ডিসেম্বরে শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ শরিক হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ড কিছু সময়ের জন্য সমগ্র জাতিকে শোকে কাতর করে তুলেছিল।
তারপর প্রায় বরাবরের মতোই মানুষের আবেগ ধীরে ধীরে কমে যায়। বেঁচে থাকার ভারে ভারাক্রান্ত সাধারণ মানুষ অনির্দিষ্টকালের জন্য শোক প্রকাশ করে না। তাদের শোক ম্লান হয়ে যায় এবং ব্যস্ত হয়ে পড়ে জীবনযাত্রা।
বাংলাদেশ এর আগেও এটি দেখেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কথাই ধরুন, যার হত্যাকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ক্ষোভে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। আবু সাঈদের হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা এবং পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যুর ঘটনা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে। এটি দেয়ালে দেয়ালে আঁকা, ঠাঁই পেয়েছে পাঠ্যপুস্তকেও।
আবু সাঈদের এই ছবি অমর। কিন্তু তার জন্য শোক অমর বা চিরস্থায়ী নয়। আজ তার মৃত্যুকে ঘিরে যে শোক, তা সম্ভবত কেবল তার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠজনদের একটি ছোট বৃত্তের মধ্যেই রয়ে গেছে। বাকি সবার জন্য এটি প্রতিদিনের কষ্টের জীবনযাত্রা দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
আবু সাঈদের শাহাদাত গণঅভ্যুত্থানের সূত্রপাত করে, যা অবশেষে হাসিনার দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে। সাঈদের আত্মত্যাগ একটি কার্যকর উদ্দেশ্য সাধন করেছে। ইতিহাস পরিবর্তনশীল। তার অধ্যায় যতই দুঃখজনক হোক না কেন, তা এখন সম্পূর্ণ।
কিন্তু হাদির মৃত্যু সেরকম নয়। নিহত হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পরেও তার শাহাদাত অসমাপ্ত ও অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং ঠিক এ কারণেই জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া এখনো এত তীব্র এবং মানুষের আবেগকে এখনো নাড়া দেয়। তাকে দেওয়া সম্মান, তার জন্য শোকের তীব্রতা জীবন্ত অবস্থার চেয়েও অনেক বেশি প্রভাব ফেলছে মানুষের মধ্যে। এটি এখন মানুষের মধ্যে ‘হাদি প্রভাব’ হিসেবে কাজ করছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ক্লিপ এবং টেলিভিশন টক শো’র মাধ্যমে হাদি জনসাধারণের চেতনায় প্রতিনিয়ত জীবন্ত হয়ে উঠছেন, যেখানে তিনি কিছু পরিচিত সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ভাইরাল সংঘর্ষে লিপ্ত ছিলেন। শারীরিকভাবে তিনি ছিলেন বিনয়ী, চুল ও দাড়ি এলোমেলো, খাটো; কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। তার শক্তি ভাষার মধ্যেই নিহিত ছিল। তিনি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা একটি অমায়িক বাংলায় কথা বলতেন, যা ছিল ঢাকার শহুরে অভিজাতদের মসৃণ, দেশপ্রেমিক ভাষা থেকে অনেক দূরে। এটি এমন একটি কণ্ঠস্বর ছিল, যা লাখ লাখ লোকের কাছে পরিচিত, এমনকি ঘনিষ্ঠও মনে হতো।
একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী হাদি সাধারণ মাদরাসা শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তিনি তার প্রখর মেধা দিয়ে সমাজের একটি অস্থির সংমিশ্রণকে মূর্ত করে তুলেছিলেন—সমাজের প্রতিষ্ঠিত শ্রেণিবিন্যাসকে হুমকির মুখে ফেলার মতো যোগ্যতা তার ছিল। তিনি সম্পূর্ণভাবে এই ব্যবস্থার ভেতরে যেমন ছিলেন না, আবার এর বাইরেও ছিলেন না। ৯০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার বাংলাদেশে তার ধার্মিকতা ছিল অমায়িক এবং গভীরভাবে ইসলামিক, যা দেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, তাদের মুসলিম পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্যবোধকে জাগ্রত করেছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর হাদি মূলধারার মিডিয়ার ক্রমাগত মনোযোগ আকর্ষণ করতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবশিষ্টাংশ যখন সতর্কতার সঙ্গে প্রত্যাবর্তনের জন্য চেষ্টা করছিল, তখন তিনি তাদের মুখোমুখি হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে তার ভাষা ছিল রুক্ষ ও প্রায়ই আপত্তিকর এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তিনি এটা করতেন। আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনরায় প্রবেশের অনেক আগেই হাদি তার সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দলটিকে জনজীবনে ফিরিয়ে আনার বিপদ সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছিলেন।
এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক লড়াই ছিল না। হাদির লড়াই—যদি বলা যায়—সরাসরি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ছিল। কয়েক দশক ধরে হাসিনার আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করেছিল। মিডিয়া ও শিক্ষায় তাদের পছন্দের বয়ান দিয়ে পরিপূর্ণ করেছিল। নীতিগতভাবে এটি আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী একটি মধ্য বাম দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভাষা, পরিচয়, সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর তার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বেশিরভাগই এই দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিচিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফলপ্রসূ বলে মনে করেছিল।
কিন্তু হাসিনার টানা চার মেয়াদের সরকার, যার মধ্যে তিনটি নির্বাচনই অংশগ্রহণমূলক নয় এবং কারচুপিপূর্ণ ছিল বলে বিবেচিত, তারা সেই সাংস্কৃতিক প্রকল্পটিকে বাস্তবায়ন করেছিল, যা একসময় প্রচারণা ছিল, তা ক্রমে গোঁড়ামিতে পরিণত হয়েছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সংকুচিত ও ইতিহাস সংশোধন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় পৌরাণিক ব্যক্তিত্বে উন্নীত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধকে ক্রমেই পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। সাংস্কৃতিক কাঠামো বহুত্ববাদী হওয়ার পরিবর্তে ভক্তিমূলক হয়ে ওঠে।
এর পরিণতি ছিল গভীর। প্রভাবশালী মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবীরা হাসিনা সরকারের এই বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার চেয়েও বেশি কিছু করেছিলেন। তারা এটি বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা বাংলাদেশিদের একটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বদৃষ্টিকে প্রান্তিক করে তুলেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ধর্মীয়ভাবে মধ্যপন্থি মুসলিম যারা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ জাতীয়তাবাদের আরোপিত সংস্করণে নিজেদের চিনতে পারেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন কার্যত শ্রদ্ধা থেকে ব্যাপকভাবে একটি রীতিনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। এ ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশের কোনো জায়গা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু বাস্তবে সেই ভিন্ন মত ভেতরে ভেতরে জোরদার হয়ে উঠেছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে দেশজুড়ে মুজিবের মূর্তি এবং দেয়ালচিত্র ভেঙে ফেলার মাধ্যমে। এই কাজগুলোকে কেবল ভাঙচুর হিসেবে চিত্রিত করা ভুল হবে, বরং এগুলো ছিল রাষ্ট্র-অনুমোদিত গোঁড়ামি থেকে সাংস্কৃতিক সংস্থা পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টা, তা যতই কাঁচা হোক না কেন। এর মূলে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ জোর করে প্রয়োগ না করে ধর্মীয় সংযমের ওপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি।
এই ভাঙনকে শরীফ ওসমান হাদির চেয়ে আর কেউ স্পষ্টভাবে ধারণ করতে পারেননি। হাদির সম্মিলিত চেতনায় এর একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। কোনো স্পষ্ট হিসাব-নিকাশ ছাড়াই তিনি প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় আবির্ভূত হন এবং তারপরে মূলধারার প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করেন। পদ্ধতিগতভাবে তিনি মিডিয়া-বুদ্ধিজীবী জটিলতার ভন্ডামি প্রকাশ করেন, যা হাসিনার কর্তৃত্ববাদকে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের আবরণে সক্ষম করেছিল।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই অনেক বাংলাদেশির কাছে হাদি সেই কণ্ঠস্বরের মতো শোনাচ্ছিলেন, যা তারা এতদিন শুনতে চেয়েছিলেন। তিনি উচ্চ স্বরে যা বলেছিলেন, তা অন্যরা ফিসফিস করে বলেছিলেন, বা নিজেদের সম্পূর্ণরূপে দমন করে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু হাদিকে এ ব্যাপারে আন্তরিক বলে মনে হয়েছিল এবং এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন প্রায় বেপরোয়া এবং একই সঙ্গে সততার প্রতীক। বিভিন্নজনের দ্বিমুখী বক্তব্যে ক্লান্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে হাদির সেই সততা চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করেছিল সবাইকে।
হাদি সমালোচনা করেই থেমে থাকেননি। জনসাধারণের তহবিল দিয়ে তিনি ‘ইনকিলাব সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তোলার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা। এর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—ইসলামী মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ-ভিত্তিক একটি সাংস্কৃতিক বাগ্ধারা প্রচার করা, যা দীর্ঘকাল ধরে অভিজাত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গড়ে তোলা সংকীর্ণ, নগরভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ নান্দনিকতার পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামাজিক প্রবৃত্তির সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয়। অনেক বাংলাদেশি যারা বাংলা সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির প্রভাবশালী সংস্করণকে এতদিন চাপিয়ে দেওয়া বা বর্জনীয় হিসেবে দেখেছিলেন, তাদের কাছে ইনকিলাব সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
আসন্ন নির্বাচনে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত তাকে প্রায় রাতারাতি একজন উদীয়মান রাজনীতিবিদে উন্নীত করেছিল। কোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই হাদি ক্ষমতাপ্রত্যাশী একটি দলের একজন অভিজ্ঞ ও ধনকুবের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন। এক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যতা ছিল তীব্র। এই আসনের নির্বাচন সারাদেশের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
হাদি তার নির্বাচনি প্রচারণায় খালি হাতে বের হতেন। সাধারণ মানুষই তাকে ভালোবেসে তার পকেটে টাকা দিত। বিলবোর্ডের পরিবর্তে লিফলেট, মোটরকেডের পরিবর্তে হ্যান্ডশেক ছিল তার নির্বাচনি প্রচারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি ভোটারদের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করতেন, শ্রমিকশ্রেণির পাড়া-মহল্লায় হেঁটে যেতেন এবং আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন, যা তাকে শুরুতেই চেনাতে সাহায্য করেছিল। সোশ্যাল মিডিয়া বাকি কাজটি করেছে।
হাদির আবেদনের মূলে ছিল তার সম্পর্কে একটিমাত্র দৃঢ় বিশ্বাস, যা আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুততার সঙ্গে স্থান করে নিয়েছিল—তিনি ছিলেন অজেয়। হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের অবসানের পর দুর্নীতি তার দুঃশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষর হয়ে ওঠে। হাদি নিজেকে এর বিপরীত হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি সহজ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—আর তা ছিল এটাই যে, তিনি সাহসের সঙ্গে ক্ষমতাবানদের মুখোমুখি হবেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল স্থপতি হাদি ছিলেন না; কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি এই বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠেন। টেলিভিশন বিতর্কে হাদি মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনি প্রচারণার পথের হাদি মানুষের মনের আরো গভীরে পৌঁছেছিলেন।
এ থেকেই ব্যাখ্যা করা যায়, কেন তার হত্যাকাণ্ড এক স্পষ্ট ক্ষতির অনুভূতি তৈরি করেছিল; কেন বাংলাদেশের এত সাধারণ মানুষ অনুভব করেছিল যে, তাদের কাছ থেকে অপরিহার্য কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী