গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক উৎসবমুখর পরিবেশে সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই একটি অপ্রত্যাশিত ঘোষণা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। শাসক দলের নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাফ জানিয়ে দেন, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। অথচ জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এ পরিষদের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যপদ্ধতি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত।
এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুটি প্রধান আপত্তি সামনে এসেছে। প্রথমত, বলা হচ্ছে—১৯৭২ সালের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা দেয় না, ফলে এর ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, যেহেতু সংবিধান সংস্কার পরিষদের জন্য আলাদা নির্বাচন হয়নি, তাই সংসদ সদস্যদের এই পরিষদের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নেই। এই আপত্তিগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য—তা বিচার করতে হলে আমাদের বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাতে হবে।
রাষ্ট্রপতির আদেশ : লিখিত সংবিধান বনাম সাংবিধানিক মুহূর্ত
এটি সত্য যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া নেই। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেই কি কোনো আইনি পদক্ষেপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে জুলাই বিপ্লবোত্তর সাংবিধানিক বাস্তবতায়।
জুলাইয়ের রাজনৈতিক উত্থানকে শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে তার সঠিক মূল্যায়ন হবে না। বরং এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ‘সাংবিধানিক মুহূর্ত’—এমন একটি সময় যখন জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রের কাঠামো, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে সক্রিয়ভাবে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতার পর এত ব্যাপক নাগরিক সম্পৃক্ততা খুব কমই দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-কে শুধু ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধারার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করা বাস্তবতাবিবর্জিত। বরং এর বৈধতার উৎস খুঁজতে হবে জনগণের সেই সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যে, যার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি উঠেছিল। অর্থাৎ, এখানে কার্যকর হয়েছে জনগণের constituent power—রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা।
এমন একটি অসাধারণ সাংবিধানিক রূপান্তরকে সাধারণ আইনি মানদণ্ডে বিচার করা মৌলিক ভুল। যারা এখনো ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনুচ্ছেদে এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি খুঁজছেন, তারা হয় এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের গভীরতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, নয়তো তার পরিণতি স্বীকার করতে অনিচ্ছুক।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ : আইনগত কাঠামো ও বাস্তবতা
ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের উল্লেখ নেই, তাই এটি সংবিধানবহির্ভূত। এমনও বলা হয়েছে, আগে সংবিধান সংশোধন করে তারপর এই পরিষদ গঠন করা উচিত ছিল। তবে এই যুক্তি জুলাই সনদে প্রস্তাবিত পরিবর্তনের গভীরতা ধারণ করতে ব্যর্থ।
জুলাই সনদে সংবিধানের কোন ছোটখাটো সংশোধনের কথা বলা হয়নি; বরং রাষ্ট্রের মূল নীতি পুনর্বিবেচনা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পুনর্গঠন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’-কে স্পর্শ করবে। এখানেই সমস্যার সূত্রপাত। প্রচলিত সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়, তবে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে । সুপ্রিম কোর্টের অতীতের রায়—বিশেষত পঞ্চম সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলার রায় থেকে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে ‘মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব’ একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে।
ধরা যাক, প্রচলিত পদ্ধতিতে সংবিধানের মূল নীতি সংশোধন করা হলো। তখন কী হবে?
পঞ্চম সংশোধনী মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেছে—‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। এর অর্থ, সংসদ তার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে যদি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পরিবর্তন করতে চায়—ধরা যাক, ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে—তাহলে তা আদালতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। অর্থাৎ, যারা বলছেন ‘সংবিধানের ভেতর থেকেই সংস্কার করতে হবে’, তারা কার্যত এমন একটি পথের পরামর্শ দিচ্ছেন, যা শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হতে পারে।
বাস্তবতা হলোÑযদি সংস্কার সত্যিই মৌলিক হয়, তবে তা প্রচলিত সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টেকসই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জনগণের প্রত্যক্ষ সার্বভৌম ক্ষমতার আশ্রয়, যা সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব’ দ্বারা সীমিত নয়। সংস্কার প্রক্রিয়া যদি জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে তা সংবিধানের মূল পাঠের সমতুল্য বৈধতা অর্জন করবে। সে ক্ষেত্রে ‘মৌলিক কাঠামো’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার প্রশ্নও আর থাকবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈততা স্পষ্ট। যারা বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা অস্বীকার করছেন, তারা একই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল মেনে নিচ্ছেন। অথচ সেই একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত গণভোটকে অস্বীকার করছেন। এই অবস্থান যুক্তিসংগত নয়। যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির ক্ষমতা না থাকে, তবে সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া উচিত। আর যদি নির্বাচন বৈধ হয়, তবে একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত গণভোটকে অস্বীকার করার সুযোগ থাকে না।
পৃথক নির্বাচন না হলে বৈধতা নেই—এই দাবি কি যুক্তিযুক্ত?
সংবিধান সংস্কার পরিষদের জন্য পৃথক নির্বাচন হয়নি—এই যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে আগেই বলা হয়েছিল যে সংসদ সদস্যরাই এই পরিষদের সদস্য হবেন। এই তথ্য গোপন ছিল না; বরং গণভোটের আগেই জনসমক্ষে এসেছে এবং আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ ভোটাররা জেনেশুনেই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন—আইন প্রণয়নের জন্য যেমন, তেমনি সংবিধান সংস্কারের জন্যও। তারপর গণভোটে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোটার এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছেন। এই দ্বৈত ম্যান্ডেট—নির্বাচন এবং গণভোট মিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের যে বৈধতা তৈরি হয়েছে, তা আলাদা কোনো নির্বাচনের চেয়েও শক্তিশালী।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑসংবিধান প্রণয়ন বা সংস্কারের জন্য পৃথক নির্বাচনের কোনো বাধ্যবাধকতা সাংবিধানিক আইনে নেই। আসল প্রশ্ন একটাই—জনগণ কি সচেতনভাবে সম্মতি দিয়েছে? গণভোটের জনরায় বলে এর উত্তর স্পষ্টভাবেই ‘হ্যাঁ’।
পরিশেষে, এ কথা বলতেই হয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে আপত্তির মূলে রয়েছে জুলাইয়ের সাংবিধানিক বাস্তবতা মেনে নিতে এক ধরনের অনীহা। স্বাভাবিক সময়ে সংবিধানের লিখিত বিধানই চূড়ান্ত। কিন্তু ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে, যখন জনগণ নিজেরাই রাষ্ট্রের কাঠামো নির্ধারণে এগিয়ে আসে, তখন বৈধতার উৎস স্থানান্তরিত হয়—সংবিধানের অনুচ্ছেদ থেকে জনগণের অভিপ্রায়ে। এ কথা ভুললে চলবে না, যে সংবিধান নিজেই জনগণের সৃষ্টি—এবং প্রয়োজনে জনগণই তা সংস্কার করার ক্ষমতা রাখে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ সেই ক্ষমতারই প্রকাশ। এটিকে অস্বীকার করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে নয়, বরং জনগণের ঘোষিত সার্বভৌমত্বকেই অস্বীকার করা।
লেখক: ইমরান সিদ্দিক সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন