বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেসব নব্য বিএনপি ব্যক্তির চমকপ্রদ উত্থান ঘটেছে, তাদের মধ্যে ডা. জাহেদ-উর রহমান অন্যতম। প্রথমে তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর ‘স্ট্র্যাটেজিক উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
তিনি কি সরকারের, নাকি বিএনপির, নাকি উভয়েরই ‘স্ট্র্যাটেজি’ নির্ধারণের দায়িত্বে আছেন, সেটি অবশ্য আমার জানা নেই। সম্প্রতি তাকে সংস্কৃতি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুই অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তিনি এখন একের মধ্যে তিন। ২০১৮ সালে নির্বাসনে যাওয়া পর্যন্ত তাকে আমি চিনতাম না। বিএনপির কোনো আলোচনা অনুষ্ঠানেও দেখিনি। সম্ভবত ২০২১ সাল থেকে জানলাম যে তিনি লেখাপড়ায় ডাক্তার হলেও একজন আলোচিত ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটর, টকশো স্টার এবং শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচক।
২০২৪ সালে দেশে ফেরার পর তার কয়েকটি কনটেন্ট শুনে জানলাম তিনি ঘোরতর জামায়াত ও শিবিরবিরোধী এবং বিএনপির সমর্থক। আমার দেশ-এর সহকর্মীদের কাছ থেকে জেনেছি যে তিনি এখনো নাকি মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের একজন নেতা। সেটি হতেই পারে, কারণ তারেক রহমান নির্বাচনের অনেক আগে যে জাতীয় সরকারের ধারণা দিয়েছিলেন, সেখানে সমমনা দলের রাজপথের সাথিদের নিয়েই নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল।
ডা. জাহেদ-উর রহমান সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার কয়েকটি ইউটিউব কনটেন্ট মনোযোগ দিয়ে শুনে তার সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন বোঝার চেষ্টা করেছি। ডা. জাহেদ-উর রহমানের নিজের বর্ণনা থেকেই তার চিন্তাচেতনা পাঠকদের এবার জানানোর চেষ্টা করব—
১. ডা. জাহেদ বাংলাদেশে প্রথম আলোকে একমাত্র ‘হ্যাডমওয়ালা, সেক্যুলার এবং লিবারেল’ সংবাদপত্র মনে করেন। ব্রাহ্মণ প্রথম আলো ছাড়া দেশের বাদবাকি মিডিয়া তার কাছে নিতান্তই নমঃশূদ্র।
২. হ্যাডমওয়ালা প্রথম আলোর একজন কলামিস্ট হিসেবে ডা. জাহেদের বেজায় গর্ববোধ রয়েছে।
৩. একসময় তারেক রহমানকে অন্যায় সমালোচনা করে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার কিছুটা ভুল করলেও মাহফুজ আনাম হাসিনার আমলে এক-এগারোর সময়কার সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করায় সেই অপরাধ এখন মিটে গেছে। তাই তার ভাষায় রাজনীতির ‘সুপার পাওয়ার’ বিএনপির মিডিয়ার ব্রাহ্মণ হাউসকে কোলে তুলে নেওয়া উচিত।
৪. আমার দেশ-এর প্রতি ডা. জাহেদ এতটা তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করেন যে তিনি কনটেন্টে একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে আমাদের হেয় করার লোভ সংবরণ করতে পারেননি। নাম উহ্য রেখে আমাদের পত্রিকা সম্পর্কে তার কনটেন্টে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য নিম্নরূপ—
‘একটি পত্রিকা বন্ধ থাকার পর চালু হয়ে মনে করেছিল কী না কী হয়ে যাবে।’
আমার দেশকে লক্ষ্য করে উপরোক্ত মন্তব্য থেকে যে কেউ মনে করবেন আমরা চালাতে না পেরে কিংবা নিজের ইচ্ছায় ২০১৩ সাল থেকে পত্রিকা বন্ধ করে রেখেছিলাম এবং বিপ্লবের সুযোগ নিয়ে নতুন করে প্রকাশিত হওয়ার পর গত এক বছরে আমার দেশ মিডিয়া জগতে কোনো ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। দীর্ঘ পনেরো বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে যে ভয়ংকর নিপীড়ন চালিয়েছে, সেটিও স্ট্র্যাটেজি, সংস্কৃতি এবং তথ্য উপদেষ্টা তার কনটেন্টে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপেক্ষা করেছেন। আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের মধ্য দিয়ে বরং পত্রিকা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তার ব্যক্তিগত সন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ডা. জাহেদের আদর্শগত কারণে কোনো বিশেষ পত্রিকার প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং অন্য একটির প্রতি চরম বিদ্বেষ থাকতেই পারে। কিন্তু সরকারের অতীব প্রভাবশালী উপদেষ্টার এ-জাতীয় পক্ষপাতপূর্ণ আসক্তি আমাদের ফ্যাসিবাদের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
মইন-ফখরুদ্দীনের ভারতপন্থি সামরিক অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের ১৭ বছর (২০০৭-২০২৪) হ্যাডমওয়ালা প্রথম আলো-ডেইলি স্টার এবং আমার দেশ-এর ভূমিকার তুলনামূলক আলোচনার আগে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের মাফ চাওয়ার যে গল্প ডা. জাহেদ-উর রহমান শুনিয়েছেন, সেটি যে ভুয়া, তার প্রমাণ দেওয়া আবশ্যক।
প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার এক-এগারো এবং শেখ হাসিনার পুরোটা শাসনকাল প্রধানত শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং জাতীয়তাবাদী দলের বিরুদ্ধে অর্ধসত্য এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যনির্ভর নোংরা ব্যক্তিগত চরিত্র হননসহ যাবতীয় প্রোপাগান্ডা চালালেও শেখ হাসিনার আমলে ডেইলি স্টার সম্পাদক ব্যক্তিগতভাবে শুধু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি আজ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমানের কাছে মাফ চাওয়া তো দূরের কথা, কোনো রকম দুঃখ প্রকাশও করেননি। বরং কিছুদিন আগে বিএনপির এক অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বক্তৃতাকালে প্রকারান্তরে তার পত্রিকার বিএনপিবিরোধী সংবাদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
তিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবল ক্ষমতাধর, আমার দেশবিদ্বেষী উপদেষ্টার আক্রোশ উৎপাদনের ঝুঁকি নিয়েও ইতিহাসের খাতিরে এবার প্রথম আলো এবং আমার দেশ-এর ভূমিকার তুলনামূলক আলোচনায় যেতে হচ্ছে। প্রথম আলো যখন বিএনপির ভাবমূর্তি নিকেশ করার মিশন নিয়ে মইন-ফখরুদ্দীন এবং হাসিনার সমর্থনে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছিল, তখন আমার দেশ ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একাকী কলম ধরেছে। ২০০৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার ছেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এক অভিযোগের লিড নিউজ দিয়ে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের সরাসরি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল। শেখ হাসিনার অভিযোগ ছিল—তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ লঘু করার জন্যই নাকি আমি ওই সংবাদ প্রকাশ করেছিলাম। ২০১০ সালে রিমান্ডে নিয়ে বারবার আমাকে ওই প্রশ্নই করা হয়েছিল। এই সংবাদ প্রকাশের পর নিয়মিত আমরা ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থায় বিচার বিভাগের অবক্ষয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেশুমার দুর্নীতি, বিরোধী মত দমন এবং দিল্লির কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছি আর বেগম খালেদা জিয়া প্রায় প্রতিটি জনসভায় আমার দেশ উঁচিয়ে ধরে হাসিনা সরকারের দুষ্কর্মের প্রমাণ দিয়েছেন। সেই সময়কার কয়েকটি আলোচিত লিড নিউজের তালিকা আজকের তরুণ পাঠকদের জন্য দলিল হিসেবে নিচে দিলাম—
১. চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে, ২১ এপ্রিল ২০১০
২. বিরোধী দল দমনে মামলার রেকর্ড, ২২ ডিসেম্বর ২০১১
৩. গভর্নমেন্ট গেছে পাগল হইয়া তারা একটা রায় চায়, ৯ ডিসেম্বর ২০১২
৪. অবরোধে অচল দেশ, কাল হরতাল, ১০ ডিসেম্বর ২০১২
৫. কারা শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে বন্দি চাপে, ১৩ ডিসেম্বর ২০১২
৬. শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
৭. গণহত্যার মিছিলে আরো ২৪ লাশ, ৪ মার্চ ২০১৩
৮. বিপর্যস্ত দেশে মারমুখী সরকার, ৬ মার্চ ২০১৩
৯. আগ্রাসী পুলিশের বেপরোয়া গুলি, ৭ মার্চ ২০১৩
১০. ইতিহাসের জঘন্যতম পুলিশ অ্যাকশন, ১২ মার্চ ২০১৩ (১১ মার্চ বিএনপির নয়াপল্টন অফিসে তাণ্ডব চালায় হাসিনার ফ্যাসিস্ট পুলিশ)
খুনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি দিয়ে মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছি, ‘সততায় পারবেন না প্রধানমন্ত্রী’। ১১ এপ্রিল ২০১৩ ভোর রাতে শেখ হাসিনা শত শত পুলিশ দিয়ে আমার দেশ প্রেস তালাবন্ধ করে এবং কারওয়ান বাজার অফিস থেকে সকাল ৮টার দিকে আমাকে দ্বিতীয় দফায় গ্রেপ্তার করে ডিবিতে নিয়ে যান। আমরা যখন বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মমতম শাসকের বিরুদ্ধে ডা. জাহেদের ভাষায় এক তুচ্ছ হ্যাডমছাড়া পত্রিকা নিয়ে লড়াই করছিলাম, তখন আজকের প্রভাবশালী উপদেষ্টা নিশ্চয়ই প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আরো কোনো বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলছিলেন। আমি কারাবন্দি থাকায় হয়তো তার অতীত বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপ জানতে পারিনি। তবে হাসিনার আমলে তিনি কোনো ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, আমার জানা নেই।
যাহোক, এমন একজন ব্যক্তি যার কাছে পত্রিকা জগতে একমাত্র আদর্শ প্রথম আলো, তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে কোন আদর্শে পরিচালনা করবেন, সেটি বুঝতে পাঠকদের তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। উপদেষ্টার ভাষায় অতি তুচ্ছ পত্রিকা, আমার দেশ নিয়েই নব্য হ্যাডমওয়ালাদের সঙ্গে দিল্লি সমর্থিত ফ্যাসিবাদী জামানার মতোই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। এটা তো প্রমাণিত যে, আদর্শের ব্যাপারে আমি বড়ই অনমনীয়, যাকে আপনারা বলে থাকেন উগ্র এবং হঠকারী। দেখতেই তো পাচ্ছেন, দুই দশক ধরে আমার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রবল সন্দেহ হচ্ছে, সংস্কৃতি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সেনাপতিরা জাতীয়তাবাদী দলের অর্ধশতাব্দীর আদর্শ সত্যি কি ধারণ করেন? আমার প্রশ্নের জবাব হয়তো একদিন বিএনপির আদি নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা খোঁজার চেষ্টা করবেন।