ভোটের মাঠে বাড়ছে সহিংসতা
নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের সময়ই সহিংসতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই সেই পুরোনো আশঙ্কাই আবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার বদলে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা, বাগ্যুদ্ধ ও সহিংস ঘটনার খবর নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
প্রচার শুরুর পর প্রথম দিকে অনেক এলাকাতেই তুলনামূলকভাবে শান্ত পরিবেশ লক্ষ করা গিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেভাগেই প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনি আচরণবিধি মানার ওপর জোর দেয়। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। একের পর এক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, প্রচারে বাধা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনাকর তৎপরতা সরাসরি সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় দেশের অন্তত ১০টি জেলায় নির্বাচনি সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এমনকি শেরপুরের ঝিনাইগাতী এলাকায় সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের ওপর হামলা, ডিম নিক্ষেপ, সমর্থকদের মধ্যে মারামারি, এমনকি নারী কর্মীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহত করার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও রাজনৈতিক ইশতেহার পাঠের অনুষ্ঠান সহিংসতায় রূপ নিয়েছে, কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় হতাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে এবং নির্বাচন নিয়ে আস্থা নড়বড়ে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়ানক। কারণ আসন্ন নির্বাচনটি অতীতের যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের জনগণ একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরত পেয়েছে। স্বভাবতই এই নির্বাচন ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। সেইসঙ্গে রয়েছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের কাঠামো নির্ণায়ক গণভোট। শুধু তা-ই নয়, পলাতক ফ্যাসিস্টরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এই নির্বাচনটি বানচাল করতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো থেকে শুরু করে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও অপারেশন পর্যন্ত সব ধরনের প্রচেষ্টাই তারা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশপন্থি সব পক্ষকে অত্যন্ত সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে যে, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত হলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা আরো দৃশ্যমান ও কার্যকর হতে হবে, যাতে আচরণবিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই ছাড় পাওয়ার আশা না করে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।