হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ : হুমকির ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা কূটনীতির সন্ধান

আমীর খসরু

রাজ্যসম্পর্কিত ধারণার সঙ্গে সঙ্গে এর নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও হাজার হাজার বছর আগের বা পুরোনো। খ্রিষ্টপূর্ব অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে আর্যরা সপ্তসিন্ধু দেশ, যা বর্তমান সিন্ধু অববাহিকায় ও পাঞ্জাব তা দখল করে। আর আদিবাসী দাসদের পরাজিত করে। গ্রিকসভ্যতার ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ বছরের পুরোনো। মধ্যকালের গ্রিক নগর রাষ্ট্রের মধ্যে ‘স্পার্টা’ ছিল যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী সেনাদের। আর এথেন্স ছিল জ্ঞানবিজ্ঞানের পীঠস্থান। সক্রেটিস, প্লেটো, ডেমোক্রিটাস, হিপোক্রিটাসসহ অসংখ্য মহান দার্শনিকের রাষ্ট্র ছিল এই এথেন্স। আবার অ্যারিস্টটল এবং তার ছাত্র আলেকজান্ডার ছিলেন মেসোডেনিয়ান রাষ্ট্রের। সক্রেটিসের সময় গ্রিসে অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭০-৩৯৯ সময়ে অন্তত হাজারখানেক নগর রাষ্ট্র ছিল, যার মধ্যে শতাধিক ছিল বড় এবং উল্লেখযোগ্য। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫৮-তে দুই নগর রাষ্ট্রের প্রচণ্ড যুদ্ধের সময় ‘এথেন্সের’ সেনাপতি পেরিক্লিস আত্মরক্ষামূলক নিরপেক্ষতার পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তিনি অবগত ছিলেন, ওই আত্মরক্ষার কৌশলের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিরক্ষা। আবার অন্যদিকে আর্যদের মাধ্যমে সপ্তসিন্ধু রাজ্য দখল হয়েছিলÑরাজত্বকারী ‘দাসদের’ অর্থাৎ দাস জাতির মধ্যে ক্ষমতাধারী শ্রেণির মানুষ প্রজাদের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে সৃষ্ট গণঅসন্তোষের জন্য। আর ওই গণঅসন্তোষের সুযোগ নেয় আর্যরা। তখন আর্য এবং দাস রাজত্বের প্রজারা একজোট হয়ে ‘সাম্রাজ্যবাদী একাধিপত্য’বাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে দাস রাজত্ব দখল করে। (তথ্যসূত্র : ধর্মানন্দ কোসম্বী; ভগবান যুদ্ধ, সাহিত্য একাডেমি কলকাতা, ভারত ২০০১, পৃষ্ঠাÑ২-৫)

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ধর্মানন্দ কোসম্বী ভগবান বুদ্ধ বইয়ে গণরাজ্যের কথা যেমন উল্লেখ করেছিলেন, তেমনি রোহিনী নদীর পানির বণ্টন নিয়ে যুদ্ধের কথাও আলোচনা করেছেন। তিনি অস্ত্রের ব্যবহার ছাড়া মৈত্রীর বিষয়ে গৌতমের (বুদ্ধ) চিন্তাভাবনার বিষয়েও উল্লেখ করেন।

এ আলোচনায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যেÑযুদ্ধ, প্রতিরক্ষা, আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা এবং নগররাষ্ট্র ও গণরাজ্যের ধারণা নতুন কোনো তত্ত্ব নয়। প্রজাদের গণঅসন্তোষ যে রাজ্যের বাজার পতন ডেকে আনে, সে শিক্ষাও হাজার হাজার বছর আগের। কাজেই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা কমজোর রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার ধারণাও আদিযুগ থেকে চলে আসছে।

আধুনিককালের ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের নিরাপত্তা ধারণারও বদল হচ্ছে। আগের ঔপনিবেশিকতা এবং নয়া ঔপনিবেশিকতা নিরাপত্তার পুরো ধ্যান-ধারণাকে আলাদাভাবে বদলে দিয়েছে। ঔপনিবেশিকতার যে সবচেয়ে বড় বিপদটি অর্থাৎ ঔপনিবেশিকতায়-শাসিত রাষ্ট্রগুলোর মানুষের মনে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতাবোধের জন্ম দিয়ে গেছে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আর তা হচ্ছে ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তার কোনো প্রয়োজন নেই। এর ফাঁক গলিয়ে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর উত্থান ঘটেছে। এমন একটি ধারণারও জন্ম লাভ করেছে যে, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অর্থ হচ্ছে ‘যুদ্ধ’। ‘যুদ্ধ’ আর ‘প্রতিরক্ষা’ বা নিরাপত্তার ধারণা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, তা মুছে দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা এবং প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। বাংলাদেশের কেউ কেউ এমনটাই মনে করেন ও ভাবেন, যা ভুল এবং ভ্রান্তিতে পূর্ণ।

দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার লক্ষ্যে নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ধারণার সঙ্গে যুদ্ধ অথবা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ বলে মতলবি এবং কুকৌশলে আচ্ছন্নÑসে বিষয়টি বোধ করি আমাদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত একটি শ্রেণি অথবা ঔপনেবিশকতায় আচ্ছন্ন এবং দালাল গোষ্ঠীর ‘বয়ানে’ উঠে আসে না। তাদের বয়ান ভিন্ন এবং সুগভীর ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। এ কথাটি স্বতঃস্ফূর্ত যে, স্বাধীন এবং আধিপত্যবাদবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি এবং এর ফলে যে কূটনীতি, তা হচ্ছে মূল বিষয়। যে কারণে এ কথাটি সত্য এবং প্রমাণিত যে, Diplomacy is the first line of deffence (কূটনীতিই হলো প্রতিরক্ষার প্রথম ধাপ)। ব্রিটিশ কূটনীতিক এবং রাজনীতিবিদ Harold Nicolson-কে এ ধারার অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে Preventive diplomacy বা প্রতিরোধমূলক অথবা নিরোধমূলক কূটনীতির কথা চালু আছে। এ কূটনীতি হচ্ছে সংঘাত বা বিরোধ মীমাংসার জন্য আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা এবং সংকটের সমাধান। কূটনীতির মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে নানা তত্ত্ব রয়েছে, যার মাধ্যমে সংঘাত এবং যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব। যদিও এটা এখন আর তেমন কার্যকর নয়।

প্রত্যেক রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার লক্ষ্যে জনঅংশীদারত্বমূলক জাতীয় প্রতিরক্ষা-নিরাপত্তার নয়া বন্দোবস্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান তাত্ত্বিক হ্যান্স জ্য মরগেনথাউ, যিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ল্যাসিক্যাল বা ধ্রুপদি বাস্তববাদী ধারণার প্রধান পুরুষ। তার তত্ত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা জরুরি। মরগেনথাউ তার ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত Politics among nations বইয়ে এমন ধারণা দিয়েছেন যে, জাতীয় স্বার্থ হলো যেকোনো দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। আর জাতীয় স্বার্থ হলো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা করা, যার মধ্যে রয়েছে জনগণ, ভূখণ্ড এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা। আর বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আবেগ, নৈতিকতা বা আদর্শের চেয়ে বাস্তবতাকে স্থান এবং গুরুত্ব দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত বা বিরোধপূর্ণ কোনো আদর্শবাদ ক্ষতিকর। জাতীয় স্বার্থ হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং কেন্দ্রবিন্দু, যা রাষ্ট্রকে সক্ষমতা অর্জন ও নিজের টিকিয়ে রাখার জন্য বাস্তববাদী এবং কৌশলী হতে বাধ্য করে। মরগেনথাউ তার বইয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছয়টি মূলনীতি ব্যাখ্যা করেন, যাতে তিনি দেখিয়েছেনÑজাতীয় স্বার্থকেই আসলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দিতে হবে। ক্ষমতা ও শক্তির নিরিখে সংজ্ঞায়িত ব্যবস্থার বিষয়ই হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ।

এছাড়া ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু হয়েছে প্রতিরক্ষা কূটনীতি বা Defence diplomacy এবং এর অর্থ হচ্ছে সামরিক শক্তিকে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করা। এ ক্ষেত্রে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, যৌথ মহড়া, সামরিক এবং প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদল বিনিময়, দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়তার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া এবং রক্ষা করা। সোজা কথায়, যেখানে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিষয়গুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং নিজ স্বার্থে পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনীতির একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করা। আর এটি হতে হবে গঠনমূলক অর্থাৎ অতীত অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান বাস্তবতার কৌশলগত জ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়ে। যাকে Constructivism গঠনবাদী তত্ত্ব হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

আগেই বলা হয়েছে, যারা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাকে যুদ্ধের বা যুদ্ধ প্রস্তুতির সমার্থক ভাবার ভুয়া এবং মতলবি বয়ান তৈরি করেÑতাদের অবশ্যই এ বিষয়টি থেকে বিরত থাকতে হবে।

এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা প্রয়োজন, তা হলো আধিপত্য বিস্তারে বৈরী বা বন্ধু নয়Ñএমন আধিপত্যবাদী আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভুয়া অথবা জাল বয়ান একটি নতুন সংযোজন। ভুয়া বা জাল বয়ানতত্ত্ব (Fake Narrative Theory) হচ্ছে, শত্রু মনোভাবাপন্ন এবং বৈরী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ ছাড়াই গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা, মতলবি, একপক্ষীয় ভুল যুক্তির ওপরে বয়ান হাজির করা হয় এবং সুনির্দিষ্ট টার্গেট নির্ধারণ করে প্রচার করা হয়। এই টার্গেট বৈরী সরকার, কোনো রাজনৈতিক প্রতিরক্ষা বা গোষ্ঠী অথবা গোষ্ঠীগুলো হয়ে থাকে। আর বয়ানটি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে মনে হবে এটাই সত্যি। অথবা সত্য ঘটনাকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়, যাতে মানুষ সত্যটাকে মিথ্যা ভাবতে শুরু করে। এটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অংশ। মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস, সংশয় এবং হীনম্মন্যতার বৈরী তৈরি করে, যেখানে সত্য প্রমাণিত হয় মিথ্যায় আর মিথ্যা পরিণত হয় সত্যে এবং কোনো প্রমাণ না থাকাটাই হচ্ছে এর শক্তি। সত্যিকারের স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে তারা বিশাল হুমকি হিসেবেই মনে করে বলেই এসব বয়ান তৈরি করা হয় এবং এগুলো নানা ধরনের। এ ক্ষেত্রে এমন হীনম্মন্যতা সৃষ্টির বয়ান তৈরি করা হয়, যাতে ষড়যন্ত্রকারী রাষ্ট্রই আমাদের উৎকৃষ্ট বন্ধুÑএমন মনোভাব তৈরি বা সৃষ্টি করা হয়। এ অবস্থায় জাল বয়ান তত্ত্ব ও ষড়যন্ত্রের তত্ত্বের মাধ্যমে টার্গেট করা দেশের মানুষের মধ্যে ‘সম্মতি উৎপাদন’। যাতে তাত্ত্বিক, আন্তর্জাতিক গণবুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি বলেছেন, সম্মতি উৎপাদন বা Manufacturing Consent বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এটি আসলে মিথ্যা এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সৃষ্টি করা হয়। এটা হিটলারের তথ্যমন্ত্রী যোশেফ গোায়েবলসের প্রোপান্ডার আধুনিক সংস্করণ। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত হিটলারের তথ্য দপ্তরের দায়িত্বে থাকা গোয়েবলসের তত্ত্ব ছিল এ রকমÑমিথ্যার বারবার পুনরাবৃত্তি তাকে সত্যে পরিণত করে (Repeat a lie often enough and it becomes a truth)। তিনি একে বলেছেন, অলীক সত্য প্রভাব বা Illusory truth effect । অর্থাৎ সত্য জানা সত্ত্বেও বারবার মিথ্যা শুনলে ওই ‘সত্য’ মিথ্যায় পরিণত হয়।

ভুয়া বা জাল বয়ান এখন আর শুধু কূটনীতির অঙ্গ নয়, যুদ্ধ বা সংঘাতের সময়েও এই তত্ত্ব বহুলভাবে ব্যবহৃত। সাম্প্রতিক পাক-ভারত সংঘাতেও এই ব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে এই কারণে যে, প্রতিরক্ষার সঙ্গে দেশের অর্থাৎ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার প্রশ্নটি জড়িত। এখানে বলা প্রয়োজন যে, যুদ্ধ হচ্ছে আসলে রাজনীতির সম্প্রসারিত রূপ।

ঔপনিবেশিকতা, প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা বা World order-এ ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আত্মরক্ষা বা ভারসাম্য রক্ষার জন্য কূটনীতি এখন আর চিরায়তরূপে নেই। তবে চাণক্যের একটি অধিকরণ বা ব্যাখ্যা এখনো কার্যকর করার জন্য কোনো কোনো দেশ সচেষ্ট। চাণক্য সন্ধিকে ‘ষাড়গুণ্য’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর ‘অমিস সন্ধি’ আলোচনায় বলেছেন, ‘সেনাশক্তি দিয়ে যখন কোনো বলবান রাজা কোনো কমজোর রাজাকে চেপে রাখবে, তখন শিগগিরই বলবানের সঙ্গে সন্ধি করে নেওয়ায় বাধ্য করা হবে। যখন এমন পরিস্থিতিতে পরাজিত রাজাকে ধন, ভূমি ইত্যাদি দিয়ে সন্ধি করতে বাধ্য করা হয়Ñতখন তাকে অমিস সন্ধি বলা হয়। (চাণক্যনীতি ও কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র, নুসরাত প্রকাশনী, ২০২৩, পৃষ্ঠা : ১৭৮ -১৭৯)।

এ রকম প্রচেষ্টা বৈরী বা শত্রুরাষ্ট্রের দিক থেকে করার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে এবং আমাদের দেশও এতে অভ্যস্ত। তবে আধুনিককালে নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে আর তা হলোÑসভ্যতার সংকটের নামে ‘সন্ত্রাস’ বা মৌলবাদ তৈরির বয়ান।

এ ক্ষেত্রে পশ্চিমের চোখে প্রাচ্যবাদ বা অরিয়েন্টালিজম (Orientalism)। অর্থাৎ পশ্চিমের দৃষ্টিতে প্রাচ্যকে দেখা এবং পশ্চিমের আধিপত্য এবং পরিবর্তনশীল মাত্রার জটিল কর্তৃত্বের সম্পর্ককে জানা। অথচ আজকে যে পাশ্চাত্য বা পশ্চিমাবাদ প্রাচ্যবাদ জটিল, অপরিশোধিত অর্থাৎ এক কথায় বিশৃঙ্খল, সমর্থন অযোগ্য-মূর্খতা বলে মনে করেছেÑতারাই ঔপনিবেশিক শক্তি এবং বর্তমানের নয়া-উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ। এ সম্পর্কে বিখ্যাত প্রাচ্যতত্ত্ববিদ, তাত্ত্বিক, পণ্ডিত অ্যাডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। সাঈদ বলেছেন, পশ্চিমের পক্ষ থেকে প্রাচ্যের বয়ান হচ্ছেÑ‘এই মরুভূমির অধিবাসীরা (আরব এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো) তো যাযাবর। এই ভূমির ওপর তাদের কোনো দাবি নেই, অতএব কোনো সাংস্কৃতিক বা জাতীয় বাস্তবতাও নেই। আর এভাবেই আরবরা হয়ে ওঠে ছায়ামাত্র। যেহেতু আরব এবং ইহুদি উভয়েই প্রাচ্য সেমেটিক। তাই এই ছায়ার মধ্যে বসিয়ে দেওয়া যেতে পারে প্রাচ্য সম্পর্কে ‘পশ্চিমের অবিশ্বাস’। যেহেতু নাজি (নাৎসি) পূর্ব ইউরোপে ইহুদি ছিল বিনষ্টের প্রতীক। এ কারণেই পশ্চিমা প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের প্রবল সহায়তায় ইহুদিদের দেখানো হয় নায়ক আর আরবরা ধীরগতির, রহস্যময় ও ভয়ানক। তাদের ছায়ামাত্র অর্থাৎ বাস্তব অস্তিত্বহীন এবং অতীত বিষয়ে। তবে ইহুদি বিরোধিতা ছাড়া আরবরা তেল রপ্তানিকারকও। এটিও তাদের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে পশ্চিমা বা পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি। তাদের মনোভাব হচ্ছে, তেলের এমন বিশাল সঞ্চয়ের মালিকানা লাভের নৈতিক যোগ্যতা তাদের (আরবদের) নেই। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য : অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ, অরিয়েন্টালিজম, ভাষান্তর ফয়েজ আলম, র‌্যামন পাবলিশার্স, আগস্ট ২০০৭ পৃষ্ঠা : ৩৫৪-৩৫৫)

সংক্ষেপে আলোচনার জন্য এ কথা বলা প্রয়োজন, সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্য এবং আসল বিষয়টি যেহেতু তেল সম্পদের আরবা অথবা অধিকাংশ তেল সম্পদসমৃদ্ধ দেশের মানুষের ধর্ম ইসলাম। কাজেই পাশ্চাত্যের পক্ষ থেকে ইসলাম শব্দটি জুড়ে দিয়ে পরবর্তীকালে মৌলবাদ, সন্ত্রাসী বয়ান তৈরি করা হয়। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য তেল সম্পদের ওপর অধীনতা প্রতিষ্ঠা বা দখল।

এ বিষয়টিকে ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের নিরাপত্তার বাইরের কোনো বিষয় হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়। অ্যাডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ তার অপর এক বই কাভারিং ইসলাম (Covering Islam)-এ বলেছেন, পশ্চিমের দৃষ্টিতে এবং চৈতন্যে ইসলাম একটি বিরূপ, সমস্যাগ্রস্ত ও সংকটসৃষ্ট উপলব্ধি। পশ্চিমের এমন উপলব্ধির পেছনে বিভিন্ন কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণটি হচ্ছেÑ‘জ্বালানি তেলের স্বল্পতা আর কেন্দ্রে আছে আরব এবং পারস্য উপসাগরীয় তেল, ওপেক এবং পশ্চিমে জ্বালানি তেলের খরচের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতি।’ এছাড়া তাদের দৃষ্টিতে ‘তথাকথিত ইসলামের প্রত্যাবর্তন, ইরান বিপ্লব, মুসলিম বিশ্বে চরমপন্থি জাতীয়তাবাদের উত্থান, আফগান যুদ্ধ’Ñসব মিলিয়ে এক ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, Edward W. Said; Covering Islam, Vintage Books, March 1997)

এর সঙ্গে আরব বসন্তের নামে লিবিয়া, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে রেজিম চেঞ্জ বা শাসক বদল করে তেল সম্পদের অবাধ লুণ্ঠনের বৈধতা উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে অন্য নামে, ভেনেজুয়েলার শাসককে ‘অপহরণ’Ñসবই ওই তেলের উদ্দেশ্য।

কাজেই কোনো ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থা এবং এর ফলে সৃষ্ট কোনো সংস্থা যেমন জাতিসংঘ আর যথার্থ কার্যকর কোনো সংস্থা হিসেবে নেই। বিশ্ব এখন শক্তির ক্ষমতা দেখানোই বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ (Board of Peace) গঠনের মাধ্যমে শান্তি বিক্রির ফেরিওয়ালা হয়েছেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের নামে ন্যাটো ভাঙনের মুখোমুখি। তবে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠনের। দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় জোট বা চুক্তি হচ্ছে আগের গতানুগতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তিতে নয়, প্রতিরক্ষা কূটনীতি এবং হুমকির ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার (Balance of Power) তত্ত্ব এখন অতীত।

আর এসবই হচ্ছে নতুন তত্ত্বের ভিত্তিতে। এ সম্পর্কে Stephen Walt (স্টিফেন ওয়াল্টের নতুন তত্ত্বটি হচ্ছেÑহুমকির ভারসাম্য বা Balance of threat) আর এ তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রগুলো এখন শুধু ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে নয়; বরং হুমকি বা ভীতি অনুযায়ী এবং এর ওপর ভিত্তি করেই জোট গঠন করে। তারা যে রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় হুমকি বা ভীতির কারণ মনে করে, তার বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়। স্টিফেন ওয়াল্টের তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র জোট গঠনে এগিয়ে আসে অথবা অন্তর্ভুক্ত হয় নিজেকে শক্তিমান করার জন্য, অর্থাৎ কোন রাষ্ট্র কতটা হুমকি সৃষ্টিকারী বা ভীতির কারণ এবং এর ক্ষমতা, ভৌগোলিক নৈকট্য, আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের বিবেচনায়। আর এটা করা হয় অন্য রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সুবিধা, নিশ্চয়তা এবং মানসিকতার নিমিত্তে। (তথ্য সূত্র : Stephen Walt; International Security journal; Vol. 9 spring-1985)

বর্তমানে ক্ষুদ্র বা কমজোর রাষ্ট্রের অথবা মোটামুটি শক্তিধর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব জোট গঠন বা দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় চুক্তিগুলো হচ্ছে, তা হুমকির ভারসাম্য রক্ষা করে প্রতিরক্ষা কূটনীতির মাধ্যমেই হচ্ছে। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে তুরস্কে যোগ দিতে চাওয়া এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।

এ ক্ষেত্রে পুরো বিশ্বব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে, বাংলাদেশকেও সেদিকে নজর রেখে মনোযোগী হতে হবে।

লেখক : গবেষক, সাংবাদিক

কেমন রাজনৈতিক দল চাই

উত্তাপ-উত্তেজনা বনাম সহিষ্ণুতা-সহমর্মিতা

দেশজুড়ে এখন ভোট দিন ভোট দিন

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে ‘হাদি প্রভাব’

গণভোটের বিরুদ্ধে ‘গোলামের’ আস্ফালন ও বাকশাল গভর্নরের ফুলেল বরণ

ক্ষমতা, দ্বন্দ্ব ও বিশ্বরাজনীতির নতুন সম্ভাবনা

তুমি কোনো রাজার ছেলে নও

সার্ক গঠন জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা