ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল ও মিত্রদল ২১২ আসনে অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করেছে, যা ইতিমধ্যে আমরা সবাই জানি। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাংলাদেশের জন্য কতটুকু শুভ, সেটি বিবেচনা করতে আমাদের তাকাতে হবে ২০০১ এবং ২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ২০০১-এ বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের মেয়াদ শেষে আমাদের দেখতে হয়েছিল জরুরি অবস্থা, আর ২০০৮-এর বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের মাশুল গুনতে হয়েছিল ১৭ বছর, যার শেষ পরিণতি ছিল ২৪-এর রক্তাক্ত জুলাই। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট নিয়ে বিজয়ী ক্ষমতাসীন দলেরাও নানাভাবে বিতর্কিত হয়েছে।
১৯৮৪-এ ক্ষমতায় আসা ভারতের কংগ্রেস, ২০১৭-এ নেপালের নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি, ২০২০-এ শ্রীলঙ্কার এসএলপিপি। মোটাদাগে প্রায় প্রত্যেকেরই ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের চেষ্টায় সংবিধান পরিবর্তনের প্রতি প্রবল ঝোঁক দেখা যায়, যা কি না গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে বিতর্কিত করে তোলে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ এবং আদালতের স্বাধীন এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ দুই-তৃতীয়াংশের একক নিয়ন্ত্রণকে কিছুটা দমিয়ে রাখতে পারে।
এমনকি ২০২০-এ নেপালের সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিয়েছিল নেপালের সুপ্রিম কোর্ট। তবে শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ২০২০-এ ক্ষমতায় আসা এসএলপিপি ২০তম সংবিধান সংশোধনী পাস করে, ফলে বিচার বিভাগ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়, যা কি না ২০২২-২৩-এ ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন ভূমিধস বিজয়ীদের বারবার দেখা গেছে আদালতকে কুক্ষিগত করে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি কি তবে একই পদাঙ্ক অনুসরণ করবে? নাকি গণতন্ত্রের পক্ষে প্রত্যাশিত কোনো আচরণ আমাদের উপহার দেবে?
প্রথমে জেনে নেওয়া যাক দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে বিজয় লাভ করলে বিজয়ী দলের হাতে কী কী ক্ষমতা থাকে। যেমনÑসরকার চাইলে সংবিধান বদলাতে পারে, অর্থাৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা এবং মৌলিক কাঠামোগত-সংক্রান্ত বিষয় একক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে পারে। এছাড়া বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে। ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশের সংসদে এবারই প্রথম উচ্চকক্ষের প্রবর্তন হচ্ছে। যেখানে নিম্নকক্ষ থেকে আসা বিলগুলো যাচাইকরণের মাধ্যমে জনস্বার্থবিরোধী আইন বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করবে। মূলত সংবিধান সংশোধন বা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে, যদিও তারা সরকারের প্রতি অনাস্থা আনতে পারবে না। মোট ভোটের শতাংশ অনুযায়ী উচ্চকক্ষের ১০০ আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে ২৪টি দল একমত হলেও সাতটি দল ও জোট নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী দল চেয়েছিল উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হবে নিম্নকক্ষের নির্বাচিত আসন অনুযায়ী। এখানেই একটা কিন্তু থেকে যাচ্ছে! কারণ জুলাই সনদে উল্লিখিত উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়মের নিচে ফুটনোটে লেখা আছে, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে, তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে’, অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশে জয়ী জাতীয়তাবাদী দল চাইলে তাদের মতো করে নিম্নকক্ষের আসন অনুযায়ী উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন করতে পারে, অতএব নির্বাহী আদেশের উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনভিত্তিক প্রজ্ঞাপন অনেকটা ধোপে নাও টিকতে পারে। আর তেমনটাই যদি হয়, তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় যেই উচ্চকক্ষ গঠিত হয়েছে, সেটা মূলত যেই লাউ সেই কদুই থেকে যাবে! জনগণ যে অর্থে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জয়যুক্ত করেছে, সেই অর্থে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন আনুপাতিক হারে হবে, এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
জাতীয়তাবাদী দল যেই দেশটির হাল ধরতে যাচ্ছে, সেই দেশটি এই মুহূর্তে অসম্ভব নাজুক অবস্থায় আছে। ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, বিক্ষিপ্ত আইনশৃঙ্খলা এবং বিচারব্যবস্থা, সেই সঙ্গে অর্থনীতির অতি করুণ দশায় বিজয়ী দলকে এ দেশের প্রতি প্রচুর পরিশ্রম দিতে হবে। বাংলাদেশকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। পরতে পরতে ধসে যাওয়া আমলাতন্ত্র নিয়েও বেগ পেতে হবে অনেক। এ সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চমূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথাÑ১৭ বছরের যেই ফ্যাসিস্ট ট্রমার ভেতর দিয়ে দেশ এবং জনগণ জীবন অতিবাহিত করেছে এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান যেই ভয়াবহ রক্তাক্ত স্মৃতি গেঁথে দিয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি কারোরই কাম্য নয়। তাই বিজয়ী দলের জন্য এটাই সুযোগ নিজেদের অভূতপূর্ব একটি বিকল্প হিসেবে প্রমাণ করার এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সংস্কৃতি থেকে সরে এসে নতুন কোনো নজির স্থাপন করার। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার কুক্ষীকরণ একটি গতানুগতিক ব্যাপার, যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, দুর্নীতি এবং গ্রাহকতন্ত্র। ক্ষমতার অপরাজনৈতিক বলয় থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে, পড়ে যাওয়া এই দেশটা হয়তো আরো অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে।
সর্বোপরি বিজয়ী এই দলটির জন্য বিষয়টি যতটা না ‘ক্ষমতা’ তার চেয়ে বেশি ‘দায়িত্ব’। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, জনগণের দেওয়া দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয়তাবাদী দল আগের ভূমিধস বিজয়ীদের মতো ক্ষমতার বলয় নিজ সুবিধার্থে পোক্ত করবে, নাকি দায়িত্বানুভূতির সঙ্গে বিরোধী জোট এবং অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে হাত দেবে। বিজয়ী দলকে মনে রাখতে হবে, জনগণ এবার শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা দলের জন্যই ভোট দেয়নি, জুলাই সনদের বাস্তবায়নেও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে, যেই সনদের একটি বড় অংশ ক্ষমতার ভারসাম্য সুনিশ্চিত করা। বিজয়ী দলের কাছে প্রত্যাশা, ১৭ বছরের ভঙ্গুর বিশ্বাসের এই মানুষগুলোর সঙ্গে আর যেন কোনো বিশ্বাসঘাতকতা না হয়।
লেখক : শিক্ষক, লেখক ও নারী অধিকারকর্মী
nirvanabrishti@gmail.com