সত্তর দশকের শেষে বাংলাদেশের তৎকালীন জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে যে ‘খাল খনন বিপ্লব’ দেশের ধূসর মাঠগুলোয় প্রাণের স্পন্দন এনেছিল, আজ দীর্ঘ বিরতির পর সেই একই স্পন্দন প্রতিধ্বনিত হতে যাচ্ছে তারই সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে। এই খাল খনন কর্মসূচি শুধু মাটি কাটার কোনো প্রকল্প নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তন আর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের এ সময় বাংলাদেশের কৃষি ও প্রকৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার এক আধুনিক মহাপরিকল্পনা। বাবার শুরু করা সেই জনকল্যাণমুখী রাজনীতির উত্তরাধিকার বয়ে এনে তারেক রহমান ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খননের সাহসী ডাক দিয়েছেন। তার এই কর্মসূচি নতুন করে আগামীর এক সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের নতুন মানচিত্র আঁকতে যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারি সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর দলকে ক্ষমতায় এনে একে একে সেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করে চলেছেন তারেক রহমান। কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের হাতে মাসিক সম্মানী ও উৎসব বোনাস দেওয়ার পর আজ ১৬ মার্চ সোমবার দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছেন তিনি। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা থেকে জাতীয় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মধ্যেই তার গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজ শুরু হয়ে গেছে। আগামী ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিনে দেশের মানুষকে তারেক রহমান আরেকটি উপহার হিসেবে দেবেন তার প্রতিশ্রুতি ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের মাধ্যমে।
তারেক রহমানের খাল খনন কর্মসূচি মূলত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ গড়ার দর্শন ও তার সূচিত খাল খনন কর্মসূচির আধুনিক এবং সম্প্রসারিত রূপ। দেশব্যাপী এই কর্মসূচি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি এবং পরিবেশ রক্ষায় একটি যুগান্তকারী বিপ্লব হতে যাচ্ছে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী, নালা ও জলাশয় খনন, পুনঃখননের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রথম ধাপে ৫৪টি জেলায় একযোগে ৬৩টি খালের খননকাজ শুরু হবে। কর্মসূচির প্রথম ১৮০ দিন বা ছয় মাসের মধ্যেই এক হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ দৃশ্যমান করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো, খালের নাব্য বৃদ্ধি করে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। এর ফলে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে। বন্যা, খরা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই কর্মসূচি গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎসে পরিণত হবে। খালের দুপাড়ে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা হবে, যা পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি কাঠ ও ফলের চাহিদা মেটাবে। খাল খননকাজে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। খালের নাব্য ফিরলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হবে, যা বর্ষার অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেবে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে খাল খননের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মরু প্রক্রিয়া রোধ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টাও এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। এক কথায় এবারের খাল খনন কর্মসূচি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সবুজ বিপ্লবকে আরো বেগবান করবে।
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে ‘সাহাপাড়া-বলরামপুর খাল’ খননের মাধ্যমে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন হবে আজ। খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের ৫২০টি হারিয়ে যাওয়া নদী এবং অসংখ্য খালের স্বাভাবিক নাব্য ফিরিয়ে আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন, খাল খননকাজে যন্ত্রের চেয়ে শ্রমজীবী মানুষের ব্যবহার বেশি করতে হবে, যা হবে কমপক্ষে ৬০-৭০ শতাংশ, যাতে গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। এই কর্মসূচিতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির এই খাল খনন কর্মসূচির ফলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানি ধরে রাখা এবং বর্ষার জলাবদ্ধা দূর করে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হবে। তেমনি ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়িয়ে মাটির নিচের পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো, যা দেশকে মরুভূমিকরণ ও খরা থেকে রক্ষা করবে। খালের পাড় বরাবর ফলদ, ওষুধি ও জ্বালানি কাঠের গাছ লাগানোর মাধ্যমে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল পরিকল্পনাও এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রকল্পে কলকারখানার বর্জ্য যাতে খালে না পড়ে সে জন্য পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধনের জন্য দিনাজপুরের কাহারোলকে বেছে নেওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে দিনাজপুর ও উত্তরাঞ্চল হচ্ছে দেশের প্রধান কৃষিপ্রধান এলাকা। এ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে সেচব্যবস্থার অভাব এবং পানির স্বল্পতা প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। কাহারোলের এই খালটি খননের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের সেচ সমস্যা সমাধান করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জনদাবি ছিল। উত্তরাঞ্চলে বনায়নের হার দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় কম, মাত্র ৮-৯ শতাংশ। এই এলাকাকে মরুভূমিকরণ ও খরা থেকে রক্ষা করতে ভূ-উপরিস্থ পানির আধার তৈরি করা জরুরি, যা এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্ষা মৌসুমে কাহারোলসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় জলাবদ্ধতা সমস্যা দেখা দেয়। সাহাপাড়া খালটি পুনঃখনন হলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হবে, যা স্থানীয় অবকাঠামো ও ফসলের ক্ষতি কমাবে। তাছাড়া সাহাপাড়া খালটি প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এটি পুনঃখনন করতে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
খাল খনন কর্মসূচি সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে, পুরো ২০ হাজার খাল খনন কর্মসূচির অর্থায়ন মূলত তিনটি প্রধান খাত যেমন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বরাদ্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাজ্যের এফসিডিওর মতো সংস্থার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের স্বেচ্ছাশ্রম এবং ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ (কাবিখা) জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির তহবিল ব্যবহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এটিকে ‘সামাজিক বিপ্লব’ হিসেবে দেখছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় অর্থের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে বড় পুঁজি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
দিনাজপুরে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধনের সময় সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত থাকবেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। ইতোমধ্যে তিনি বলেছেন, এই খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের কৃষকদের ভাগ্য খুলে যাবে। এটি কৃষিজমির সেচ সুবিধার পাশাপাশি মাছ ও হাঁস চাষের সুযোগ সৃষ্টি করবে, যার ফলে গ্রামীণ মানুষ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। কাহারোলে সাহাপাড়া খালটি খননের ফলে সাড়ে ৩ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
খাল খনন কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও। তিনি এই কর্মসূচিকে বিপ্লবী আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, প্রথমপর্যায়ে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন হবে। এতে কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক হবে।
কী পোশাক পরবেন তারেক রহমান
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ও আইকনিক ছবিটির কথা কি মনে আছে? খাল খননের সেই ছবিটি ছিলÑতপ্ত রোদে ঘাম ঝরানো এক কর্মবীর নেতার ছবি। জিয়াউর রহমানের মাথায় ছিল সাদা টুপি, যেন স্নিগ্ধ এক আভিজাত্যের মুকুট; অথচ পরনে তার সাধারণ সাদা গেঞ্জি আর প্যান্ট। চোখের কালো চশমায় ঢাকা শান্ত অথচ দৃঢ় দৃষ্টি, যা সুদূরপ্রসারী এক আগামীর স্বপ্ন দেখিয়েছিল তৎকালীন বাংলাদেশের মানুষকে। হাতে ছিল তার কোদাল। জিয়াউর রহমান মাটি কেটে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে ছিলেন তপ্ত রোদে, দুপা মাটির গভীরে গেঁথে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আরাম ছেড়ে তিনি সেদিন নেমে এসেছিলেন মেঠোপথের ধুলোবালিতে। তার হাতের কোদাল যখন মাটির বুকে আঘাত হানে, তখন যেন জেগে উঠেছিল হাজার বছরের ঘুমন্ত বাংলাদেশ। সেদিনের ঘামে ভেজা সেই সাদা গেঞ্জিটি সাক্ষ্য দিচ্ছিলÑদেশ গড়ার কারিগর কোনো গালভরা বুলি নয়; বরং হাড়ভাঙা খাটুনি আর মাটির কাছাকাছি যাওয়ার নাম। সেদিন জিয়াউর রহমানের ছবিটিতে তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নন, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার কৃষক, শ্রমিক আর মেহনতি মানুষের এক অকৃত্রিম প্রতিচ্ছবি। যেখানে আভিজাত্য মিশে গিয়েছিল ঘামের গন্ধে আর নেতৃত্ব মিশে গিয়েছিল সাধারণের হৃদয়স্পন্দনে।
আজ খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করতে এসে আমরা হয়তো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও একইরূপে কিংবা তার মতো করে দেখব। সাদা শার্ট, প্যান্ট ও ক্যাডস পরে খাল কাটছেন তারেক রহমান। তার সেই ছবিটি কী হবে, সেটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা দেখতে পাব।
শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার ঐতিহাসিক স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছিলেন ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সেদিন জিয়াউর রহমান কৃষিবিপ্লব ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তিনি এই কর্মসূচিকে ‘সবুজ বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে বলেছিলেন, দেশের উন্নয়ন নিজেদেরই করতে হবে। তিনি শুধু নির্দেশনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং নিজে হাতে কোদাল নিয়ে মাটি কেটে জনগণকে স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেদিন শুধু ধান চাষ নয়, খালের দুই তীরে ফলমূলের আবাদ, খালে মাছ চাষ এবং হাঁস পালনের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে একটি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই কর্মসূচি পরে ‘জিয়াউর রহমান মডেল’ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং দেশব্যাপী একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপলাভ করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে দেশব্যাপী প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল বা ৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন হয়। তখন ১৫০০-এর বেশি খাল খনন করা হয়। এর ফলে প্রায় ১৬ লাখ একর অতিরিক্ত জমি সেচের আওতায় এসেছিল। ধান উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতার পর ধান উৎপাদন সেখানে প্রায় এক কোটি টন ছিল, খাল খননের ফলে সেই উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। জিয়াউর রহমানের এই বৈপ্লবিক কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। ১৯৭৭ সালে গাজীপুরে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চ ফলনশীল (এইচওয়াইভি) বীজের প্রবর্তন এই অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছিল। ওই সময়ে (১৯৮০-৮১) বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক লাখ টন চাল বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার পর এক বিশাল মাইলফলক।
খাল কাটা হলে সারা...
‘খাল কাটা হলে সারা, দূর হবে বন্যা-খরা’Ñএই শিরোনামে ১৯৭৯ সালে দৈনিক দেশ ও দৈনিক কিষাণ পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে আমার নামে প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল। সেই লেখাটি ছাপার ব্যবস্থা করেছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আমি তখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী। পরীক্ষায় খাল খনন বিষয়ে রচনা আসবে ভেবে রচনাটি তৈরি করে মুখস্থ করেছিলাম। এমনি সময়ে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর বাঁকে খাল খনন করতে এসেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়া। হবিগঞ্জের এসডিও ছিলেন তখন আজিজুর রহমান। তিনি বৃন্দাবন কলেজ এবং শহরের স্কাউট, গার্ল গাইডস ও ছাত্রছাত্রীদের প্রায় এক মাস ট্রেনিং করিয়ে খোয়াই নদীর বাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্টকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার জন্য। সেখানে যাওয়ার সুযোগ আমিও পেয়েছিলাম। খোয়াই নদীর বাঁকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আগমনের দিনে আমি আমার মুখস্থ করা ‘খাল খনন’-বিষয়ক রচনাটি সাদা কাগজে লিখে তাঁর জন্য নিয়ে যাই। কাঙ্খিত সেই মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ পেয়ে তাকে স্যালুট জানিয়েই প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে রচনাটি বের করে প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দিই । তিনি আমাকে বেশ বেশ বলে পিঠ চাপড়ে দেন। কিন্তু আমার জন্য আরো এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল, যা আমি জানতাম না। চার-পাঁচ দিনের মধ্যে একদিন দেখলাম আমার রচনাটি দুটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে আমারই নামে। ছাপার অক্ষরে নিজের নামে প্রথম লেখা। অন্তত একশবার নিজেই পড়েছি। তারপরও আবেগ ধরে রাখতে না পেরে হবিগঞ্জের তৎকালীন প্রখ্যাত সাংবাদিক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল ভাইয়ের কাছে চলে যাই। তিনি হবিগঞ্জের একজন নামকরা আইনজীবীও। তিনি লেখাটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে বলেন, তোমাকে পত্রিকায় সাংবাদিক করে দেব। কিছুদিনের মধ্যেই আমি ঢাকার র্যাংকিন স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার মুখ’ পত্রিকার হবিগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ লাভ করি। মাথায় তখনই সাংবাদিকতার পোখাটা ঢুকে যায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে কাজ পেয়ে যাই দৈনিক বাংলায়। রসায়ন শাস্ত্রে পড়াশোনা করেও সাংবাদিকতায় খাতাতেই নাম লিখিয়ে ফেলি। আজ যখন খাল খনন কর্মসূচি আবার শুরু হলো, তখন সেই গল্পটি আর লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। এর আগে অবশ্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্মরণিকায় এ বিষয়ে লিখেছি। এক অর্থে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এক মুহূর্তের সান্নিধ্যই আমাকে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়ে এসেছে। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে সরকারের সময় দেশনেত্রী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সান্নিধ্যে থেকে কাজ করেছি তার প্রেস উইংয়ে। তখনো খাল খনন কর্মসূচিতে তার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। খাল খননবিষয়ক জাতীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবেও কাজ করেছি। তখন বৃক্ষরোপণ জাতীয় কমিটিরও সদস্য ছিলাম। ‘গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান : প্রধানমন্ত্রী’ আমার দেওয়া এ স্লোগানটি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পছন্দ করেছিলেন। এই স্লোগান লেখা স্টিকার লাখ লাখ কপি ছেপে বিতরণ হয়েছে, যা যানবাহনে কিংবা যথোপযুক্ত জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে।
আজ যে খাল খনন কর্মসূচি তারেক রহমান শুরু করছেন, সেটাও আমার ধারণা এক দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও নদী খননের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু কৃষি বা অর্থনীতিতে বিপ্লব আনবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পৃথিবীকে এক নতুন ‘সবুজ বাংলাদেশের’ পথ দেখাবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ
abdal62@gmail.com