হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

রাজা যায়, রোজা যায়, রোহিঙ্গাদের যাওয়া হয় না

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা

ছবি: সংগৃহীত।

ভূ-রাজনীতির জটিল জালে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বেশ ভালোই জনপ্রিয় ছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়ে পুরো দেশ তার কাছ থেকে আশার বাণী শুনতে থাকল। ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ তার প্রদত্ত বাণী অমৃত রোহিঙ্গাদের মনে তো বটেই, বাংলাদেশের মানুষের মনেও বিশেষ আশার সঞ্চার করল। রোহিঙ্গাদের শরণার্থী দিনলিপির মধ্যে এই প্রথম আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশের সরকারপ্রধান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করেছিলেন; সঙ্গী ছিলেন জাতিসংঘের প্রধান কর্তাব্যক্তিটিও।

৩৩টি ক্যাম্পের প্রতিটি থেকে ৭০ জন রোহিঙ্গার কাছে কিন্তু এই দিনটির তাৎপর্য কেবল একজন নোবেলবিজয়ী সরকারপ্রধান ও জাতিসংঘপ্রধানের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেদিন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান ড. ইউনূস আশ্বাস দিয়েছিলেন, আগামী ঈদ অর্থাৎ ২০২৬ সালের রোজার ঈদ রোহিঙ্গারা তাদের নিজ বাসভূমি মিয়ানমারে উদ্‌যাপন করবে। এতে তার জনপ্রিয়তার পারদ একদিকে যেমন আরো এক ধাপ উপরে উঠে গিয়েছিল, তেমনি রোহিঙ্গারাও হয়েছিল আবেগাপ্লুত।

তবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বিস্মিত হয়েছিলেন, এ আশ্বাসের ভবিষ্যৎ অকার্যকারিতা আঁচ করতে পেরে। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, হয়তো বা টোকেন হিসেবে ২০ জন বা ৫০ জনকে অন্তত পাঠানো হবে। কেউ কেউ অবশ্য নিশ্চিত ছিলেন যে, এটা নিছকই মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। ড. ইউনূস পরিণতি জেনেও এ রকম একটি অবাস্তবায়নযোগ্য আশ্বাস কেন দিলেন, সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে জানা দরকার—তিনি ও তার সরকার কী কী কৌশলে এই আশ্বাসকে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

কোনো সন্দেহ নেই, ড. ইউনূসের শাসনামলে রোহিঙ্গা ইস্যু যেভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছিল, তেমনটি আর কারো শাসনামলে ঘটেনি। ২০২৫ সালের মার্চে রোহিঙ্গাদের দেওয়া তার আশ্বাস কোনো চাপ বা আবেগের ফল ছিল না। বরং অনেক আগে থেকেই একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছিল তার সরকার কতটা শরণার্থীবান্ধব, তা বোঝানোর জন্য। এর একটি উদাহরণ হলো রোহিঙ্গা বিষয়ে ২০২৪ সালে উচ্চ-প্রতিনিধি নিয়োগ। এ ধরনের একটি পদ সরকারিভাবে সৃজনের মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, এই সরকার সত্যিই রোহিঙ্গা বিষয়ে সিরিয়াস। তা উচ্চ-প্রতিনিধি কী করলেন ২০২৫ সালজুড়ে, একটু দেখা যাক।

২০২৪ সালের এপ্রিলে ষষ্ঠ বিমসটেকের সাইডলাইন বৈঠকে গত চার দশকের মধ্যে বাংলাদেশের হয়ে রোহিঙ্গা বিষয়ে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। একদিকে মিয়ানমার ও অন্যদিকে বাংলাদেশের পতাকাশোভিত মঞ্চে বাংলাদেশের উচ্চ-প্রতিনিধির পাশে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী জনসমক্ষে ঘোষণা করেছিলেন, তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবেন এবং প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনে সম্মত আছেন। পরিতাপের বিষয়, এই চমকপ্রদ ঘটনাটি আর এগুতে পারেনি। ১ লাখ ৮০ হাজার দূরে থাক, একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠাতে পারেনি বাংলাদেশ।

এযাবৎ বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য এভাবে জনসমক্ষে মিয়ানমারের কাছ থেকে আশ্বাস পায়নি, এটা যেমন ঠিক; তেমনি এটাও ঠিক যে, আমাদের তৎকালীন উচ্চ-প্রতিনিধি তার এখতিয়ারে থাকা পরবর্তী পদক্ষেপটি গ্রহণ করেননি। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তির নামে সম্পাদিত দুটি বন্দোবস্ত সংশোধন করা ছিল আবশ্যিক কাজ। এর অনেক কারণের মধ্যে দুটো কারণই যথেষ্ট।

প্রথমত, এসব বন্দোবস্তের কোথাও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিই ছিল না। অর্থাৎ মিয়ানমার রোহিঙ্গা পরিচয়ের কাউকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ওই বন্দোবস্তে সম্মতি দেয়নি। দ্বিতীয়ত, এই বন্দোবস্তগুলো প্রণীত হয়েছিল আমাদের ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপে এবং তাদেরই স্বার্থে। কারণ সে সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত হতো সেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নির্দেশনায়। ফ্যাসিবাদের চেতনায় পুষ্ট সরকারের দ্বারা দেশের স্বার্থবিরোধী দলিল বা নীতিকে অপরিবর্তিত রেখে তৎকালীন উচ্চ-প্রতিনিধি বিমসটেক সাইডলাইনের বৈঠকের আলোচনায় বাজিমাত করতে চেয়েছিলেন।

অবশ্য মিয়ানমারের ঘরের ভেতরেই যেখানে সারাক্ষণ অস্ত্রের ঝনঝনানি, সংঘাত ও রক্তপাত, সেখানে রোহিঙ্গা বিষয়ে সংলাপ আর কতদূর এগুবে? এর উত্তর একটিই। বাংলাদেশের স্বার্থেই সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে, তা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি যা-ই হোক। কিন্তু বাংলাদেশ একবার ‘আরাকান আর্মির সঙ্গে কথা চলছে’, আরেকবার ‘জান্তা সরকারের সঙ্গে বৈঠক হবে’ প্রভৃতি বুলি শোনানোর মাধ্যমে সময় পার করল এবং ২০২৫ সালের শেষে ২০২৬ সালের কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

আমাদের উচ্চ-প্রতিনিধি আরো একটি চমকপ্রদ কাজ করেছিলেন ২০২৫ সালে—জাতিসংঘে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গা বিষয়কে ভীষণ সরব করে তুলেছিলেন। দুর্ভাগ্য, সেই সম্মেলনের ফলাফলও অশ্বডিম্ব বললে বাড়িয়ে বলা হবে না; কারণ সেই সম্মেলনে যারা এসেছিলেন, সবাই রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি আর বাংলাদেশের প্রতি করুণা প্রকাশ করেছিলেন। অনেক দান-খয়রাত তারা বাংলাদেশকে করবেন বলে প্রতিজ্ঞাও করেছেন। অবশ্য বাংলাদেশের জন্য এই দানের অর্থ খুবই প্রয়োজন, তা না হলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প চালানো মুশকিল হয়ে যাবে। অগত্যা প্রত্যাবাসন নয়, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিপালনের ব্যবস্থা অন্তত করা গেছে ২০২৫ সালের সম্মেলনের মাধ্যমে। বলা বাহুল্য, বৈশ্বিক যুদ্ধ ও সংঘাতের চাপে নতুন নতুন সংকট তৈরির ফলে সেসব তহবিল প্রদানের আশ্বাসগুলোর অধিকাংশই মিথ্যা প্রমাণ হবে খুব শিগগিরই।

ড. ইউনূস একজন বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও সফল উদ্যোক্তা। কিন্তু তার সরকার কক্সবাজারের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসমতাকে পুনরুদ্ধারের কোনো পরিকল্পনার কথা ভাবেননি, যেখানে রোহিঙ্গাদেরও কর্মসংস্থান হতে পারত। শ্রমবাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া, দৈনিক মজুরি হ্রাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো বন্ধ হয়ে আসা, কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজের নামে ইয়াবা পাচারে নিয়োজিত হওয়ার মতো গুরুতর বিষয়গুলো তার সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। এই বাস্তবতা নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলে, তা একটু দেখা যাক।

আলজাজিরার প্রতিবেদন (আগস্ট ১০, ২০১৮) অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কক্সবাজারের চার হাজার একর জমি ব্যবহৃত হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য, ‍৪০ টাকার ১ লিটার তেল কিনতে হতো ১০০ টাকায়। ২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত দুই বেড রুমের পাঁচ হাজার টাকার ভাড়া বাসা ২০১৮ সালে ১৫ হাজার টাকারও বেশিতে ভাড়া নিতে হয়েছে।

২০২৫ সালে কোয়ার্টারলি অন রিফিউজি প্রবলেম নামের জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে দেখা যায়, জেআরপি তহবিলের জন্য যতটুকু আপিল করে, তার অর্ধেক বা তিন ভাগের দুভাগ পায়। অথচ দৈনিক শ্রমিকের মজুরি ২০১৭ সালে ৫৫০ টাকা থেকে নেমে ২০১৯ সালে হয়েছে ৩৫০ টাকা। ৮৫ শতাংশ স্থানীয় জনগণ মনে করে, তারা অর্থনৈতিকভাবে অসহায় অবস্থার মধ্যে আছে, যা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিবন্ধক। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের গবেষণা দেখায়, স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়েছে ১৩ থেকে ৩০ শতাংশ, আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে এর হার বেড়েছে ৫৭ থেকে ৮৬ শতাংশ। স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে ২০২২ সালে বেকারত্ব হার ছিল সাত শতাংশ, যা ২০২৩ সালে হয়েছে ১৬ শতাংশ । রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের উদ্যোগ নিতে হলে প্রো-রোহিঙ্গা না হলেও চলবে। কেবল প্রো-বাংলাদেশি হলেই তা আলোর মুখ দেখতে পারে।

পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজারের অর্থনৈতিক অবস্থা সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো থাকার কথা ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের অবস্থান সেখানে এক রূঢ় বাস্তবতা তৈরি করেছে। চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিকেও কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো হয়নি মিয়ানমারকে তার দেশের মানুষকে ফিরিয়ে নিতে চাপ সৃষ্টির জন্য। এখন তো যুদ্ধবিগ্রহের ডামাডোলের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু হারিয়ে যেতেই পারে।

এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের আশার বাণী শোনানো খুব জরুরি ছিল দুই কারণে—শরণার্থীবান্ধব দরদি শাসক হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিতিশীলতা রোধ। দুটোই সফল হয়েছে। দেশে নির্বাচন দিয়ে তিনি ক্ষমতা ছেড়েছেন।

রোজা শেষে ঈদও চলে যাচ্ছে। কেবল রোহিঙ্গাদেরই দেশে ফিরে যাওয়া হলো না। ভবিষ্যতে এ-জাতীয় আশ্বাসে তারা আর আস্থা রাখবে কি?

লেখক : শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

যুদ্ধে ইরানকে যেভাবে সাহায্য করছে চীন-রাশিয়া

উৎসবনির্ভর অর্থনীতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আলেম সমাজের বিভক্তি ও অদৃশ্য সম্ভাবনার শক্তি

মাননীয় স্পিকার...

ব্লু ইকোনমি : একুশ শতকের সম্ভাবনা

ইরান যুদ্ধের নেপথ্যে

মুসলিম বাংলাদেশের বাস্তবতা

মেটা কেন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশে চাপ দিয়েছে

দেশে আবার খাল খননের সবুজ বিপ্লব

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ধর্মযুদ্ধ