হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

চিত্তরঞ্জন সুতারের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা

মে জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

ব্রি. জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু বীরত্বের নয়; এটি সতর্কতারও ইতিহাস। এই ভূখণ্ড যেমন জন্ম দিয়েছে অসংখ্য দেশপ্রেমিক, তেমনি বিভিন্ন সময় জন্ম দিয়েছে এমন কিছু বিতর্কিত চরিত্র, যাদের নাম উচ্চারিত হয় সন্দেহ, ষড়যন্ত্র, বিদেশি প্রভাব, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রসঙ্গেও। সেসব বিতর্কিত নামের মধ্যে অন্যতম হলো চিত্তরঞ্জন সুতার—একজন যিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে ঘিরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ‘বঙ্গভূমি’ নামের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চালানোর অভিযোগ উঠেছে বহুবার। অভিযোগ রয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখারও।

তিনি ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদে বাকেরগঞ্জ-১৪ (বর্তমানে পিরোজপুর-১) আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। চিত্তরঞ্জন সুতার পেশাগতভাবে ‘র’-এর একজন এজেন্ট ছিলেন, যা বিভিন্ন লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা উল্লেখ করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মেজর জলিলও তার ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইয়ে চিত্তরঞ্জন সুতার সম্পর্কে এ কথা বলেছেন। চিত্তরঞ্জন সুতারের সঙ্গে সিরাজুল আলম খানেরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠতম লোকদের মধ্যেও একজন ছিলেন চিত্তরঞ্জন সুতার।

সমস্যা হলো, বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই ইতিহাসকে শুধু সাদা-কালো করে দেখি। কেউ হয় বীর, নয়তো খলনায়ক। কিন্তু চিত্তরঞ্জন সুতারের মতো চরিত্রদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরো গভীর—কীভাবে একজন ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লিয়াজোঁ হিসেবে পরিচিত থাকেন, আবার পরবর্তী ইতিহাসে বাংলাদেশের একটি অংশ আলাদা করে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠনের চক্রান্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন? এই প্রশ্ন নতুন প্রজন্মের সামনে তোলা জরুরি।

চিত্তরঞ্জন সুতারের জন্ম ১৯২৮ সালে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ অঞ্চলে। ১৯৩৭ সালের দিকেই তার বাবা-মা কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে ভবানীপুরের রাজেন্দ্রপুর লেনে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন। কিন্তু চিত্তরঞ্জন সুতার নিজের বাবা-মায়ের মতো কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি। তিনি নিজের বাপ-দাদার ভিটেমাটির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। নিয়মিতভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসা-যাওয়া করতেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ও মুজিবনগর সরকারের মধ্যে সংযোগ রক্ষার ভূমিকায় ছিলেন। অর্থাৎ, তিনি আড়ালের কেউ ছিলেন না; বরং একাধিক ঐতিহাসিক মুহূর্তে সংবেদনশীল ভূমিকায় উপস্থিত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে তাজউদ্দীন আহমদ, তোফায়েল ও রাজ্জাক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসায় দেখা করতে যান এবং তাকে তাদের সঙ্গে ভারতে পালাতে অনুরোধ করেন। কিন্তু মুজিব তাদের সঙ্গে ভারতে পালিয়ে যেতে অস্বীকার করেন এবং তাজউদ্দীন ও তোফায়েলের হাতে চিত্তরঞ্জন সুতারের কলকাতার ভবানীপুরের রাজেন্দ্রপুর লেনের বাসার ঠিকানা দিয়ে বলেছিলেন, ‘কলকাতার এই ঠিকানাতে তোরা সবাই যা। সেখানে গেলেই তোদের সব সাহায্য করা হবে।’ কলকাতার একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা এবং চিত্তরঞ্জন সুতারের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব প্রসঙ্গ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জনের বহু লেখায় ও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।

এমনকি সাম্প্রতিক এক আলোচনাতেও উল্লেখ করা হয়, সে সময় কিছু নেতার হাতে কলকাতায় চিত্তরঞ্জন সুতারের ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা ছিল বাস্তব, ঐতিহাসিক এবং অপরিহার্য এক ফ্যাক্টর। কিন্তু সেই সহায়তা ও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রভাব—এই দুটিকে এক করে ফেললে ইতিহাস বিকৃত হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, যুদ্ধকালীন সহযোগিতার আড়ালে কি কিছু ব্যক্তি নিজেদের এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যারা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের অঘোষিত সেতুতে পরিণত হন? এই প্রশ্নের জবাব সরল নয়, কিন্তু চিত্তরঞ্জন সুতারকে ঘিরে বিতর্ক সেই প্রশ্নকে উসকে দেয়।

স্বাধীনতার পর চিত্তরঞ্জন সুতারের রাজনৈতিক উত্থানও কম বিস্ময়কর নয়। যে ব্যক্তি কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক-গোয়েন্দা যোগাযোগের অভিযোগে ঘেরা, তিনিই আবার ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে সংসদে পৌঁছে যান। ইতিহাসের এই পর্বটি তাই শুধু একজন ব্যক্তির উত্থান নয়; এটি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের দুর্বলতাও তুলে ধরে। কেননা একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আনুগত্যের পরীক্ষা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোরতা এবং বিদেশি প্রভাব থেকে দূরত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ক্ষমতার খুব কাছে পৌঁছে যাওয়া কিছু মানুষকে ঘিরে নানামুখী সন্দেহ থাকলেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তাদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি। চিত্তরঞ্জন সুতারের এমপি হওয়া একটি নথিভুক্ত ঐতিহাসিক তথ্য; কিন্তু তার রাজনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে পরবর্তী অভিযোগগুলোর ব্যবধানই এই চরিত্রকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চিত্তরঞ্জন সুতারকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অধ্যায় হলো তথাকথিত ‘বঙ্গভূমি’ পরিকল্পনা। বিভিন্ন সূত্রে ‘বঙ্গভূমি’ বা ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন’কে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের কিছু অংশ নিয়ে একটি পৃথক হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কালিদাস বৈদ্যের নাম বেশি দৃশ্যমান হলেও চিত্তরঞ্জন সুতারকে এর সংগঠকদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অভিযোগটি যে নিছক বাতাসে ওড়া কথা ছিল না, তারও ইঙ্গিত মেলে। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতভিত্তিক সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অপরাধী গোষ্ঠীর ঘাঁটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ তোলা হয়েছিল এবং ভারতীয় পক্ষও এসব ক্যাম্প ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি দেয়। একই ধারার বহু প্রতিবেদনে ‘বঙ্গসেনা’ বা সংশ্লিষ্ট চক্রের নাম উঠে আসে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নিরাপত্তা-উদ্বেগ কেবল রাজনৈতিক ভাষণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা সীমান্ত-স্তরের আনুষ্ঠানিক আলোচনাতেও প্রতিফলিত হয়েছিল।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেকোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারণা—তা ধর্মীয়, জাতিগত বা আঞ্চলিক—শুধু একটি নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ। ‘বঙ্গভূমি’ কখনো গণআন্দোলনে রূপ নেয়নি, ব্যাপক জনভিত্তিও পায়নি—এ কথা সত্য; কিন্তু সব ষড়যন্ত্রের শক্তি জনসমর্থনে মাপা যায় না। কিছু ষড়যন্ত্রের শক্তি থাকে তাদের উদ্দেশ্যে, পৃষ্ঠপোষকতায় এবং সময়োচিত ব্যবহারে। ‘বঙ্গভূমি’ যদি এককভাবে ব্যর্থও হয়ে থাকে, তবু এর অস্তিত্বের ধারণাটাই দেখায় যে, বাংলাদেশের অখণ্ডতা নিয়ে বিদেশি মাটিতে বসে চক্রান্ত করার মতো মনস্তত্ত্ব একসময় সক্রিয় ছিল।

এখন আসি চিত্তরঞ্জন সুতারের রাজনৈতিক প্রতীকমূল্যে। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; এক ধরনের প্রবণতার প্রতীকও। সেই প্রবণতা হলো—বাংলাদেশে জন্ম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার; কিন্তু চূড়ান্ত আনুগত্য অন্যত্র স্থাপন। এই প্রবণতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ প্রকাশ্য শত্রুকে মোকাবিলা করা সহজ; কিন্তু অন্তর্ঘাতকারীর মুখোশ খোলা কঠিন। রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর সেসব চরিত্র—যারা ভেতর থেকে রাষ্ট্রের স্নায়ুকে ক্ষয় করে, বিভাজনের বীজ বপন করে এবং বিদেশি স্বার্থকে স্থানীয় রাজনৈতিক জালের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে।

আরো একটি ঐতিহাসিক সত্য মনে রাখা জরুরি—যেকোনো রাষ্ট্রে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না, যদি না সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার মতো লোক থাকে। কাজেই কোনো বিতর্কিত চরিত্রকে মূল্যায়ন করার সময় শুধু বিদেশি ভূমিকা নয়, দেশীয় সহযোগী নেটওয়ার্ককেও দেখতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—বহিরাগত প্রভাব তখনই শক্তিশালী হয়েছে, যখন অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তাদের জন্য পথ পরিষ্কার করেছে। এ কারণেই চিত্তরঞ্জন সুতারকে ঘিরে বিতর্ককে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কৌতূহল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ও রাজনৈতিক সরলতার ইতিহাস এবং বিদেশি প্রভাবের কাছে অভ্যন্তরীণ আত্মসমর্পণের ইতিহাস। তিনি যদি সত্যিই কেবল একজন বিতর্কিত রাজনীতিক হয়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন—কেন তার নাম বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার অধ্যায়ে বারবার ফিরে আসে? আর যদি অভিযোগগুলোর একটি অংশও সত্য হয়, তবে প্রশ্ন আরো ভয়ংকর—কীভাবে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রের এত কাছে পৌঁছালেন?

আজকের নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাস জানাতে হবে—ঘৃণা শেখানোর জন্য নয়, সতর্কতা শেখানোর জন্য। কারণ ইতিহাস ভুলে গেলে ষড়যন্ত্রেরও পুনরাবৃত্তি হয়। সার্বভৌমত্ব কেবল সীমান্ত পাহারা দিয়ে রক্ষা করা যায় না; রক্ষা করতে হয় রাজনৈতিক সততা, ঐতিহাসিক সচেতনতা এবং জাতীয় আনুগত্যের কঠোর মানদণ্ড দিয়ে। যে জাতি তার অন্তর্ঘাতকারীদের চিনতে শেখে না, সে জাতি একসময় তার স্বাধীনতার মূল্যও ভুলতে শুরু করে। চিত্তরঞ্জন সুতারের নাম তাই শুধু অতীতের একটি নাম নয়, এটি একটি সতর্কসংকেত। বাংলাদেশকে যারা ভালোবাসে, তাদের জন্য এই বার্তা পরিষ্কার—রাষ্ট্রের শত্রু সবসময় সীমান্তের ওপারে থাকে না; অনেক সময় সে নিজের পরিচয়ের আড়ালেই থাকে। জাতিকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় তখনই, যখন সে দেরিতে বুঝতে পারে—বিশ্বাসঘাতকতা বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই ঢুকেছিল।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

মার্কিন বাহিনীতে ভর্তির বয়স কেন ৪২ করা হচ্ছে

সফল নেতৃত্বের যোগ্যতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ওয়াজেদ আলী খান পন্নী : জাতীয় মুক্তির সিপাহসালার

লুটপাটের মেগা প্রকল্প যখন জনগণের গলার কাঁটা

ন্যায়ের শাসন না ‘মগের মুল্লুক’

নেতানিয়াহু কোত্থেকে পেলেন গণহত্যার লাইসেন্স

তেলের সংকট থেকে আস্থার সংকট বেশি

জ্বালানি কূটনীতির রোডম্যাপ

উচ্চশিক্ষায় সংস্কার ও শিক্ষক নিয়োগের রাজনীতি

বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ও বেকারত্ব