হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

দেশজুড়ে এখন ভোট দিন ভোট দিন

সৈয়দ আবদাল আহমদ

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নির্বাচন বেশ জমে উঠেছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া আর রূপসা থেকে পাথারিয়াÑদেশের প্রতিটি প্রান্তেই এখন নির্বাচনি আমেজ। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। ভোট ছাড়া কোনো কথা নেই। সর্বত্রই শোনা যাচ্ছে ‘ভোট দিন, ভোট দিন’ স্লোগান।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই প্রথম নির্বাচনি লড়াইয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করছেন। তিনি বগুড়া-৬ এবং ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। চারদিনের নির্বাচনি প্রচারে তিনি ভোটারদের ফজরের আগেই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রায় ১৫ লাখ ৩৩ হাজার প্রবাসী ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বড় অংশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ১১টি দলের জোটে অংশ নিয়ে নির্বাচন করছে। এবার ৫ কোটি ৫৬ লাখ তরুণ ভোটারই (৪৪ শতাংশ) নির্বাচনের কিংমেকার হতে যাচ্ছেন। প্রথাগত মাঠের প্রচারের চেয়ে এবার সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো নির্বাচনে প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এআই প্রযুক্তি আসন্ন নির্বাচনে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াত একে অন্যের প্রধান নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রশ্ন জড়িত। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই দিনে সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন প্রশ্নে জাতীয় গণভোট হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনটি হবে আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীকবিহীন নির্বাচন। প্রায় দেড় যুগ পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়েছে দেশে। ফলে গ্রামবাংলার হাটবাজার ও চায়ের দোকানগুলো এখন রাজনৈতিক আড্ডার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি উঠান বৈঠক ও ছোট ছোট সভা করছেন। পোস্টার ও ব্যানার-ফেস্টুনের ওপর কড়াকড়ি থাকায় এগুলো চোখে পড়ছে না। তবে প্রার্থীরা লিফলেট বিতরণ করে চলেছেন।

১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এটি শুধু একটি সাধারণ নির্বাচন নয়, বরং এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অনুপ্রেরণাদায়ক সুযোগ। ২০২৪ সালের জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়ের পর এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে ‘ইনসাফ বা ন্যায় প্রতিষ্ঠা’র নির্বাচন হিসেবে। বিগত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচনের নামে প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন শেখ হাসিনা। তাই ১৫ বছর পর আসন্ন নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে এমন, যেখানে ভোটাররা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। আসন্ন নির্বাচনটি শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং গত দেড় দশকের স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো আমূল সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচন দেখা হচ্ছে, গত ১৫ বছরের ‘মাফিয়া অর্থনীতি’ এবং ‘জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার’ জঞ্জাল পরিষ্কার করার একটি সুযোগ হিসেবে। নির্বাচনটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এটিকে আন্তর্জাতিক মহল দেখছে, ‘বৃহত্তম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে। নির্বাচনটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হলে এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার সহায়ক হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকার থেকে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের এটিই একমাত্র পথ। প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সব নির্বাচনের জন্য একটি ‘মানদণ্ড’ বা ‘বেঞ্চমার্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ইতিহাসের সেরা সুন্দর একটি নির্বাচন হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনের একই দিনে জুলাই সনদের ওপর (জুলাই চার্টার) একটি সাংবিধানিক গণভোট হবে। এর মাধ্যমে নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো জনগণের রায়ের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীক সঙ্গত কারণে নির্বাচনে না থাকলেও প্রায় ১৭ বছর পর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে সব রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের অংশগ্রহণে এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যা মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের একটি বড় সুযোগ। বিগত তিনটি নির্বাচনে জনগণকে ভোট দিতে না দেওয়া এবং গণহত্যাসহ ফ্যাসিবাদী শাসনের জন্য শাস্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। এ জন্যে আওয়ামী সমর্থকদের একটি অংশ নাখোশ হলেও দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী এই নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছে। দেশব্যাপী নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে জনগণ যেভাবে অংশ নিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যায় মানুষ ভোটে অংশ নিতে কেন্দ্রে যাবে উৎসবমুখর পরিবেশে।

নির্বাচনের সামগ্রিক চিত্র

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, সিপিবিসহ সব দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। নিবন্ধিত ৫৯টি দলের মধ্যে ৫১টি দল নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৮টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সীমানা জটিলতার কারণে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনে ভোটগ্রহণ হবে পরে। এবার নির্বাচনে প্রার্থী সংখ্যা ১৯৮১ জন। এর মধ্যে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১৭৩২ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৪৯ জন। নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২৮৮ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি । এর মধ্যে ২৮৬ আসনে ধানের শীষের প্রতীকে বাকি আসনগুলোয় জোটের শরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি দিয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী অর্থাৎ তাদের নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০ জন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সংখ্যা ২১৫ জন। বাকি প্রার্থীরা জোটের শরিক দলের। জামায়াতে ইসলামী কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। তাদের শরিক এনসিপি দুজন নারীকে প্রার্থী করেছে। জাতীয় পার্টি ১৯৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তাদের নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছয়জন (৩ শতাংশ)। বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী হওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষিত ২২৯। পেশায় বেশিরভাগ ব্যবসা। অর্ধেকের বেশি প্রার্থী বয়স ষাটোর্ধ্ব। কোটি টাকার বেশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ২১৫ জনের। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে ২০১ জন এবং এনসিপির ৩০ জনের মধ্যে ২৬ জন উচ্চশিক্ষিত।

নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলাকলি, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) লাঙ্গল ও ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই পীর) হাতপাখা। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ৫৬টি প্রতীক বরাদ্দ হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑহাঁস, ফুটবল, আনারস, ঘোড়া, কেটলি, তালা ও মাথাল।

এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন। নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন। তৃতীয় লিঙ্গ ১ হাজার ১২০ জন। ১৮ থেকে ৩৭ বছর পর্যন্ত তরুণ ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশ। এই বিশাল অংশটিই মূলত নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক বা কিংমেকার হতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী (বিওয়াইএলসি) ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সের ৯৭ শতাংশ ভোটার এবার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণদের নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সচেতন এবং আগ্রহী করে তুলেছে। নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৬১ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯ এবং পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৯৮ জন। নির্বাচনে কাজ করবে ১০ লক্ষাধিক জনবল। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত থাকবে প্রায় এক লাখ সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ আট লাখ বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ২৬টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৩০০ জনের পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫৬ জন বাংলাদেশে অবস্থান করছে।

নির্বাচনি প্রচারে বাগ্‌যুদ্ধ ও বিভিন্ন ইস্যু

আগের নির্বাচনগুলোয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ছিল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। জামায়াতে ইসলামী এবং অন্য ইসলামি দলগুলো বিএনপির মিত্র হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোট নির্বাচনি মাঠে নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করেছে। একদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশব্যাপী প্রচার চালাচ্ছেন। এই দুই জোটের মধ্যে চলমান দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। তারেক রহমান সিলেটে হজরত শাহজালাল (রা.) ও হজরত শাহপরানের (রা.) মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে বিএনপি জোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন। অন্যদিকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও জোটসঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা-১৫ নিজের আসন থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেছেন। নির্বাচনি প্রচারে তারেক রহমানের প্রথমদিনের বক্তব্য বাজিমাত ও উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জামায়াতে ইসলামীর ‘জান্নাতের টিকিট’ ও ‘বিকাশে ভোটারদের কাছে টাকা পাঠানো’ এবং ‘একাত্তরের ভূমিকা’ নিয়ে তারেক রহমানের বক্তব্য মৌচাকে ঢিল মারার মতো হয়েছে। এ বক্তব্যের পর জামায়াতে ইসলামী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, লন্ডন থেকে একজন মুফতি এসেছেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ‘কাফের’ বা কুফরি হিসেবে বলছেন। যদিও তারেক রহমান কাফের শব্দ উচ্চারণ করেননি। তিনি ‘শিরক’ শব্দটা উচ্চারণ করেছেন। জান্নাতের টিকিট বিষয়টি জামায়াত নেতারা অস্বীকার করছেন। তবে তাদের নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি ও ফ্ল্যাটে গিয়ে যে তালিমে অংশ নিচ্ছেন, সেখানে তারা এটা বলেছেন। জামায়াতের বুদ্ধিজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির তো প্রকাশ্যেই বেহেশতের কথা বলেছেন। তাই জামায়াতের উচিত হবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রকৃত অবস্থা জানানো। বিষয়টি আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। জামায়াত তারেক রহমানকে ভারতের সঙ্গে ট্যাগ দেওয়া এবং আওয়ামী ভোটারদের প্রতি সহানুভূতিশীলও বলা হচ্ছে। তারেক রহমান পাল্টা বলছেন, তার দল বিএনপি দিল্লি বা পিন্ডির নয়, সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগানে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেশের স্বার্থই বিএনপির কাছে বড়। দুই জোটই চাঁদাবাজ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তার পরিকল্পনা তো দেবেই। জামায়াতও তার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরুক। কিন্তু ফ্যামেলি কার্ড, কৃষক কার্ড নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াত বক্তব্য দিচ্ছে। বিএনপি সরকারে এলে কী করবে সেই কর্মসূচির কথা তো বলবেই। নির্বাচনি ইশতেহারেরই অংশ এটা।

যে তিন নির্বাচনি প্রহসনের কারণে এবার নির্বাচনবিহীন আওয়ামী লীগ

শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি নির্বাচন ছিল মূলত ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু’ এবং একটি পরিকল্পিত ‘মাস্টারপ্ল্যান’-এর অংশ। এই ‘একক মাস্টারপ্ল্যান’টি ছিল ক্ষমতায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল। এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ছিল ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা।

এই তিন নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন তদন্ত করে গত ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, তাতে এই মন্তব্য করা হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বে এই কমিশন গঠিত হয়। এই তিনটি ভুয়া নির্বাচন করা এবং গণহত্যা চালানো ও গণতন্ত্র ধ্বংস করার কারণেই আওয়ামী লীগ আজ নির্বাচনের বাইরে রয়েছে প্রাপ্য শাস্তির অংশ হিসেবে।

তিন নির্বাচন তদন্তে গঠিত কমিশন তাদের রিপোর্টে প্রশাসনের হাতে নির্বাচনি নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ছিল তার উল্লেখ করে বলেছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাত থেকে মূলত সিভিল প্রশাসনের হাতে চলে গিয়েছিল। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের একটি অংশকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হতো। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি ছিল সম্পূর্ণ বিনাভোটে নির্বাচন। এই নির্বাচনে ১৫৪টি আসন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনটি ছিল ‘রাতের ভোট।’ কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট রাতেই কাস্ট করা হয়েছিল। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হার দেখানো হয়েছিল ১০০ শতাংশের বেশি এবং সেসব ভোট শুধু ‘নৌকা’ প্রতীকেই পড়েছিল। ২০২৪ সালে ছিল ‘ডামি নির্বাচন’। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় জনগণের কাছে প্রতিযোগিতামূলক দেখানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এই তিনটি নির্বাচন কোনোভাবেই নির্বাচনি সংজ্ঞায় পড়ে না। ত্রুটিপূর্ণ জঘন্য প্রশাসনের এই নির্বাচনের মাধ্যমে আসলে দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কলুষিত ও দুর্বল করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করেছে। নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তার এবং গুম করার মতো হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো এবং ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া ছিল একটি নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। নির্বাচনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দলীয় নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ ‘ইলেকশন সেল’ গঠিত হয়েছে। এই তিনটি ভুয়া নির্বাচন করা এবং গণহত্যা চালানো ও গণতন্ত্র ধ্বংস করার কারণেই আওয়ামী লীগ আজ নির্বাচনের বাইরে রয়েছে প্রাপ্য শাস্তির অংশ হিসেবে।

তিন নির্বাচন তদন্তে গঠিত জাতীয় নির্বাচন কমিশন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে চল্লিশটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করেছে। এসব সুপারিশের মূল লক্ষ্য হলোÑনির্বাচনব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। সুপারিশে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন সম্পর্কে বলা হয়, ইসিকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা দরকার, যাতে তারা প্রশাসনের হাতের পুতুল হিসেবে কাজ না করে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (ডিজিএফআই, এনএসআই ও এসবি) অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা সিভিল প্রশাসনের হাত থেকে আবার নির্বাচন কমিশনের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে, যাতে করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা তৈরি হয়। এছাড়া নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকালে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাহী ও রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে একটি ‘প্রতিরক্ষা কাঠামো’ তৈরি করতে হবে। সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা যাচাই করতে হবে। ২০০৮ সালে নির্বাচনেও ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। ওই নির্বাচনটিও তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি তহবিল ব্যবহার করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে ‘হাদি প্রভাব’

গণভোটের বিরুদ্ধে ‘গোলামের’ আস্ফালন ও বাকশাল গভর্নরের ফুলেল বরণ

ক্ষমতা, দ্বন্দ্ব ও বিশ্বরাজনীতির নতুন সম্ভাবনা

তুমি কোনো রাজার ছেলে নও

সার্ক গঠন জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা