ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরাইল অক্ষশক্তির ক্রমবর্ধমান সংঘাতে ভারত কোনো পক্ষের হয়ে লড়ছে না। কিন্তু তারপরও এই যুদ্ধে ইরান হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন অবরোধ করে রাখলে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে ভারতের চেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা আর কোনো দেশেরই নেই। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন ভারতীয় বিশ্লেষকরাই। এর কারণ, হরমুজ প্রণালি তেল সরবরাহের সবচেয়ে সংকীর্ণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ, যা দিয়ে সাগরপথে রপ্তানি করা তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবহন করা হয়। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত। এখনো প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়েই আমদানি করতে হচ্ছে ভারতকে। তাই ইরান যুদ্ধ ভারতের জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করেছে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা উপসাগরীয় দেশগুলোই প্রধান অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হবে। কিন্তু এটি একটি ভুল হিসাব। সবচেয়ে গুরুতর এবং সবচেয়ে পদ্ধতিগত ক্ষতিটি হবে ভারতের। এই ক্ষতি শুধু ভারতের তেল আমদানিকেই ব্যাহত করবে না, একই সঙ্গে দেশটির সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য পাওয়ার বর্তমান ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়। তবে এতে বৈচিত্র্য আনার জন্য বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করা সত্ত্বেও তেমন কোনো সফলতা আসেনি। যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। ভারতের জন্য মূল ধাক্কাটি আসবে দেশটির কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারের মূল্য এবং এর অবাধপ্রাপ্যতা নিয়ে।
ভারতের আসল হুমকি নিহিত তার রাসায়নিক সার সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে ঝাঁকুনি দিয়েছে, তা সরাসরি ভারতের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। ভারত বছরে ৯০ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া আমদানি করে, যার প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, বিশেষ করে ওমান এবং সৌদি আরব থেকে।
শুধু সৌদি আরব থেকেই ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) আমদানি করা হয় চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি। পটাশের জন্যও ভারত প্রায় সম্পূর্ণই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। যদি ভারত রাসায়নিক সারের জন্য বিকল্প উৎস খুঁজেও পায়, দেশে তা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে সমস্যা থেকেই যাবে। ভারতের বেশির ভাগ ইউরিয়া প্লান্ট চলে প্রাকৃতিক গ্যাসে এবং কাতার হলো আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৃহত্তম সরবরাহকারী। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় কাতার থেকে সারের চালান আসা ব্যাহত হচ্ছে। এতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভারতের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ইউরিয়া ৪২৫ মার্কিন ডলারের কমে পাওয়া যেত। এখন দাম ৬০০ ডলার ছাড়িয়েছে। ধনী দেশ এবং বড় করপোরেশনগুলো বাড়তি দামে সার কিনে মজুত করবে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই সার কিনতে হচ্ছে, যা এই পণ্যের দাম আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। চীন ভারতের জন্য একসময় সারের নির্ভরযোগ্য বিকল্প উৎস ছিল। কিন্তু চীন সার রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় ভারতের সার সংকট কাটিয়ে ওঠার সেই পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
ভারতে সারের দাম এবং মানুষের দারিদ্র্যের মধ্যে সম্পর্কটি সরাসরি। যখন আমদানি করা সারের দাম বেড়ে যায়, তখন সরকারকে হয় ভর্তুকি দিতে হয় অথবা তা কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ভর্তুকির পরিমাণ ইতোমধ্যেই আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। ২০২৫-২৬ সালের জন্য সারে ভর্তুকির বাজেট প্রায় ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন রুপি ধরা হয়েছে। সারের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে এর আমদানি ব্যয় আকাশচুম্বী হলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস পেলে এই আর্থিক বোঝা ভারতের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে।
ভর্তুকি কমানো হলে কৃষকরা কম সার ব্যবহার করেন। এর অর্থ হলোÑফসলের ফলন কমে যাবে এবং খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাবে। চাহিদা অপরিবর্তিত থাকলে এবং ভারত সরকারকে ১৪০ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে হলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। এখানেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কাটি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। ভারতের দরিদ্ররা তাদের আয়ের ৫০-৬০ শতাংশ খাদ্যের জন্য ব্যয় করেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি সমীক্ষা অনুসারে, খাদ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে অতিরিক্ত ৩ কোটি লোক ভারতীয় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারেন।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কমিশন (এসক্যাপ) সতর্ক করেছে, খাদ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে এশিয়ায় ৬ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। আর এর সবচেয়ে বড় বোঝাটি বহন করবে ভারতকে। ভারতে ইতোমধ্যেই ২৩ কোটিরও বেশি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। খাদ্যপণ্য মূল্যের ধারাবাহিক বৃদ্ধি শুধু এ সংখ্যাই বাড়াবে না, এটি অপুষ্টিকেও স্থায়ী এবং শিশুদের বিকাশ ব্যাহত করবে।
এভাবেই একটি দূরবর্তী নৌপথে সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত ভারতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে। এই ক্ষতি শুধু দরিদ্র বা কৃষি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ক্রমবর্ধমান খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মিশে যাবে। এর ফলে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হবে, যা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হবে।
ভারতের জ্বালানি ও সার আমদানির বিকল্প পথগুলো ট্রানজিটের সময় কয়েক সপ্তাহ এবং আমদানি ব্যয় শত শত কোটি ডলার বাড়িয়ে দেবে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১ ডলার বাড়লে ভারতের বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বাড়ে। ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যারেলপ্রতি দাম ১৩০ ডলারে পৌঁছার আশঙ্কা রয়েছে। আর তাহলে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের আনুমানিক ৭ থেকে কমে ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা আমদানি করা উপকরণের ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হচ্ছে পরিবহনের জন্য তেল, সার উৎপাদনের জন্য গ্যাস এবং তৈরি সার। এই নির্ভরশীলতা হলো কয়েক দশকের এমন সব নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল, যা ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য ও জ্বালানির মাধ্যমে শহুরে ভোক্তাদের অগ্রাধিকার দিয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ভিত্তি হিসেবে থাকা সরবরাহ শৃঙ্খলকে পর্যাপ্ত সুরক্ষিত করেনি।
এর ফলে ভারতের অর্থনীতি স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা সামলাতে সক্ষম কৌশলগত মজুত, বহুমুখী উৎস এবং কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা সুরক্ষা দিয়ে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনো বিপর্যয়ের মুখে এটি বিপজ্জনকভাবে অরক্ষিত।
ইরান যুদ্ধ হয়তো দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে, হরমুজ প্রণালিও আবার খুলে যাবে এবং ভারতের তেল সরবরাহ প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক হবে। কিন্তু পরবর্তী সংকট যেটি আসবে সেটি সামরিক, জলবায়ুগত বা ভূরাজনৈতিক যাই হোক না কেন, তা ভারতের এই দুর্বলতাকে আবার কাজে লাগাবে। ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা এমন একটি অঞ্চলের শান্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে তার প্রভাব সীমিত এবং বলতে গেলে কোনো মিত্রও নেই।
মূল কথা হলো, তেলের দামের ওপর গতানুগতিক মনোযোগ মূল বিষয়টিকে বরাবরই এড়িয়ে যায়। অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্য সবসমমই ভোগায় ভারতকে। খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে ভারতে অতিরিক্ত তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়বে। আর যদি ২০ শতাংশ বাড়ে, যা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে খুবই সম্ভব, তখন তা ভারতের জন্য একটি মানবিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
যুদ্ধে সরাসরি জড়িত দেশগুলো সামরিক ব্যয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহতের খরচ বহন করবে। অন্যদিকে, যুদ্ধ থেকে দূরে থাকা ভারত তার ক্ষতিকে অপুষ্টি, দারিদ্র্য এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতার মতো মানবিক দুর্দশার অঙ্কে হিসাব করবে। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হতে একটি দেশকে একটি গুলিও চালাতে হয় না। গোলাগুলির মধ্য দিয়ে আসা পণ্যের ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল হওয়াই তার জন্য যথেষ্ট। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া সেই সতর্কবার্তাই দিয়েছে ভারতকে। এর কোনো অস্থায়ী সমাধান নয়, বরং তার জনগণের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা, অর্থাৎ দেশের জনগণের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে ভারতকে।
এশিয়া টাইমস অবলম্বনে মোতালেব জামালী