স্নেহাস্পদ এক ছাত্রের পাঠানো একটি বয়ান শুনে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) এককালের বিখ্যাত কবিতা ‘নতুন কিছু করো’র শুরুর দিকের বেশ কয়েকটি পঙ্ক্তি মনে পড়ে গেল—
নতুন কিছু করো,
একটা নতুন কিছু করো।
নাকগুলো সব কাটো,
কানগুলো সব ছাঁটো;
পাগুলো সব উঁচু করে,
মাথা দিয়ে হাঁটো;
হামাগুড়ি দাও, লাফাও,
ডিগবাজি খাও, ওড়ো;
কিংবা চিৎপাত হয়েÑ
পাগুলো সব ছোঁড়ো;
ঘোড়াগাড়ি ছেড়ে এখন
বাইসিকেলে চড়ো।
কিংবা সবাই ওঠো, টাউন হলে জোটো;
ধর্ম প্রচার করতে আমেরিকায় ছোটো;
আমরা যেন নেহাতই খাটো
হয়ে না যাই দেখো,
খুব খানিক চেঁচাও কিংবা খুব খানিক লেখো;
ছাড়ো, আবার ভাগবত পড়ো।
Ñনতুন কিছু করো, একটা নতুন কিছু করো।
কলিকালে কত কিছুই নতুন দেখতে ও শুনতে পাচ্ছি। এই বয়ানেও তেমনই অদ্ভুত কিছু পেলাম। অন্য অনেক সঠিক, সাহসী ও অপ্রিয় বক্তব্যের ভেতর তিনি বলে বসেন ভয়ংকর এক ভ্রান্ত কথা—‘ধর্মে বিশ্বাস বলে কিছু নেই!’
প্রেরিত বয়ানটি শ্রদ্ধেয় অগ্রজপ্রতিম মার্কসীয় চিন্তাধারার বুদ্ধিজীবী বলেই প্রতীয়মান এমন একজনের একটি চিত্রায়িত উপস্থাপন (ইউটিউব) পাঠান, যিনি সম্প্রতি একজন আধুনিক বাউল ধর্মগুরু বলেও আবির্ভূত। সাধারণত এ ধরনের চিত্রায়িত উপস্থাপন (ইউটিউব) দেখার বা শোনার অভ্যাস নেই। একজন আধা বাঙালি আধা জার্মান বালকের কিছুদিন আগে আবিষ্কৃত ‘ইউটিউব’ নামের এই ভয়ংকর অদ্ভুত জন্তু বা যন্ত্রের মাধ্যমে জ্ঞানরাজ্যে যে অভাবিত নৈরাজ্যের অরাজকতার দুয়ার অবারিত হয়েছে, তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনাগ্রহেই এমন। কিন্তু মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম ঘটে, আর এই বিশেষ ক্ষেত্রেও প্রেরিত চিত্রায়িত উপস্থাপনাটি (ইউটিউব) মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। বক্তার মার্কসীয় দর্শন, সামাজিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা আর সমাজে ধর্মের অনস্বীকার্য গুরুত্ব সম্পর্কে তার উপলব্ধির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই উপস্থাপনাটি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম, যদিও আমি নিজে মার্কসবাদী নই, ধর্মান্ধতারও ভক্ত নই। আর বয়ানটি চিন্তাশীল স্নেহাস্পদ ছাত্রটি পাঠিয়েছিল বলেও আরো মনোযোগ দিয়ে দেখলাম বা শুনলাম।
বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেছেন, যথার্থ সাহসিকতার সঙ্গে। তার জন্য সাধুবাদ। কিন্তু মার্কসীয় দর্শন ধর্মীয় বলে চালানো যে কূপমণ্ডূকতা বিনাশে আগ্রহী, তার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে একপর্যায়ে ধর্ম নিয়ে ওই যে এমন একটি অদ্ভুত নতুন কথাও বলে ফেলেন, যার যথাসাময়িক সংশোধনী দরকার মনে করেই কলম ধরলাম।
দুদিন হলো মার্কসীয় দর্শনের এশীয় প্রেক্ষিতে প্রয়োগের প্রচেষ্টার মহানায়ক মাও সে তুংয়ের চীন থেকে এসেছি—চীনের সে মাও সে তুংও ধর্মসংক্রান্ত এই নতুন অদ্ভুত কথাটিতে হয়তো তাজ্জব হতেন। স্বয়ং মার্কসও! ধর্মের পাশ্চাত্য সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পাণ্ডিত্যের পণ্ডিত, আর ধর্মানুরাগী ধর্মগুরুদের কথা তো রইলই!
ওই বিশেষ গুরুজনপ্রতিম চিন্তাবিদ পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী না হলে হয়তো বলেই ফেলতাম, এমন অদ্ভুত নতুন কথাটি বলে ফেলা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ওই ‘নতুন কিছু করো’র মতো ধর্মসংশ্লিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক স্টান্টবাজির মাধ্যমে কিছু দর্শক-শ্রোতাকে বিমোহিত করে আকর্ষিত করার চেষ্টার অংশই মাত্র; অনুজপ্রতিম হিসেবে সে বেয়াদবি এখানে করব না। দার্শনিকের দর্শনদৃষ্টির কিঞ্চিৎ ভ্রান্তিই ধরে নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ্যেসহ সব সত্যাগ্রহীর জন্য তার সংশোধনী দেওয়ার চেষ্টা করব।
বিশ্বাসই ধর্মের বীজ, আর তার কেন্দ্রসম সারবত্তা। একে বাদ দিয়ে ধর্ম হয় না; কোনো ধর্মই হয় না। বলা হয়, বৌদ্ধধর্মে নাকি কোনো বিশ্বাস নেই, আছে শুধু দর্শন। কোনো এক সময় শ্যামদেশে (‘থাইল্যান্ড’-এ) বৌদ্ধ দর্শনে নিযুক্ত ‘আচার্ন’ (‘আচার্যন’ / ‘আচার্যম’, বা ‘আচার্য’) হিসেবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকেই বলতে পারি, কথাটি ঠিক নয়। বৌদ্ধ দর্শনটি বৌদ্ধধর্ম থেকেই প্রবাহিত ঠিক সেভাবেই, যেমনটি খ্রিষ্টীয় দর্শন প্রবাহিত খ্রিষ্টধর্ম থেকে। কিন্তু ধর্ম আর দর্শন এক নয়, দর্শন ধর্ম থেকে প্রবাহিত হলেও। উদাহরণস্বরূপ, আমার নিজের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টীয় পণ্ডিতদের মাধ্যমে পড়াশোনার ভেতর দিয়ে খোদ যিশুখ্রিষ্ট থেকে ধারাবাহিক সনদপরম্পরায় খ্রিষ্টীয় দর্শনে সনদ থাকলেও আমি খ্রিষ্টধর্মের ওই পর্যায়ের পাণ্ডিত্য ধারণ করি না। একইভাবে বৌদ্ধ সমাজে বৌদ্ধ দর্শন পড়ানোর জন্য নিযুক্ত আচার্ন বা আচার্য হলেও বৌদ্ধধর্মের পণ্ডিত নই সে পর্যায়ে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মোৎসারিত দর্শনের যৎসামান্য জ্ঞান থেকেই বলতে পারি, দর্শন উৎসারিত যে ধর্ম থেকে, তা তার মৌলিক ধর্মবিশ্বাস থেকেই। দর্শনের পরিভাষায় দর্শনের ভিত্তিরূপ এমন কিছু মৌলিক বিশ্বাস, যা প্রমাণোর্ধ্ব, তাকে স্বতঃসিদ্ধ, সিদ্ধান্ত বা মূলতত্ত্ব বলা হয়। এর সবই কোনো না কোনো ধর্মবিশ্বাস থেকে উৎসারিত।
ইউরোপের জনসাধারণ এবং সত্যসন্ধানী পণ্ডিত ও বিপ্লবীরা ধর্মব্যবসায়ী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভণ্ডামি ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের প্রধান ধর্ম, তথা খ্রিষ্টধর্মকে পরিত্যাগে উদ্যত হলে ধর্মকেই বাদ দিয়ে তার বিকল্প হিসেবে দর্শনকে তুলে ধরতে গেলে, তার ভিত্তিরূপ ‘স্বতঃসিদ্ধ’ সন্ধানে প্রবৃত্ত হলে, তার উৎস হিসেবে ইউরোপে প্রচলিত ধর্ম খ্রিষ্টবাদ, ও তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ইউরোপীয়দেরই প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করা ইহুদি ও ইসলাম ধর্ম—এসব বাদ দিয়ে, তারও পেছনে, প্রাচীনতর ইউরোপের ধর্ম, তথা গ্রিক পৌত্তলিক ধর্মের বিশ্বাস ও জগদ্দৃষ্টির (Weltanschauung) দ্বারস্থ হয়ে তারই পুনরুজ্জীবনে (Renaissance) প্রবৃত্ত হয়। দর্শনের নামে প্রাচীন গ্রিক ও তার উৎস, ব্যাবিলনীয় ও প্রাচীন মিসরীয় পৌত্তলিক, শয়তান-উপাসনামূলক জাদুবিদ্যাভিত্তিক ধর্মবিশ্বাস, চর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির ‘পুনরুজ্জীবন’কে ‘নবজাগরণ’ বলেও তাকে প্রচলিত ধর্মের বিকল্প হিসেবে প্রচলিত করে সেই সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিন্তু পথভ্রষ্ট বিপ্লবী ও তাদের অনুগামী। মধ্যযুগের ক্রুসেড যুদ্ধে এসে ইউরোপীয় যোদ্ধাদের অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে সংগোপনে সংগঠিত শয়তানপূজারি জাদুবিদ্যাভিত্তিক ধর্মচর্চার গোপন নিয়ম শিখে, তার চর্চাকারীদের গোপন সংগঠন গড়ে তোলে ইউরোপময়, আর ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা বিস্তারের ভেতর দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায়, বিশেষ করে সমাজপতি ও শাসক শ্রেণিগুলোর ভেতর।
এদের প্রভাবে প্রাচীন গ্রিক, ব্যাবিলনীয় ও মিসরীয় জাদুবিদ্যাভিত্তিক শয়তানপূজারি পৌত্তলিক ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারে ‘নবজাগরণ’-এর প্রবক্তারা প্রচলিত ধর্মগুলোর গণগ্রহণীয়তা ও জনপ্রিয়তার শেকড় কাটতে ধর্ম বিষয়টিরই বিরোধিতার ভান করে তার পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে দর্শন, ও তার অন্যতম শাখা বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠার কথা বলে, যদিও তার আড়ালে নানা মোড়কে, তাদের নিজেদের প্রাচীনতর ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি, আচার-আচরণ ও চর্চার প্রসার করে। অন্যদিকে তারা প্রচলিত ধর্মের কোনো একটা চর্চার ভান করে, ভেতর থেকে তার শেকড় কাটতে তার বিশ্বাসগুলোকে হয় অস্বীকার বা পরিবর্তনের কার্যক্রম করে। এরই প্রভাবে বিভিন্ন সমাজে নানা ‘নবজাগরণ’-ধারার বুদ্ধিজীবী, সমাজের প্রচলিত ধর্মচর্চা করে তার গুরু সেজে বসে সে ধর্মের নিয়মনীতি, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে—তার অংশ হিসেবে, কখনো কখনো তার বিশ্বাসমালাকেই হয় বদলে দিচ্ছে, না হয় আমূল অস্বীকারই করে ফেলার প্রচার করছে—নিজেরা যে এর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছেন, সেটা না জেনে না বুঝেই।
মস্তিষ্কবিজ্ঞান অনুযায়ী কোনো জীবের মস্তিষ্কই কোনোরূপ বিশ্বাসমালা ছাড়া কার্যকর হতে বা থাকতে পারে না; মানুষের তো নয়ই। মস্তিষ্কমাত্রই দ্বিমিক (binary), অর্থাৎ তা কার্যকরই হয় সব সময়ই দুই সম্ভাব্য করণীয়ের ভেতর একটি বেছে নিয়ে তার ওপর কার্যকর হয়। দুই সম্ভাবনার ভেতর এভাবে একটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে, মস্তিষ্ক যেই সম্ভাবনাকে সঠিক বিশ্বাস করে, তাকেই বেছে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন চুরি করবে, না করবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক চুরি করা ঠিক বলে বিশ্বাস করলে, চুরি করার সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন মিথ্যা বলবে, না বলবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক মিথ্যা বলা ঠিক বলে বিশ্বাস করলে, মিথ্যা বলার সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন ঘুস খাবে, না খাবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক ঘুস খাওয়া ঠিক বলে বিশ্বাস করলে ঘুষ খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।
এ রকম নানা বিশ্বাসের সমষ্টি নিয়ে বিশ্বাসমালা দিয়েই মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি পরিচালনা ব্যবস্থা রূপায়িত হয়। একটি কম্পিউটার যেভাবে তার ‘ডিস্ক অপারেটিং সিস্টেম (DOS)’ দ্বারা তার অজ্ঞাতেই পরিচালিত হয়—মস্তিষ্কও সেভাবে এই বিশ্বাসমালার দ্বারা, সাধারণত তার সচেতনতা ছাড়াই পরিচালিত হয়।
ধর্ম মূলত এরূপ একটি বিশ্বাসমালা ও তার নির্দেশানুগ আচার-আচরণ এবং তদনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টি। দর্শনও এরূপ একটি বিশ্বাসমালা ও তদনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টি সংশ্লিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে। কিন্তু কিছু স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নেওয়া বিষয়ের ওপর বিশ্বাস বাদ দিয়ে না কোনো ধর্ম, না কোনো দর্শন বা তার শাখারূপ বিজ্ঞান সম্ভব।
তাই ধর্মে বিশ্বাস বলে কিছু নেই, কথাটি ধর্মমতেই শুধু নয়, বৈজ্ঞানিক বিচারেও একেবারেই অযৌক্তিক ও অসম্ভব। এমন কথা এমন এক নতুন অদ্ভুত কথা, যা শুধু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের উদ্ধৃত কবিতাটিতে উল্লিখিত নতুন কিছু করা বা বলার জন্য বলার মতো উদ্ভট কিছু বৈ নয়।
তাহলে বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবী কোন বুদ্ধিতে এমন কথা বলেন? ভাষাবিভ্রাটে এমন হয়েছে।
বক্তা বলেন, ধর্ম হলো ‘ঈমান’, আর ‘ঈমান’ অর্থ ‘সমর্পণ’, তাই এখানে বিশ্বাসের কোনো বিষয় নেই।
কিন্তু ‘ঈমান’-এর আক্ষরিক অর্থ ‘সমর্পণ’ নয়, ‘বিশ্বাস’। ‘ঈমান’-এর শব্দমূল ‘অ-ম-ন’-এর অর্থ ‘নিরাপত্তা’, সেখান থেকে নিরাপত্তাজনিত ‘শান্তি’, আর সেখান থেকে নিরাপত্তা ও শান্তির ভিত্তি, তথা নিরাপত্তাজাত শান্তিদায়ক ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ এবং তারই চূড়ান্ত রূপ হলো ‘আমান’, তথা ‘ঈমান’।
তাহলে ‘ধর্ম হলো সমর্পণ’—কথাটি কোত্থেকে এলো? তার উৎস অন্য একটি শব্দ, ‘ইসলাম’, যার অর্থ ‘সমর্পণ’। প্রাচীন সেমিটিক ভাষা, তথা আরব্য ভাষা ও সংস্কৃতি, যাতে সব ধর্মেরই আদি উৎস নিহিত, তাতে ধর্মের নাম হলো ‘ইসলাম’। যেমনটি কোরআন শরিফে বলা আছে, মোটামুটি ভাষান্তরে, ‘খোদার নিকট ধর্ম হলো ইসলাম।’ আর ‘জিবরাইলের হাদিস’ বলে পরিচিত হাদিস শরিফ মতে, ধর্মের তিন বলয়—তার একটি ‘ইসলাম’, অর্থাৎ ‘সমর্পণ’; দ্বিতীয়টি ‘ঈমান’, অর্থাৎ বিশ্বাস; আর তৃতীয়টি ‘ইহসান’, অর্থাৎ ‘সুন্দরায়ণ’, অর্থাৎ বিশ্বাসভিত্তিক সমর্পণকে সুন্দর করে তোলা।
ধর্ম তাহলে অবশ্যই সমর্পণ, তথা ‘ইসলাম’, কিন্তু তা শুধুই সমর্পণ নয়, বিশ্বাসের বিকল্প হিসেবেও নয়, বরং বিশ্বাসে সমর্পণ, তাও সুন্দরভাবে। তার মাধ্যমে বিশ্বস্ততা অর্জন ও তার মাধ্যমে নিরাপত্তামূলক শান্তি অর্জন ও প্রতিষ্ঠা।
ধর্মকে বিশ্বাসের বিকল্পে বিশ্বাসবিহীন সমর্পণ হিসেবে উপস্থাপনের সুবাদে বুদ্ধিজীবী নির্বুদ্ধিমূলক আরেকটি ভ্রান্তির অবতারণা করে বলেন, ধর্ম হিসেবে ‘সমর্পণ’ হবে ‘গায়েব’-এ, যার ভয়ংকর ভ্রান্ত ‘অনুবাদ’ করেন তিনি অস্তিত্বহীন বলে। অর্থাৎ, তার মতে, ধর্ম হবে বিশ্বাসহীন এক সমর্পণ অস্তিত্বহীনের। ধর্মের আবহমানকালের চিরায়ত ধারণায় আসলে তো ধর্ম হলো সমর্পণ আল্লাহ, ‘গড’ বা ঈশ্বরের। এই নতুন কিছু করো মার্কা নতুন উদ্ভট ধারণায় ধর্ম যদি হয় অস্তিত্বহীনের সমর্পণ, তাহলে কি তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আল্লাহ, গড বা ঈশ্বর অস্তিত্বহীন? এ কি ধর্মের নামে নাস্তিকতার উপস্থাপন ও পসরা? তার এ ভ্রান্তিরও উৎস ভাষাবিভ্রাট! কোরআন শরিফে ধর্ম শিক্ষা দিতে গিয়ে যে বলা হয়েছে, ‘গায়েব’-এ ‘ঈমান’-এর কথা, তার ‘গায়েব’-এর চরম ভুল ‘অনুবাদ’ করেছেন তিনি ‘অস্তিত্বহীন’ বলে, অথচ আরবি ‘গায়েব’ শব্দের অর্থ আদৌ অস্তিত্বহীন নয়, বরং পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুধাবনের বাইরে যা, তা-ই। একটি লোক বহু দূরে দেখা যাচ্ছে না, তার কোনো শব্দও শোনা যাচ্ছে না, তার ঘ্রাণও পাওয়া যাচ্ছে না, স্পর্শ দিয়ে তাকে অনুভবও করা যাচ্ছে না, চেটে তার স্বাদও নেওয়া যাচ্ছে না—সে অবস্থায় সে ‘গায়েব’; তাই বলে সে অস্তিত্বহীন নয়।
‘গায়েব’-এ ঈমানের অর্থ তাই অস্তিত্বহীনের সমর্পণ নয়, পঞ্চেন্দ্রিয়াতীত অস্তিত্বমানে বিশ্বাস, আর ধর্ম, তথা ‘ইসলাম’ হলো সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তাতে আত্মসমর্পণ।
বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি এভাবে অদৃশ্য বিশ্বাসে সমর্পণ করতে পারলে দেহ বেঁচে খাওয়া দেহজীবীতুল্য বুদ্ধি বেঁচে খাওয়া বুদ্ধিজীবী থেকে বোদ্ধাতে উত্তীর্ণ হয়ে ভ্রান্তির মায়াজাল থেকে মোহমুক্ত হতে পারেন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষও। আর তার ফলে ইউটিউবের এসব ফেতনা থেকেও আমরা সবাই মুক্ত হতে পারি।
লেখক: প্রফেসর, ঢাকা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশ ও বিদেশের বিবিধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূতপূর্ব শিক্ষক। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে তুলনামূলক মার্কসবাদ, ধর্মীয় সংস্কৃতি, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির ওপর পড়াশোনাপূর্বক পিএইচডি অর্জন করেন।