়, তবে এর জটিলতা আরো বেশি, কারণ আজকের বিশ্ব অর্থনীতি অনেক বেশি আন্তঃনির্ভরশীল।

যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো একে অন্যকে ‘ইউটিলিটি স্থাপনা ধ্বংস’ বা ‘সামরিক ঘাঁটি আক্রমণ’ করার হুমকি দেয়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এটি যুদ্ধের চরম ভয়াবহতার ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির প্রতি-উত্তরে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং সৌদি আরবসহ গোটা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

এই ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র। যুদ্ধ আর শুধু সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; ‘ইউটিলিটি স্থাপনা’ বলতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি ও তেল শোধনাগার, বন্দর, যোগাযোগ অবকাঠামো, যা সরাসরি বেসামরিক জীবনের সঙ্গে জড়িত—এসবকেই বোঝায়। এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত মানে মানবিক বিপর্যয়, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ধ্বংস। প্রতিশোধমূলক হামলার চক্র দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর পাশাপাশি রয়েছে ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি।

উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে একটি ভুল হিসাব, একটি ভুল সংকেত বা দুর্ঘটনাজনিত হামলাও বড় ধরনের সংঘাতের সূচনা করতে পারে। ইতিহাসে অনেক যুদ্ধই ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, বরং এমন ভুল পদক্ষেপের ফলেই শুরু হয়েছে। পারস্য উপসাগরে যেখানে নৌবাহিনী, ড্রোন এবং নজরদারি ব্যবস্থা কাছাকাছি অবস্থান করে, সেখানে এই ঝুঁকি আরো বেশি।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চীন, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। চীন এই অঞ্চলের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল আর রাশিয়া বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজতে পারে। ইউরোপ ইতোমধ্যেই জ্বালানি সংকটে ভুগছে; নতুন করে সংঘাত তাদের আরো বিপদে ফেলবে। ফলে এই সংকট একটি বহুস্তরীয় বৈশ্বিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা এ ধরনের সংঘাতের মূল ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের ভাষা ও শক্তির প্রদর্শনের আড়ালে মানবিক বাস্তবতা অনেক সময় হারিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—সাধারণ মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি এবং ভবিষ্যৎই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়। শান্তিপূর্ণ সমাধানের—শুধু মানবিক নয়, কৌশলগতভাবেও অপরিহার্য। উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখা, মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সক্রিয় উদ্যোগ—এসবই পরিস্থিতি শান্ত করতে পারে।

অন্যথায় সামরিক সংঘাত এমন একপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যার প্রভাব থেকে কোনো দেশই মুক্ত থাকবে না। আজকের বিশ্ব এতটাই আন্তঃসংযুক্ত যে, একটি অঞ্চলের যুদ্ধ পুরো বিশ্বের সংকটে পরিণত হতে পারে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সংঘাত মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং মানবিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত।

এটি মূলত নেতৃত্বের একটি পরীক্ষা—তারা কি শক্তির প্রদর্শনকে অগ্রাধিকার দেবেন, নাকি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেবেন। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কঠোর ভাষাকে নয়, বরং ধ্বংস এড়ানোর প্রজ্ঞাকেই স্মরণ রাখে। এখন বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিচক্ষণতা, ধৈর্য এবং সংযমের ওপর। অন্যথায় এই পথ আমাদের এমন এক অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে, যার মূল্য পুরো মানবজাতিকেই দিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভূরাজনীতি ও অর্থনীতি আজ গভীরভাবে আন্তঃসংযুক্ত। একটি সংকীর্ণ জলপথে সংঘাত পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তাই শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং দূরদর্শী ও কৌশলগত প্রস্তুতি গ্রহণই হতে পারে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার একমাত্র কার্যকর পথ।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই সংকট বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরাসরি এর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। বিশেষ করে, নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিল বৃদ্ধি পায়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমিয়ে দিতে পারে এবং মুদ্রার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ায় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কৌশলগত তেল মজুত গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

অন্যথায়, এ ধরনের বৈশ্বিক সংকট ভবিষ্যতেও দেশের অর্থনীতিকে বারবার বিপর্যস্ত করতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর প্রভাব পরোক্ষ হলেও গভীর। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। ফলে দূরবর্তী এই সংঘাত আমাদের অর্থনীতিকেও নাড়া দিতে পারে।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চড়া মূল্য

ইরান যুদ্ধে বড় ক্ষতি ভারতের

প্রথম আলোই একমাত্র হ্যাডমওআলা পত্রিকা: ডা. জাহেদ

ইসরাইলের সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ

মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা ও বিভাজনের ইতিহাস

যুদ্ধে ইরানকে যেভাবে সাহায্য করছে চীন-রাশিয়া

উৎসবনির্ভর অর্থনীতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আলেম সমাজের বিভক্তি ও অদৃশ্য সম্ভাবনার শক্তি

রাজা যায়, রোজা যায়, রোহিঙ্গাদের যাওয়া হয় না

মাননীয় স্পিকার...