প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। দুর্ঘটনা এখন অন্যতম সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই দুজন শিক্ষার্থীকে বাসচাপা দেওয়ার পর দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এ মোটরযান চলাচলের নির্দেশনাবলি দেওয়া হয়েছে।
ওই আইনের ৪৯ ধারায় প্রথম অংশে বলা হয়েছে—মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে কোনো চালক মোটরযান চালাতে পারবেন না। মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে কোনো কন্ডাক্টর বা মোটরযান শ্রমিক মোটরযানে অবস্থান করতে পারবেন না। মোটরযান চালক কোনো অবস্থাতে কন্ডাক্টর বা মোটরযান শ্রমিককে মোটরযান চালনার দায়িত্ব দিতে পারবে না। সড়ক বা মহাসড়কে নির্ধারিত অভিমুখ ছাড়া বিপরীত দিক থেকে মোটরযান চালানো যাবে না। সড়ক বা মহাসড়কে নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোনো স্থানে বা উল্টো পাশে বা ভুলদিকে মোটরযান থামিয়ে যানজট বা অন্য কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। চালক ছাড়া মোটরসাইকেলে একজনের অধিক সহযাত্রী বহন করা যাবে না এবং চালক ও সহযাত্রী উভয়কে যথাযথভাবে হেলমেট ব্যবহার করতে হবে।
চলন্ত অবস্থায় চালক, কন্ডাক্টর বা অন্য কোনো ব্যক্তি কোনো যাত্রীকে মোটরযানে ওঠাতে বা নামাতে পারবেন না। মোটরযানের বডির সামনে, পেছনে, উভয় পাশে, বডির বাইরে বা ছাদে কোনো ধরনের যাত্রী বা পণ্য বা মালামাল বহন করা যাবে না। মোটরযান চালক মোটরযান চালনারত অবস্থায় মোবাইল ফোন বা অনুরূপ সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারবেন না। দূরপাল্লার মোটরযানে নির্ধারিতসংখ্যক যাত্রী বা আরোহীর অতিরিক্ত কোনো যাত্রী বহন করা যাবে না। রাতের বেলায় বিপরীত দিক থেকে আসা মোটরযান চালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এরূপ হাইবিম ব্যবহার করে মোটরযান চালানো যাবে না।
নতুন আইনে বেপরোয়া বা অবহেলায় গাড়ি চালানোর কারণে কেউ গুরুতর আহত বা কারো প্রাণহানি হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনে বলা আছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হত্যার উদ্দেশ্যে প্রমাণিত হলে তা দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০২ ধারার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হবে। সড়কে দুটি গাড়ি পাল্টা দিয়ে (রেসিং) চালানোর সময় যদি দুর্ঘটনা ঘটে, সে ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
চলন্ত অবস্থায় চালক মুঠোফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে এটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আইনটি পাস হওয়ার পরপরই এটি পরিবর্তনের দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা দুই দফায় ধর্মঘট ডাকে। ফলে আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিদ্যমান আইনে ১২টি ধারায় পরিবর্তন এনে এবং জেল-জরিমানা ও শাস্তি কমিয়ে ‘সড়ক পরিবহন সংশোধন আইন ২০২৪’-এর খসড়া অনুমোদন হয়।
সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ সড়ক ব্যবস্থাপনার সার্বিক উন্নয়ন জরুরি।
অন্যদিকে নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌপথ খুব স্বাভাবিক কারণেই যোগাযোগ ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট। স্থল ও আকাশপথের তুলনায় নৌপথ অনেক বেশি সাশ্রয়ী। কিন্তু আমাদের নৌপথে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী যেভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে চলাচল করে, সেটা সভ্যতার জন্য পরিহাসই বিবেচিত হচ্ছে। বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে সংঘটিত নৌদুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে নৌযানের ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন, ডিজাইন না মেনে নৌযান নির্মাণ, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মালপত্র এবং যাত্রী বহন, মাস্টার-সারেংদের অদক্ষতা ও অসতর্কতা, সংঘর্ষ, নদীর নাব্যসংকট, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, নৌযান মালিকদের দায়িত্বহীনতা এবং নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে চিহ্নিত করা হয়। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, দুর্ঘটনার এই কারণগুলো কিন্তু এখনো দৃশ্যমান। বিআইডব্লিউটির আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তবে আইনগুলো সময়োপযোগী করে নেওয়া দরকার। ‘দি ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬’ অধ্যাদেশের পঞ্চম অধ্যায়ের ৫৮(এ) ধারায় যাত্রী ও ক্রুদের জন্য জীবন বীমার কথা বলা থাকলেও, প্রয়োজনীয় আর্থিক কভারেজের পরিমাণ উল্লেখ নেই। এছাড়া বিদ্যমান আইনে ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া যাত্রী পরিবহন করা, প্রশিক্ষিত চালক বা ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া জাহাজ চালানো অথবা ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন করার জন্য যে ধরনের শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করা আছে, তা অপর্যাপ্ত। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার শাস্তি হিসেবে (‘দি ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬’ ধারা ৬৬-৬৭ অনুযায়ী) দুই থেকে ৩ বছর জেল এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে, তা অপ্রতুল। আবহাওয়া মাঝেমধ্যেই বৈরী হয়ে ওঠে। এদিকে নৌপথের সিগন্যালিং বা সংকেত ব্যবস্থা নাজুক। এর ওপর ফিটনেসবিহীন অসংখ্য নৌযান চলাচল করছে।
নৌনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। ত্রুটিপূর্ণ, সার্ভেবিহীন ও অনিবন্ধিত লঞ্চসহ সব ধরনের অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধে নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং বিআইডব্লিউটিএর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা; দুর্যোগ মৌসুম বিবেচনায় ঈদের আগে অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধে নৌপথে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু রাখার বিকল্প নেই। লঞ্চের চালক এবং স্টাফদের যথাযথ প্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত হতে হবে। সীমিতসংখ্যক যাত্রীবাহী লঞ্চের কারণে প্রতিনিয়ত লঞ্চে ওভারলোডিং হয়ে থাকে। এই ওভারলোডিং থেকে যাত্রীদের বিরত রাখা অত্যন্ত কঠিন। এ ক্ষেত্রে আইন যে রয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্বল। ফেরিতে উঁচু রেলিং, গার্ড পিলার থাকা আবশ্যক এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সচেতন থাকতে হবে। নৌপথে ট্রাফিক সিস্টেমের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিআইডব্লিউটিএর উপকূলীয় দ্বীপগুলোয় সার্ভিসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
আমাদের দেশে রেলপথ নিরাপদ হিসেবে মানুষ রেলপথে যাত্রা করতে চায়। কিন্তু উদ্বেগজনক ব্যাপার হচ্ছে, রেলযাত্রা ক্রমেই হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। রেলপথে দুর্ঘটনার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ লাইনচ্যুতির কারণে। এর অন্যতম কারণ যন্ত্রাংশের সংকট ও রেলপথের যন্ত্রপাতি চুরি। পাশাপাশি রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, লোকবল ঘাটতি, নিয়মিত তদারকি ও মেরামতের অভাব, রেলপথে মানসম্মত পর্যাপ্ত পাথরের স্বল্পতা ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা। এভাবে চলতে থাকলে যাত্রীসংকটে পড়বে রেল। সড়কপথে অহরহ দুর্ঘটনার কারণে অনেকেই এখন রেলপথের দিকে ঝুঁকছেন। ট্রেনকে তুলনামূলক নিরাপদ বাহন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে ট্রেন ভ্রমণে মানুষের সেই নিরাপত্তাবোধে যে চিড় ধরবে, তা বলাই বাহুল্য। কাজেই দুর্ঘটনার কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। রেললাইন সার্বক্ষণিক মনিটর করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। যাত্রার আগে লোকোমোটিভ ও যাত্রীকোচ ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। সিগন্যাল কার্যকর রাখা ও তা মেনে ট্রেন পরিচালনা করতে হবে। নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে ট্রেন পরিচালনা না করে সাবধানতার সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা করতে হবে।
লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট