হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

মৌলবাদ থেকে উগ্রবাদ : ইসলামবিদ্বেষী বয়ানের রূপান্তর

ড. ইউসুফ জারিফ

এআই নির্মিত ছবি

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক বয়ান রাজনীতির পথ ও স্বরূপ নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। এসব বয়ানের সঙ্গে প্রকৃত জনমত বা জনসমর্থন কতটুকু আছে বা নেই, তা বিবেচনা করা হয়নি। বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি, আদর্শ ও ভাবনা বিবেচনায় না নিয়েই বাঙালিত্ব ও ধর্মনিরপেক্ষতার বয়ান তৈরি করা হয়। এ দুই ক্ষেত্রে এমন ধারণা তৈরি করা হয়, যা অনেকটা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত তত্ত্ব ‘বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ’ ধরনের। অর্থাৎ একই সঙ্গে কেউ বাঙালি ও মুসলমান হতে পারবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি এ বিভাজনের বয়ান পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এ ইসলামবিদ্বেষী ও অপরিণামদর্শী বয়ান গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের রাজনৈতিক বিভাজনের মূল পাটাতন হিসেবে কাজ করেছে এবং এখনো করছে। বিভাজনের এ মৌলিক বয়ানকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে বয়ানের একটা সিলসিলা তৈরি হয়েছে। সময় ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বয়ানের সিলসিলার রূপান্তর ঘটেছে, তবে মৌলিক লক্ষ্য, অর্থাৎ ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতি জারি রাখা হয়েছে।

বিভাজনের রাজনীতির বয়ান জারি রাখতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর একটি এলিট অ্যালায়েন্স হয়। শুরুতে বামপন্থি ও কলকাতাকেন্দ্রিক, তবে পাশ্চাত্যের সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা মোহবিষ্ট উপনিবেশিত বুদ্ধিসমাজ (colonized intellectuals) এ এলিট গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিল। তবে মধ্য আশির দশক থেকে বাংলাদেশে একটি উদ্যোক্তা ও বিজনেস ক্লাস গড়ে ওঠে, যাদের অনেকে বড় মাপের পুঁজি লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত। এ পুঁজিপতি গোষ্ঠী আদর্শগতভাবে সেক্যুলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ নব্য পুঁজিপতি গোষ্ঠী পরবর্তী সময়ে এ এলিট অ্যালায়েন্সের প্রধান পোষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এর মাধ্যমে এলিট অ্যালায়েন্সে একটি কৌশলগত রূপান্তর হয়। এ রূপান্তরের ফলে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা আরো শক্তিশালীভাবে বয়ান নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর গণমাধ্যমে ব্যাপক বিনিয়োগ হয় এবং গণমাধ্যমে একটি নতুন ধারাও তৈরি হয়। পুঁজি লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠী সংবাদপত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত করে। অপরদিকে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এসব সংবাদপত্রে লেখার মাধ্যমে জীবিকা ও সুনাম দুটোই লাভে সক্ষম হয়। ফলে উভয় গোষ্ঠীর জন্য এটি উইন-উইন অবস্থা তৈরি করে।

গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে ইসলামি মূল্যবোধনির্ভর বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলার গোষ্ঠী প্র্যাকটিসিং ও তাওহিদবাদী মুসলমানদের ‘মৌলবাদী’ বলে আখ্যায়িত করা শুরু করে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন প্রতিরোধ ও পরবর্তী সময়ে ট্রানজিশনাল রাজনীতি এবং ফিলিস্তিনে মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিবেদিত মুসলমান ও রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোকে পশ্চিমা জায়নবাদী গোষ্ঠী মৌলবাদী বলে অভিহিত করে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে উপনিবেশবাদী ও আধিপত্যবাদীদের এ বৈশ্বিক কৌশল স্থানীয় পর্যায়েও প্রভাব ফেলে। ফলে পুরো আশির এবং নব্বইয়ের দশক জুড়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে সেক্যুলাররা ‘মৌলবাদবিরোধী’ আন্দোলন জারি রাখে। পশ্চিমের ইসলামবিদ্বেষী প্রকল্প ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং উপনিবেশবাদী পশ্চিম (Colonizer West) মুসলমানদের এ উত্থানকে অবদমনের জন্য মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনকে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেয়। স্থানীয় সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা পাশ্চাত্যের এ বৈশ্বিক প্রকল্পের অংশীদার হয়। পাশাপাশি ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয় এবং ভূতপূর্ব কমিউনিস্টরা দ্রুত সিভিল সোসাইটি ও এনজিও তৈরি করে পাশ্চাত্যের সহায়তা নেয় এবং পাশ্চাত্যের সব মুসলিমবিদ্বেষী প্রকল্পকে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু করে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত এলিট অ্যালায়েন্সে বুদ্ধিজীবী ও লুটেরা পুঁজিপতির সঙ্গে এনজিও ও সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠী যুক্ত হয়। এলিট অ্যালায়েন্সে এনজিও ও সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠীর যুক্ততার মাধ্যমে এ অ্যালায়েন্স নতুন করে শক্তি পায়। এর প্রধান কারণ হলো পাশ্চাত্য উদার হস্তে এ গোষ্ঠীকে গবেষণা, অ্যাডভোকেসি এবং সচেতনতা বৃদ্ধির নামে বিভিন্ন কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তা করে। বিশেষ করে জেন্ডার ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বিবিধ সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে সেক্যুলাররা মৌলবাদ বিরোধিতার নামে ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতি জারি রাখে।

২০০১ সালে উপনিবেশবাদী ও জায়নবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘টুইন টাওয়ারে’ হামলা হলে আবার নতুন করে ইসলাম ও মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতি গতি পায়। এবার বয়ানের পরিবর্তন হয়। মৌলবাদী বা fundamentalism থেকে জঙ্গিবাদ বা extremism-এর রাজনীতি তৈরি হয়। Preventing Violent Extremism (PVE) নামে বৈশ্বিক প্রকল্পের আওতায় দেশীয় সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি, পাশ্চাত্য মূল্যবোধভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা, এনজিও প্রভৃতি মিলে বাংলাদেশে গত দুই দশকে জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলমানদের জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করে। মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি সর্বান্তকরণে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে। দেশে অলিগার্কিক-ক্লেপটোক্রেটিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ‘জঙ্গিবাদবিরোধী’ বৈশ্বিক ফর্মুলাকে আওয়ামী লীগ খুব চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগায়। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যূথবদ্ধতার কারণে এ প্রকল্প খুব দ্রুত সফলতা পায়, যার কারণে বিনা ভোটে ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকে। এ স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় যেহেতু শুধু মুসলমান ও জাতীয়তাবাদীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছিল, তাই সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী ও সিভিল সোসাইটি আন্তরিকভাবে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। পুঁজি লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠী অধিকতর উৎসাহে পুঁজি লুণ্ঠনে নিয়োজিত থাকে এবং পুঁজি সুরক্ষার লক্ষ্যে গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রসার ঘটায়। এর ফলে পাপেট শ্রেণির সাংবাদিকতার জন্ম হয়, যে সাংবাদিকতা ক্ষমতাকে প্রশ্ন নয়, বরং ক্ষমতাকে সুরক্ষা দিতে চায়। এ সাংবাদিক গোষ্ঠীও নিজস্ব জীবিকা ও সুরক্ষার জন্য জঙ্গিবিরোধী আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। জঙ্গি নিধনের নামে যখন মানুষকে রাষ্ট্রের ভয় উৎপাদনকারী শক্তি কর্তৃক হত্যা করা হয়, তখন এ সাংবাদিক মহল ভয় উৎপাদনকারী গোষ্ঠীর বয়ানকে সমাজে প্রচারের দায়িত্ব নেয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সেক্যুলার এলিট গোষ্ঠী উপনিবেশ পশ্চিম এবং আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি উভয়ের সমর্থন লাভ করার চেষ্টা করে। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী যেহেতু রাজনৈতিকভাবে এ প্রকল্প হতে লাভবান হচ্ছিল, ফলে শাসকগোষ্ঠীও ইসলামবিদ্বেষী এলিটদের নিরঙ্কুশ সমর্থন দেয়। এ সমর্থনের মাত্রা এমন হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জেনারেল, আমলা, বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ সবাই মিলে পুঁজি লুণ্ঠন ও পাচারে রাজনৈতিক আশকারা পায়।

জুলাই বিপ্লব ও বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির বিকাশ এবং নতুন বয়ানের রাজনীতি

উপনিবেশ পশ্চিম, আধিপত্যবাদী আঞ্চলিক শক্তি এবং ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলার এলিট অ্যালায়েন্সকে পরাস্ত করে বাংলার ছাত্র-জনতা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশকে রাহুমুক্ত করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথম দেশের মানুষ নিজের কথা বলার কিছুটা সুযোগ পায়। মুসলমানের রক্ত, ঘাম, ত্যাগ, সম্পত্তির বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে প্রকাশের সুযোগ পায়। মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী রাজনীতির আড়ালে ও চক্রান্তে এ দেশের প্র্যাকটিসিং মুসলমানরা সর্বাবস্থায় প্রান্তিক থেকেছে। সেক্যুলার এলিট গোষ্ঠী মানবাধিকার ও সুশাসনের ব্যবসা করলেও মুসলমানদের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার করাকে ন্যায্য মনে করে। ফলে মুসলমানরা স্বাধীন বাংলাদেশে নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কোনো ক্ষেত্রে ন্যূনতম ভূমিকা পালন করতে পারেনি। জুলাই বিপ্লব এ প্রান্তিকতার বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদ ছিল।

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জনগণ যখন ইনসাফ, সাম্য ও মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি তৈরির জন্য প্রচেষ্টারত, তখন আমরা আবার বয়ানের রাজনীতি খেয়াল করলাম। লুণ্ঠনকারী পুঁজি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং পাশ্চাত্য ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির গোলামি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গণমাধ্যম নতুন বয়ান উপস্থাপন করা শুরু করে। এবার মজলুম জনতাকে ‘উগ্রবাদী’ অভিধায় ভূষিত করে। দ্রুত প্রিন্ট থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ প্রকল্প চালান করা হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি যখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল, তখন এ রাজনীতিকে ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে প্রচার করা হয়। এ এলিট গোষ্ঠী সিন্ডিকেটেড নিউজের মাধ্যমে সুশাসন ও ইনসাফের রাজনীতিকে উগ্রবাদিতা হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকে। ফলে জনগণের সুশাসন ও ইনসাফের আকাঙ্ক্ষাকে অবদমিত করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও রাজনীতির মারপ্যাঁচে সবসময় আধিপত্যবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকতে হয়েছে। তাই জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি বাংলাদেশে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জারি রেখেছিল। কিন্তু ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলারদের বয়ানের রাজনীতি জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও আশাকে নস্যাতের চেষ্টা চালায় ও তাতে সফল হয়।

তিনটি এপিসোড ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

আশির দশক, নব্বই-পরবর্তী দশক এবং ২০০০-পরবর্তী দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বেশ শিক্ষণীয়। এ তিন সময়ে আদর্শিকভাবে খুব দুর্বল কিন্তু ব্যাপকভাবে জনসমর্থন-পুষ্ট জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতায় ছিল। এ তিন সময়ে ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলার গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয় এবং সংঘাত ও দ্বন্দ্বের রাজনীতিকে (politics of polarization and confrontation) দৃঢ় করে। তথাকথিত মৌলবাদ ও জঙ্গিবিরোধী আন্দোলন এ সময়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ইসলামবিদ্বেষী বুদ্ধিজীবিতা একটি নবীন দেশের রাজনীতিকে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি হতে দেয়নি। বরং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর পক্ষপুটে যেতে বাধ্য করে। নাটক, সিনেমা, গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রে মুসলমান মাত্রই খলনায়ক। ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে আমরা ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ নামে এক দানবীয় রাজনীতির উত্থান খেয়াল করি। ওই সময়ের জাতীয়তাবাদী সরকার আদর্শিক পজিশন নির্ধারণে ব্যর্থ হয়। ফলে দেশে বিভাজনের রাজনীতি আরো দৃঢ় হয়। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মানবাধিকার হরণের রাজনীতি মূলত ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে শুরু হয়। ২০০১ সালে আসীন সরকার উপনিবেশ পশ্চিম ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির রাজনীতি বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং তথাকথিত জঙ্গিবাদবিরোধী রাজনীতির খপ্পরে পড়ে। অবশেষে শাসন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হয়। সামরিক আমলাতন্ত্র ও আওয়ামী লীগ উপনিবেশ পশ্চিম ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে জঙ্গিবাদবিরোধী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে। ওপরের তিন এপিসোডে স্পষ্ট যে, জাতীয়তাবাদী শক্তি নিজস্ব রাজনীতির পরিচয় নির্ধারণে ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী এ সুযোগকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগায়।

এবারও একই জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতায় এবং নানা কারণে এ শক্তি এখন আরো বেশি করে পরিচয়ের সংকটে ভুগছে। প্রথাগত নেতৃত্বের বাইরে পাশ্চাত্যের মূল্যবোধে দীক্ষিত একটি ছোট এলিট গ্রুপ বর্তমানে জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর মূল নীতিনির্ধারক। নিজস্ব স্বার্থে এ হাইব্রিড গ্রুপ গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে আবারও পরাজিত করতে পারে। তাই যথাযথ প্রতিরোধ না থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও পথহারা হতে পারে। সংঘাত ও বিদ্বেষের পথ আরো প্রশস্ত হতে পারে। কিছু লক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট। গণমাধ্যম ইতোমধ্যে পরিকল্পিত অবস্থান নিয়েছে।

করণীয় কী?

খুব দ্রুত বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে এবং দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের মাঠে আসতে হবে; আড়ষ্টতা কাটিয়ে জনগণের কাছে ছুটে যেতে হবে। সুশাসন, ইনসাফ ও মর্যাদার বয়ান নির্মাণ করে একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশ গঠনের জন্য তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তরুণরাই আজাদির ঝান্ডা তুলে ধরতে পারে। সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের আগুন ছড়িয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিবিদরা যাতে পথ না হারায়, সেজন্য জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। আমরা যদি এ এপিসোডে আবার ভুল করি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। মনে রাখা দরকার ডিপ স্টেটের অনুষঙ্গগুলো বাংলাদেশকে নতজানু রাখতে চায়। জনগণ ও বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা আজাদি না গোলামি চায়।

লেখক : গভর্ন্যান্স ও পাবলিক পলিসি এক্সপার্ট, ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েটেড গবেষক এবং Routledge ও Springer কর্তৃক প্রকাশিত একাধিক গবেষণা বইয়ের লেখক

আরবদের জন্য হুমকি ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল

জুলাই বিপ্লব কেন হয়েছিল?

সংবিধান সংস্কার পরিষদ : বৈধতা ও জনসার্বভৌমত্ব

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চড়া মূল্য

ইরান যুদ্ধে বড় ক্ষতি ভারতের

বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব

প্রথম আলোই একমাত্র হ্যাডমওআলা পত্রিকা: ডা. জাহেদ

ইসরাইলের সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ

মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা ও বিভাজনের ইতিহাস

যুদ্ধে ইরানকে যেভাবে সাহায্য করছে চীন-রাশিয়া