হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

শরিয়াহ, ভীতি : ভুল বোঝাবুঝির রাজনীতি

ডা. মো. এনামুল হক

প্রতীকী ছবি

‘শরিয়াহ’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই পশ্চিমা সমাজে যেমন একধরনের আতঙ্ক ও প্রতিরোধী মনোভাব জন্ম নেয়, তেমনি আশ্চর্যজনকভাবে বহু মুসলিম সমাজেও তা হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর, কখনো কখনো ভয়ের প্রতিশব্দ। অথচ যে শরিয়াহ মূলত ন্যায়, করুণা, মানবিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার নৈতিক কাঠামো—তা আজ কীভাবে রূপ নিয়েছে ‘ভীতিকর আইনব্যবস্থা’র প্রতীকে? এই ভীতি আকস্মিক নয়; এটি গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, ঔপনিবেশিক বয়ান, মিডিয়ার একপেশে উপস্থাপনা এবং কিছু বিকৃত ও চরমপন্থি প্রয়োগের সম্মিলিত ফল হিসেবে। ফলে শরিয়াহ আজ আর শুধু একটি ধর্মীয় পরিভাষা নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের এক বিতর্কিত প্রতীক—যার প্রকৃত অর্থ এবং বিস্তৃতি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে ভয় ও ভুল বোঝাবুঝির ঘন কুয়াশায়।

ইসলামে শরিয়াহ কোনো বিচ্ছিন্ন দণ্ডবিধি বা শাস্তিকেন্দ্রিক আইনসমষ্টি নয়; বরং এটি আল্লাহপ্রদত্ত সেই সামগ্রিক জীবনদর্শন, যা মানুষের বিশ্বাস, আচরণ, সম্পর্ক ও সমাজকে ন্যায়ের পথে বিন্যস্ত করে। আরবি শর ধাতু থেকে আগত এই শব্দের আদি অর্থই হলো—পানির পথে পৌঁছানোর সরল ও নিরাপদ রাস্তা। আল-কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়ে ওঠা এই পথনির্দেশ মানুষকে শুধু ইবাদতের কাঠামো দেয় না; বরং নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক ভারসাম্যের এক সুসংহত নীতিমালা প্রদান করে। ইমাম শাতিবী তার আল-মুওয়াফাকাত-এ ইঙ্গিত দিয়েছেন, শরিয়াহ মূলত মানুষের কল্যাণের জন্যই অবতীর্ণ—কঠোরতা নয়, বরং কল্যাণই তার অন্তর্লক্ষ্য।

এই শরিয়াহ ঐতিহাসিকভাবে কয়েকটি মৌলিক পরিসরে প্রবাহিত হয়েছে—ইবাদাত, যেখানে মানুষ তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে; মু’আমালাত, যেখানে সমাজ, পরিবার ও অর্থনৈতিক লেনদেন ন্যায়ের ছকে আবদ্ধ হয় এবং আখলাক, যেখানে আইন নয়, বরং বিবেক মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে লক্ষণীয় যে, ইসলামি ঐতিহ্যে আইন কখনো নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং আইন ছিল নৈতিকতার বাহন। এ কারণেই শরিয়াহকে শুধুই আদালতকেন্দ্রিক বা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের কাঠামো (ইকাবাত) হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত স্বরূপ আড়াল হয়ে যায়।

পরবর্তীকালে শরিয়াহ-চিন্তায় যে গভীর বৌদ্ধিক পরিণতি ঘটে, তার কেন্দ্রে রয়েছে মাকাসিদ আল-শারিয়াহ (Maqasid al-Shariah)—শরিয়াহর উদ্দেশ্যতত্ত্ব এবং তা হচ্ছেÑ

১. জীবন রক্ষা (Hifz al-Nafs)Ñহত্যা, আত্মহত্যা, স্বাস্থ্যবিধি, রোগ নিয়ন্ত্রণ, বিপজ্জনক কাজ থেকে বিরত রাখা।
২. ধর্ম রক্ষা (Hifz al-Din)Ñনামাজ, রোজা, ইসলামি শিক্ষা, পূজা, ধর্মীয় স্বাধীনতা।
৩. বুদ্ধি রক্ষা (Hifz al-Aql)Ñশিক্ষার অধিকার, মানসিক সুস্থতা, মাদক, নেশা, ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সুরক্ষা।
৩. সম্মান ও বংশ রক্ষা (Hifz al-Nasl)Ñপরিবার, বিয়ে, সামাজিক মর্যাদা, শালীনতা, আইনগত নিরাপত্তা।
৪. সম্পদ রক্ষা (Hifz al-Mal)Ñচুরি, জালিয়াতি, ঘুস, সুদ, প্রতারণা, মাপে কম দেওয়া, জবরদখল, ব্যবসায় ন্যায়, সম্পদ ও অর্থের নিরাপত্তা।

৫. ন্যায় ও সামাজিক শান্তি (Adl & Salam)Ñসামাজিক বিচার, দ্বন্দ্ব সমাধান, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
৬. মানব মর্যাদা ও মানবাধিকার (Karama & Human Rights)Ñসমাজের বঞ্চিতদের সুরক্ষা, নারী ও শিশু অধিকার, বৈষম্য দূরীকরণ।

৭. পরিবেশ সংরক্ষণ (Environment Protection)Ñজমি, জল, বন, প্রকৃতির সুরক্ষা, বৈশ্বিক দায়িত্ব।

ইমাম শাতিবীর ধ্রুপদি বিশ্লেষণে যেখানে জীবন, ধর্ম, বুদ্ধি, বংশ ও সম্পদের সুরক্ষা ছিল মূল লক্ষ্য, সেখানে আধুনিক যুগে ইবনে আশুর, মুহাম্মদ হাশিম কামালি ও জাসের আওদার মতো চিন্তাবিদরা এই পরিসরকে সম্প্রসারিত করে ন্যায়, মানব মর্যাদা, সামাজিক শান্তি ও এমনকি পরিবেশ সংরক্ষণকেও শরিয়াহর অন্তর্গত উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Maqasid al-Shari‘ah al-Islamiyyah, Ibn Ashur)। ফলে শরিয়াহ আর শুধু ‘কী হারাম’ বা ‘কী বৈধ’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ‘কীভাবে মানুষ নিরাপদ, সম্মানিত ও ন্যায্য জীবন পাবে’Ñসেই মৌলিক জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়।

এ কারণেই বাস্তব জীবনে শরিয়াহর প্রয়োগ মানে শুধু আদালত বা শাস্তি নয়; বরং তা প্রতিফলিত হয় ন্যায্য ব্যবসায়, দুর্নীতিবিরোধী নৈতিকতায়, পারিবারিক দায়িত্ববোধে, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষায়, এমনকি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণেও। একজন চিকিৎসকের রোগীর প্রতি আমানাহবোধ, একজন ব্যবসায়ীর মাপে ও দামে সততা, একজন রাষ্ট্রকর্তার ন্যায়বিচার—এসবই শরিয়াহর নীরব কিন্তু গভীর প্রয়োগ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মানবিক বিস্তৃত চিত্রটি আড়াল হয়ে যায়, যখন শরিয়াহকে শুধু শাস্তির ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। অথচ প্রকৃত অর্থে শরিয়াহ হলো—আইনের পোশাকে নৈতিকতা আর নৈতিকতার ভেতর দিয়ে সমাজ রক্ষার এক পরিশীলিত সভ্যতাগত প্রয়াস।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তিন মূলনীতি—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এগুলো আদতে ইসলামি শরিয়াহর উদ্দেশ্যভিত্তিক দর্শন (Maqasid al-Shariah)Ñএরই আংশিক প্রতিফলন। মানুষের জীবন, সম্মান, অধিকার ও ন্যায়ের সুরক্ষাই যেখানে শরিয়াহর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য, সেখানে এই রাষ্ট্রীয় আদর্শগুলো নতুন আবিষ্কার নয়, বরং একই নৈতিক উৎসের আধুনিক পুনর্বয়ান। অথচ চটকদার স্লোগান ও রক্তাক্ত জুলাই সত্ত্বেও গত ৫৪ বছরে এমন রাষ্ট্র গড়ে ওঠেনি—কারণ ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে নৈতিক রাষ্ট্রদর্শনের বিচ্ছেদ এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রতন্ত্রের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। এর বিপরীতে ইসলাম শুধু আদর্শ ঘোষণায় নয়, ইতিহাসে একটি কাঙ্ক্ষিত সমাজ ও কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের গভীর নৈতিক তত্ত্ব ও কার্যকর প্রয়োগও উপস্থাপন করেছে।

শরিয়াহ নিয়ে রাজনৈতিক বিভ্রাটে কেউ চরম বিরোধী, কেউ হঠাৎ আইনপ্রণয়নে আগ্রহী, তাদের জন্য পরামর্শ হলো—অজ্ঞতা ও আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নেওয়া। শরিয়াহ শুধু আইন নয়; এটি নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক কাঠামো। তাই আগে বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি। দ্রুত ও একপক্ষীয় প্রয়োগ মানুষ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। সংলাপ, শিক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করেই এটি সুসংগত, কল্যাণমুখী ও ধারাবাহিকভাবে প্রবর্তন করা সম্ভব। কোরআন ও সুন্নাহ তাই আমাদের নির্দেশ দেয়।

শরিয়াহভীতি দূর করার প্রথম ধাপ হলো—শব্দটির অর্থ পুনরুদ্ধার। ‘শরিয়াহ’কে শাস্তির প্রতিশব্দ নয়, বরং ন্যায়, করুণা ও কল্যাণভিত্তিক জীবনদর্শন হিসেবে পুনঃউপস্থাপন করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন কোরআন–সুন্নাহ ও Maqasid al-Shariah-ভিত্তিক ব্যাখ্যা, যেখানে মানব মর্যাদা, সামাজিক শান্তি ও ন্যায়ের দিকগুলো সামনে আসে। দ্বিতীয়ত, মুসলিম সমাজকেই আত্মসমালোচনায় প্রবেশ করতে হবে; চরমপন্থি ও রাজনৈতিকভাবে বিকৃত প্রয়োগকে শরিয়াহর প্রতিনিধিত্ব দাবি করতে না দেওয়া—এটি নৈতিক দায়। তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যমে শরিয়াহর বাস্তব ও মানবিক প্রয়োগ—ব্যবসায় সততা, পরিবারে দায়িত্ববোধ, দুর্বলদের সুরক্ষা—এই অভিজ্ঞতামূলক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। চতুর্থত, পশ্চিমা সমাজের সঙ্গে সংলাপে প্রতিরক্ষামূলক ভঙ্গি নয়, বরং যুক্তিবাদী ও মানবিক ভাষা গ্রহণ জরুরি; ‘আইন বনাম স্বাধীনতা’ নয়, ‘ন্যায় বনাম বিশৃঙ্খলা’—এই বয়ানে কথোপকথন এগোতে হবে। সর্বশেষে, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ নয়, সামাজিক ন্যায় ও নৈতিক চর্চার মাধ্যমে শরিয়াহর সৌন্দর্য দৃশ্যমান হলেই ভীতি ধীরে ধীরে বিশ্বাসে রূপ নেবে।

লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক

বাবরির পর এবার মথুরা-বৃন্দাবনে শাহী মসজিদ ভেঙে মন্দির চত্বর, ঘোষণা যোগী আদিত্যনাথের

শাপলা চত্বরে ১১ দলের লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ শুরু

অর্থ নয়ছয়ের সুযোগ কম আগ্রহ নেই কর্মকর্তাদের

বিকল্প জ্বালানিতেই মুক্তি দেখছে সরকার ও বেসরকারি খাত

টিভির পর্দায় নারী এশিয়া কাপের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সঙ্গে থাকছে ইউএস ওপেনের রোমাঞ্চ

নোয়াখালীতে মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার ১৩

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত প্রতিমন্ত্রী আবুল বারীকে দেখতে হাসপাতালে রিজভী

স্ত্রীকে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যা

বিয়ে করলেন চাকসু ভিপি ইব্রাহিম

ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার নামে টাকা আদায়, যুবক গ্রেপ্তার