যারা ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এবং কোনে কোনো ক্ষেত্রে একটু ব্যাপক অর্থে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বলেই ইতি এবং উপসংহার টানছেন, তারা মস্তবড় এক ভুলের বা ভ্রান্তির রাজ্যে বসবাস করছেন। অনেক বোদ্ধাব্যক্তিত্ব এই যুদ্ধকে ইসলামের সঙ্গে ইহুদি বা অন্য ধর্মের যুদ্ধ বলে মনে করছেন, তারাও ভ্রান্তি বিলাসে আছেন।
যারা এই যুদ্ধকে পাশ্চাত্যের (West) সঙ্গে প্রাচ্যের (Orient) ফাটল বা সংঘাতের কথা বলছেন, তারাও ঠিক আসল কারণের কাছাকাছি যেতে পারেননি। যদিও ১৯৯৬ সালের ১৯ নভেম্বর মার্কিন রাজনীতিবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি হান্টিংটলের একটি মতলবি বই প্রকাশিত হয়। বইয়ের নাম Clash of Civilization and The Remaking of World Order (অর্থাৎ সভ্যতার সংঘাত এবং নয়া বিশ্বব্যবস্থার পুনর্নির্মাণ) বিষয়টি চমকপ্রদ সন্দেহ নেই। কারণ হান্টিংটন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য অবাধ লুণ্ঠন, সাম্রাজ্যবাদ এবং নয়া উপনিবেশবাদের মাধ্যমে দেশ বা অঞ্চল দখলের নয়া এক তত্ত্ব হাজির করলেন। খুবই স্বল্পসময়ে ওইসব শক্তির বৈধতাও লাভ করল ওই তত্ত্বটি।
হান্টিংটনের বইয়ের প্রকাশের সময়কাল ছিল তার পক্ষে। অর্থাৎ ১৯৯১-এর ২৬ ডিসেম্বর শেষ পর্যন্ত, অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর এর তথাকথিত তাত্ত্বিক ভিত্তিভূমি ছিল ‘উন্মুক্ততা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন’। এর জন্য সবশেষ ব্যক্তি যিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার জন্য দায়ী, তিনি হলেন মিখাইল গর্ভাচপ। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল পুরো বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক শক্তি তারাই। আবার আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে সব। অতিউৎসাহী ফ্যান্সিস ফুকাইয়ামা স্বল্পকালেই লিখলেন, End of History and the last man’ নামের একটি আস্ত বই। ১৯৯২ সালের গ্রীষ্মে প্রকাশিত তিনি এই বইয়ে তত্ত্ব দিলেন যে, পশ্চিমা ধাঁচের উদার গণতন্ত্রই মানবজাতির জন্য শেষ আদর্শ। ফুকাইয়ামার আনন্দের উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, টাইম ম্যাগাজিনের সমালোচনা করে বলেছিল, Begnning of nonseuse(আজেবাজে বা অর্থহীন ভাবনার) সূচনা, যা হোক এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা চলে, ওটাই ছিল কূটকৌশলের শুরু। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার কারণে এর আগে-পরে ১৫টি ছোট-বড় আলাদা আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়।
স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার বইয়ে বললেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং গণতন্ত্রায়ণের পথে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনে এই আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয় যে, বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক বিপ্লব অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সমাপ্ত হবে এবং এর ভেতর দিয়ে পশ্চিমা ধাঁচের মানবাধিকার ধারণা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমগ্র বিশ্বে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে। এখানে বলা প্রয়োজন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব বিষয়টি লুফে নিল।
হান্টিংটনের বইজুড়ে যে ভুয়া বা মতলবি বয়ানÑতার কারণ হচ্ছে, ইসলাম হচ্ছে জঙ্গি আদর্শ এবং মুসলমান দেশগুলো হচ্ছে এর রাষ্ট্রকাঠামো। এ বিষয় আলোচনা করা উচিত এ কারণে যে আজকের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ফিলিস্তিনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, তথাকথিত আরব বসন্ত, সাম্রাজ্যবাদের মদতে জঙ্গিবাদের উত্থান, উইপন্স অব ম্যাস ডেসট্রাকশনসহ যাবতীয় যা হচ্ছে তা এক সূত্রে গাঁথা। যদি হান্টিংটনদের মতলব এবং ফন্দি-ফিকিরের ‘ভিত্তিভূমি’, যা তৈরি করা হয়েছে, অনেক আগে থেকেই তা না জানা থাকলে বোঝা যাবে না কোনো কিছুই। এ বিষয়গুলো বুঝতে গেলে হান্টিংটনের মাধ্যমে তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দুনিয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া বোঝা যাবে না। এ জন্যই এ বিষয়ে কিছুটা আলোচনা করা জরুরি বলে মনে করি।
হান্টিংটনের মতলবি ফাটল তত্ত্ব
স্যামুয়েল হান্টিংটন তার কল্পিত সভ্যতার ফাটল দেখতে পেয়েছেন এবং ছোট দেশগুলো, যার নাম তিনি দিয়েছেন বিধ্বস্ত বা ছিন্ন রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রগুলো ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা বা অবস্থান থেকে এসেছে। এতে দুঃখবোধ করে তিনি বলেন, এই দেশগুলো আগে ঐকমত্য আসতে ব্যর্থ হয় যে, অপাশ্চাত্য থেকে পাশ্চাত্যে সভ্যতার অনুসারী হয়ে উঠুক। তার পুরো তত্ত্বগত অবস্থান হচ্ছেÑপ্রভাব বিস্তারকারী পশ্চিমা ব্যবস্থার মধ্যে সবাই আধুনিকতা খুঁজুক। এ ক্ষেত্রে তিনি ১৬০০ শতকে রাশিয়ায় দাড়ি কামিয়ে টুপি বর্জনের সম্রাট পিটারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি ধীরে ধীরে সভ্যতার শত্রু হিসেবে ইসলাম অথবা মুসলমানদের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এই বলে যে, ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা সমাজ বহুত্ববাদী। আর এই সমাজ বা গোষ্ঠী রক্তের সম্পর্কের ওপর গড়ে ওঠেনি।
এদিকে বার্নাড লুইস তার Islam and the west নামক বইয়ে ১০৯৫ সালে খ্রিষ্টানদের ‘ক্রুসেড’ শুরুর প্রশংসা করে বলেন, প্রায় এক হাজার বছর ধরে মুসলমানদের প্রথম স্পেন বিজয় থেকে তুর্কিদের ভিয়েনা জয় পর্যন্ত ইউরোপে সবাই মুসলমানদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত।
হান্টিংটন মুসলমানদের সঙ্গে মাত্র ছয়টি যুদ্ধ নিয়ে গবেষণার নামে (তিনটি বর্তমান এবং তিনটি ঐতিহাসিককালের) এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, এক. ইসলাম শুরু হয়েছিল তরবারির মাধ্যমে পরিচালিত ধর্ম হিসেবে। দুই. মুসলমানরা নাস্তিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের পর নিজেরাই জিহাদের পরিবর্তে ফিতনার জন্য যুদ্ধ শুরু করে, যা ইসলামের অহিংসতার পরিপন্থী। তিন. ইসলামে দারুল ইসলাম এবং দারুল হর্ব-এর মধ্যে সমঝোতার কোনো পথ খোলা নেই।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে হান্টিংটন ইসলামি পুনর্জাগরণ এবং মৌলবাদকে এক করে ফেলেছেন। তবে আবার একই পাতায় স্ববিরোধী বক্তব্যে বলেছেন, ইসলামি পুনর্জাগরণ এমন এক ধারণা, যার মাধ্যমে মুসলমানরা পাশ্চাত্য আইনের স্থানে ইসলামের আইনের পুনঃস্থাপন চায়। আর মৌলবাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ইসলাম। মৌলবাদের উত্থান সম্পর্কে ১ ৯৭০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবকদের সংখ্যা বৃদ্ধি বা স্ফীতি একটি বিরাট কারণ বলে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে সিরিয়া, ইরান, ইরাক, বাংলাদেশ, ওমান, তুরস্কসহ অন্তত তিন ডজনের বেশি দেশের নাম রয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যুবস্ফীতির সঙ্গে মৌলবাদের সম্পর্ক কোথায়?
হান্টিংটন এ থেকে উত্তরণের জন্য সর্বজনীন সভ্যতার কথা বলতে গিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন। তিনি তার কথিত তত্ত্ব মোতাবেক, পাশ্চাত্যের মাধ্যমে অন্যান্য সভ্যতার ওপর পশ্চিমা জগতের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে খুবই গুরুত্ব দেন। এভাবে তেল সম্পদের ওপরে অন্য কোনো শক্তিÑযেমন : চীন ও রাশিয়া যেন হাত না বাড়াতে পারে, সেদিকে নজরদারির পরামর্শ দিয়ে বলেন, যুদ্ধের সময় যাতে আরব দেশগুলো যেমন ইসলামি উগ্র শক্তির দখলে চলে না যায়।
হান্টিংটন সম্পর্কে আলোচনার কারণ এখানে যে, পশ্চিম কীভাবে ইসলামকে দেখবে এবং মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে, তার তাত্ত্বিক ভিত্তিভূমি তারই তৈরি। উল্লেখ্য, পশ্চিম কীভাবে দেখছে, তা না বুঝলে ইরান যুদ্ধ সম্পর্কে সঠিকভাবে বোঝাপড়া এবং মোকাবিলা সম্ভব নয়।
পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্যবাদ
স্যামুয়েল পি হান্টিংটনই যে প্রথম ইতিহাসে সভ্যতার তথাকথিত সংঘাত বা ফাটলরেখা অঙ্কন করেছেন, তাই নয়। এ কাজটি করা হয়েছে আরো দুবার। একবার ১০৯৫ সাল থেকে কয়েক বছর মুসলমান বনাম খ্রিষ্টানদের ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে।
দ্বিতীয় দফার বিভাজনরেখাটি টানা হয় ঔপনিবেশিকতাকেন্দ্রিক। যে দেশগুলোয় পশ্চিমা লুণ্ঠনকারী শক্তি বিশ্বের দেশে দেশে মহালুণ্ঠন চালায়, তারা উপনিবেশিত বা ঔপনিবেশিকতার মধ্যে ছিল, তারা হয়ে পড়ল নিম্নবর্গের। আর যারা অর্থাৎ পশ্চিমা শক্তিগুলো যেসব দেশে উপনিবেশ বিস্তার করে, তাদের শুধু অর্থনৈতিকই মহালুণ্ঠন যতই হয়, ওইসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতি, সুমহান সভ্যতা ধ্বংস করে ফুলে-ফেঁপে উঠল, তারা পরবর্তীকালে হয়ে উঠল ‘সভ্য দুনিয়া’ অথবা পাশ্চাত্য বা পশ্চিম। আর প্রাচ্য বা Orient হয়ে পড়ল তাদের কাছে ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্র অথবা অঞ্চল হিসেবে তাদের অপর একটি নাম দেওয়া হলো তৃতীয় বিশ্ব।
১৯৯৩ সালের ১৮ এপ্রিল টাইম ম্যাগাজিনে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।
‘কলোনিয়ালিজম’জ ব্যাক’ অ্যান্ড এ মোমেন্ট টু স (উপনিবেশবাদ শিগগিরই ফেরত আসবে) শিরোনামে নিবন্ধ লেখা হয়, সভ্য জাতিগুলোর (পাশ্চাত্য) উচিত নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে আবার উপনিবেশে ফিরিয়ে আনা, যেখানে সভ্য জীবনের অতি মৌলিক শর্তগুলো ভেঙে পড়েছে। এর জবাবে পণ্ডিত, রাজনীতিবিজ্ঞানী অ্যাডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ বলেন, সংস্কৃতি ও সভ্যতা এত বেশি পরস্পরনির্ভর ও সম্পর্কিত যে, এগুলোর একক বা সোজা ছককাটা বর্ণনা সম্ভব নয়। শুধু গুটিকয় মূল্যবোধের জন্য বিচ্ছিন্ন শ্রেষ্ঠত্বের ভাব নিয়ে আজকে কেউ কি বলতে পারে, পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্পর্কে, শুধু মোটাদাগের কল্পকাহিনি ছাড়া। যদিও যুদ্ধজয়, দেশান্তর ইত্যাদি ছাড়া মূল্যবোধের খুব একটা অর্থ নেই। যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এ কথা বিশেষভাবেই সত্যি। (তথ্য সূত্র অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ, অরিয়েন্টালিজম, বাংলা ভাষান্তর, ফয়েজ আলম, র্যামন পাবলিশার্স পৃষ্ঠা : ৪৬০)
অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ আরো বলেন, ইহুদি বিরোধিতা ছাড়া, আরবরা তেল রপ্তানিকারকও। এটি তার নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য (পশ্চিমের দৃষ্টিতে)। তেলের এমন বিশাল সঞ্চয়ের মালিকানা লাভের উপযুক্ত নৈতিক যোগ্যতা নেই ওদের (মুসলমানদের)। সাঈদ আরো বলেন, এমন পরামর্শ ও উত্থাপিত হয় যে, আরব তেলক্ষেত্রগুলো মার্কিন মেরিন সেনাদের দিয়ে দখল করিয়ে নেওয়া উচিত।
পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন হান্টিংটনের তত্ত্ব, আরবসহ উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো কেন পশ্চিমের টার্গেট। এই অঞ্চলের দেশগুলোর অধিকাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলমান। এ কারণে পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে শিয়া-সুন্নিসহ মুসলমানদের নানা বিভাজনের তত্ত্ব প্রচার করা হয়।
টার্গেট ইসলাম এবং তেলসম্পদ
কেন ইসলামকে টার্গেট করা হয়েছে, এ সম্পর্কে বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে এ বিষয়টি বুঝতে হবে যে, ইসলামের নামে আসল টার্গেট আরবসহ ওই অঞ্চলের তেলসম্পদ। কেন ইসলাম টার্গেট সে সম্পর্কে অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ তার অপর গ্রন্থ Covering Islam-এ বলেছেন, ইসলামের প্রত্যাবর্তন কোনো একীভূত ও সম্পৃক্ত আন্দোলন নয়। বরং এটি নির্দেশ করে কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতা। সাঈদ এ ক্ষেত্রে ইমাম খোমেনি, গাদ্দাফি, আনোয়ার সাদাতের কথা উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় এ হচ্ছে তাদের জন্য বিপর্যয়কর এক শক্তি, যাকে পশ্চিম কখনো উৎসাহিত, কখনো দমন করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে।... তেলে ধনী দেশগুলোর দরকারি সম্পদের অভাব আছে, তা নয়। যার অভাব আছে, তা হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য Covering Islam-এ পৃষ্ঠা ১১৫-১১৬)
অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ বলেছেন, পশ্চিমের চৈতন্যে, বিশেষ করে আমেরিকার মনোভাব বিরূপভাবে সমস্যাগ্রস্ত ও সংকটজনক। পশ্চিমের এমন উপলব্ধির পেছনের কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণটি হচ্ছে জ্বালানি তেলের স্বল্পতা এবং তার কেন্দ্রে আছে আরব ও উপসাগরীয় তেল।
তেলসম্পদ এবং ইরান
লেবাননি বংশোদ্ভূত অধ্যাপক এবং রাজনীতিবিজ্ঞানী গিলবার্ট আচকার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ত্রৈমাসিক জ্যাকবিনের সঙ্গে। গিলবার্ট ওই সাক্ষাৎকারে (যা প্রকাশিত হয় ৩ মার্চ ২০২৬) বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার অঞ্চলটি ১৯৪৫ সালের পর থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সশস্ত্র সংঘাতের সাক্ষী। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে ইরাক যুদ্ধের পর স্বাধীন বোধ করে। তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন কীভাবে মার্কিন শক্তিসহ পশ্চিমা এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সঙ্গে তেলসমৃদ্ধ অনেক দেশের সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করেছে। ২০১৫ সালে সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।
গিলবার্ট আচকার বলেন, যুদ্ধের ব্যাপকতার কারণ স্পষ্ট। আর তা হচ্ছে তেলের অভিশাপ হিসেবেই একে দেখতে চান অনেকে। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে উপসাগরীয় দেশগুলোসহ ওই অঞ্চলে তেলের মজুত আছে এবং যা উত্তোলনের তুলনামূলক সহজলভ্যতা। আর দাম কম থাকায় লাভজনক। গিলবার্ট বলেন, ইসরাইলিদের লাভ নানামুখী।
যারা ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত প্রখ্যাত ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক Anthony Sampson-এর The Seven Sisters : The great oil companies and the world : They shaped, (Viking press Publication) পড়েছেন, তারা জানেন কীভাবে ১৯৪০-এর দশক থেকে এক্সন, পেল, বিপি, শেভরন গাল্ফওয়েল, টেক্সাকো নামের তেল কোম্পানিগুলো তেলসম্পদ নিয়ে অবাধ লুটপাট করেছে। তারা প্রয়োজনে সরকারের পতন ঘটিয়েছে। এরই একটি নমুনা হচ্ছে ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকার যখন প্রধানত ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি)সহ কয়েকটি আমেরিকান এবং ব্রিটিশ তেল কোম্পানিকে ইরানে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং এর আগে তেলসম্পদ জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়, তখন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অপারেশন অ্যাজাক্স (Operation Ajax) নামের ওই অপারেশনের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট প্রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দালাল রেজা শাহ পাহলবির সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়। এটাই হচ্ছে তেলের অপরাজনীতি।
পরে আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ইরান। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এবং একই বছরের জানুয়ারিতে আমেরিকানসহ পশ্চিমের পুতুল সরকারপ্রধান রেজা শাহ পাহলবির দেশত্যাগ অঞ্চলজুড়ে এক ভিন্ন যুগের সূচনা করে। এরই মধ্যে ১৯৭৯-এর ৪ নভেম্বর একদল বিপ্লবী ছাত্র তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং সব কূটনীতিককে জিম্মি করার ঘটনা ঘটান। আমেরিকাসহ পশ্চিমা দুনিয়া আজও তা ভুলতে পেরেছে বলে মনে হয় না। অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ বলছেন, এরপর থেকে ইরানকে মানবেতর দৈত্য হিসেবেই পশ্চিমারা মনে করে।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, তেলসম্পদে সমৃদ্ধ সৌদি, কুয়েতসহ মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য এবং পশ্চিমা দুনিয়ার নির্লজ্জ দালালি পশ্চিমকে তেলসম্পদের ওপর অবাধ কর্তৃত্বের পাহারাদার হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
আরব বসন্ত
আরব বসন্ত বা Arab Spring ছিল শাসক বদলের নামে তেলসম্পদের ওপরে পশ্চিমাদের কর্তৃত্ব স্থাপন, বিশেষ করে আমেরিকার। এর পেছনে কাজে খাটানো হলো এক কূটকৌশল চাল বা চক্রান্ত। আরব বসন্তের জন্য যৌক্তিক কারণ ছিল না, তা নয়। তেলসম্পদে সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় রাজকীয় শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের গণঅসন্তোষ, অর্থনৈতিক ও জীবনমানের উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার দাবিতে ২০১০-এ প্রথমে উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের গণআন্দোলন শুরু হয় এবং ২০১০-১১-এর মধ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে লিবিয়া, সিরিয়া, আলজেরিয়া, বাহরাইন, মিসর, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে। লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফি নির্মমভাবে নিহত হন। মিসরে হোসনি মোবারকসহ বিভিন্ন দেশে শাসক বদল হলেও জনগণের কোনো দাবিই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ‘ভাঙাচোরা’ যে তথাকথিত সামাজিক চুক্তি হয়েছিল, তাতে ওইসব দেশের তেলসম্পদসহ সম্পদের অধিকার চলে যায় আমেরিকাসহ সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে। বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন তেল সাম্রাজ্যবাদের জঘন্যতম এক খেলা। এখানে বলা প্রয়োজন, ইরাকে আগেই উইপন্স অব ম্যাস ডেসট্রাকশনের নামে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করা হয়।
এ বিষয়গুলো অর্থাৎ সামগ্রিক প্রেক্ষাপট জানা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সমন্বয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পুরো চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
ইরানের পরমাণু সম্ভাবনার কথা বলে যে যুদ্ধ তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রধান, না ইসরাইলের সে বিষয়টি বোধ করি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা-পর্যালোচনা জরুরি। ইসরাইল এমন কোনো শত্রুরাষ্ট্র থাকুক, তা চায় না। কারণ এতে তার বৃহত্তর ইসরাইল এবং এ লক্ষ্যে যুদ্ধবাজ নীতিকৌশলের শ্রেষ্ঠত্ব বিনষ্ট হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের শাসক এবং শাসনব্যবস্থা বদল।
আর এখানেই ঐতিহাসিক ভ্রান্তিটি কাজ করেছে। ইসরাইল এবং আমেরিকার দীর্ঘ মেয়াদের কৌশলগত ক্ষতি হয়েছে, যা সামাল দেওয়া অসম্ভব। ইরানের নৈতিক এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা যদি হেরেও যান, তবু ঐতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে তারাই বিজয়ী।
তবে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরো লেখার ইচ্ছে নিয়ে শেষ করার আগে বলা প্রয়োজনÑযুদ্ধ শুরু করা সহজ, শেষ করা কঠিন।
লেখক : গবেষক