হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার নির্মম বাস্তবতা

ডা. মির্জা ইস্কান্দার

ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় ২টা। রাজশাহী জেলার একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছি। একজন রোগীকে তার আত্মীয়স্বজন অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে এলেন। রোগীর ইতিহাস নিয়ে জানলাম, আগে থেকেই তার ডায়াবেটিস ছিল। এখন এই রোগী বা যেকোনো মানুষের অজ্ঞান হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। প্রাথমিকভাবে অন্তত রোগীর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে, যাতে হাইপো বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া হয়েছে কি না, তা জানা যায়। কিন্তু গ্লুকোজ পরীক্ষার জন্য জরুরি বিভাগে থাকা একমাত্র গ্লুকোমিটারটিও কিছুদিন ধরে কাজ করছে না। হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা আছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য ইসিজি মেশিন চালু করে দেখা গেল, সেটি থেকে কয়েক দিন ধরে কাগজ প্রিন্ট হচ্ছে না।

কিছুদিন ধরে কাজ করছে না শুনে মনে হতে পারে, আগে হয়তো যন্ত্রগুলো ঠিকমতো কাজ করত। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ সময় এসব যন্ত্র এ রকম অকেজো অবস্থাতেই থাকে। স্টোরকিপার বা ইউএইচএফপিও মহোদয়কে বারবার বলার পর কারো মনে যদি সামান্য দয়া হয়, তাহলে তাদের মর্জিমতো যন্ত্রগুলো কিছু সময়ের জন্য ঠিক করা হয়।

অগত্যা অজ্ঞান রোগীটিকে একটি স্যালাইন দিয়ে শহরের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলাম, এই আশায় যে সেখানে অন্তত কিছুটা বেশি সেবা পাবেন। পাঠানোর জন্য সরকারি যে অ্যাম্বুলেন্সটি রয়েছে, সেটিও প্রায় এক মাস ধরে নষ্ট। সেটি ঠিক করার কোনো তাগিদ নেই।

একটি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাস্তব চিত্র এটি। একজন চিকিৎসক হিসেবে বলতে পারি, দেশের মোটামুটি চার শতাধিক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রায় সবগুলোর অবস্থা এর কাছাকাছি। সামান্য কমবেশি হতে পারে।

মাঝেমধ্যে অদ্ভুত মনে হয়। সবাই সবকিছু জানেন, সবকিছুই বোঝেন, কিন্তু কেউ কেন জানি পরিবর্তন চান না। কেউ সামান্যটুকু চেষ্টাও করেন না মূল সমস্যাগুলো দূর করতে। বিষয়গুলো খুব যে কঠিন, তা-ও নয়। এই যে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শনে যাচ্ছেন। তরকারিতে লবণ ঠিক আছে কি না, রোগীর বিছানায় ছারপোকা আছে কি না, টয়লেটে কেমন গন্ধ—এসব বিষয়ে মন্ত্রীর সচেতনতা মন্দ নয়। আবার চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তার গৃহীত ব্যবস্থাগুলোও প্রশংসনীয়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, একজন রোগীর জরুরি সেবার ন্যূনতম উপকরণও যে অধিকাংশ উপজেলা, এমনকি সদর হাসপাতালেও নেই, সে বিষয়ে মন্ত্রী বা সচিব সাহেবদের খুব বেশি কথা বলতে দেখি না।

যেখানে উপজেলাগুলোতে ইসিজি মেশিনই ঠিকমতো কাজ করে না, গ্লুকোমিটারের স্ট্রিপ ফুরিয়ে গেলে যেখানে ১৫-২০ দিনেও নতুন স্ট্রিপ পাওয়া যায় না, সেখানে একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাদের স্বপ্ন দেখান সব উপজেলায় ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের, উপজেলা পর্যায়ে ক্যাথল্যাব স্থাপনের। আফসোস আর রাখি কোথায়! নষ্ট ইসিজি মেশিনের কারণে পরীক্ষা করাতে না পেরে যখন ফেসবুকে ঢুকে মন্ত্রীর এসব বক্তব্য সামনে আসে, তখন হাসি পায়।

সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এর পাশাপাশি আগের সেই ভয় ও শঙ্কাটাও জেগে উঠছে—শুধু কি কংক্রিটের ভবন হবে, নাকি ভেতরে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও থাকবে? চকচকে ভবন, কিন্তু ভেতরে সেই অ্যানালগ এক্স-রে মেশিন; তাও আবার অপারেটরের পদ শূন্য থাকায় এক্স-রে কার্যক্রম বন্ধ। এমনটি যাতে না হয়, সে আবেদন সরকারের কাছে রইল।

উপজেলা পর্যায়ে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবার যে কাঠামো রয়েছে, তার সঠিক ব্যবহার করতে পারলে অনেক রোগীকে বাড়তি অর্থ খরচ করে, অনেক কষ্ট ও হয়রানি সহ্য করে জেলা, বিভাগীয় শহর বা রাজধানীতে গিয়ে ভিড় করতে হতো না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও অবহেলার কারণে সামান্য সমস্যা বা রোগের চিকিৎসার জন্যও যখন একজন রোগী ও তার পরিবারকে দূরদূরান্তে যেতে হয়, তখন সেটিকে তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবিচারই বলতে হয়।

সবার আগে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত, বিদ্যমান অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার পূর্ণ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা। এটি করতে পারলে উপজেলা পর্যায়ের মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে অনেক হয়রানি, বিড়ম্বনা, ভোগান্তি ও বাড়তি অর্থ খরচ থেকে মুক্তি পেতেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সততা এবং বর্তমান বাস্তবতা

আর কত খেসারত দেবে শিক্ষার্থীরা

নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতের লড়াই

অনিশ্চিত সময়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে সবাই ডুববেন

সাধারণে বিপর্যয়, অসাধারণে অর্জন

অরুণাচলে ভারতের পরাজয়ের শঙ্কা

আওয়ামী লীগ পুনর্মিলনের আলোচনার আড়ালে

ক্ষমতার পালাবদল ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা

ঋণের জালে অর্থনীতি

হামের টিকা নিয়ে উদ্বেগ: শিশুদের জন্য মানসম্মত টিকা নিশ্চিত করুণ