রাহি একটি ছোট্ট ছেলে, যে ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। রাহির বয়স যখন দুই বছর, তখন তার বাবা-মা লক্ষ করেন যে রাহি অন্য শিশুদের মতো সাড়া দেয় না। নাম ধরে ডাকলে তাকায় না, চোখের সামনে হাত নাড়লেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না এবং একা একা খেলতে পছন্দ করে। রাহির মা-বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো তার স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। রাহি কথা বলতে শুরু করেনি এবং কখনো কখনো অস্বাভাবিক আচরণ, যেমন বারবার হাত নাড়া বা একই কাজ পুনরাবৃত্তি করা।
তিন বছর বয়সে রাহির মা-বাবা তাকে একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর কাছে নিয়ে যান। পরীক্ষার পর জানা যায়, রাহি অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত। এই খবরটি রাহির পরিবারের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তারা প্রথমে হতাশায় ভুগলেও মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শে ঢাকার একটি অটিজম বিশেষায়িত স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই স্কুলটি ছিল জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম’।
রাহিকে স্কুলে ভর্তি করা হয়, যেখানে তার জন্য একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা (Individualized Education Plan—IEP) তৈরি করা হয়। এই পরিকল্পনায় ছিল স্পিচ থেরাপি—রাহির যোগাযোগদক্ষতা উন্নত করার জন্য; অকুপেশনাল থেরাপি—তার সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাধীনতা বাড়ানোর জন্য; আচরণগত থেরাপি (ABA—Applied Behavior Analysis)—তার পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ কমানো এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া উন্নত করার জন্য; এবং গ্রুপ থেরাপি—অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। রাহির মা-বাবাও স্কুলের কাউন্সেলিং কর্মসূচিতে অংশ নেন, যেখানে তারা শেখেন, কীভাবে রাহির সঙ্গে ধৈর্যশীল ও সহায়ক আচরণ করতে হয়। তারা বুঝতে পারেন, রাহির সুপ্ত প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া গেলে সে সমাজে অবদান রাখতে পারবে।
রাহির মতো শিশুদের গল্প প্রমাণ করে যে অটিজম কোনো অভিশাপ নয়। সঠিক যত্ন, শিক্ষা ও সমাজের সমর্থন দিয়ে অটিস্টিক শিশুরা তাদের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারে এবং সমাজে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে আরো সচেতনতা এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি অটিস্টিক শিশু তার জীবনের গল্প নিজেদের মতো করে লিখতে পারে। বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের ফলে অনেক শিশু স্বাভাবিক জীবনযাপনে সক্ষম হয়েছে।
অটিজম একটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা, যা শিশুদের সাধারণত জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এটি সামাজিক যোগাযোগ, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এবং সীমিত আগ্রহের ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
অটিজম একটি স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারÑঅর্থাৎ এর লক্ষণ ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কিছু ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলেও অনেকের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন অটিজমে আক্রান্ত। শহরাঞ্চলে এই হার তুলনামূলক বেশি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার ৪৫০ জন।
অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত করা যায়নি। তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। জিনের ত্রুটি বা মিউটেশন অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রেট সিনড্রোম বা ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোমের মতো জেনেটিক ডিজঅর্ডারের সঙ্গে অটিজম যুক্ত হতে পারে।
গর্ভকালীন ভাইরাল সংক্রমণ (যেমন : জিকা ও রুবেলা), বায়ুদূষণ, বিষাক্ত রাসায়নিক (মার্কারি ও লেড) এবং খাদ্য সংরক্ষণের রাসায়নিক দ্রব্য অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মা-বাবার বেশি বয়স, গর্ভকালীন জটিলতা এবং মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন বা রাসায়নিক কার্যকলাপ অটিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ভ্যাকসিনের সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।
অটিজমের লক্ষণ
অটিজমের লক্ষণ সাধারণত শিশুর ১৮ থেকে ৩৬ মাস বয়সের মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা, চোখে চোখ না রাখা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসুবিধা। একই কাজ বারবার করা এবং নির্দিষ্ট বস্তু বা ক্রিয়াকলাপের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহও এর লক্ষণ। এছাড়া কথা বলতে দেরি, অস্বাভাবিক সুরে কথা বলা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগে অসুবিধা হতে পারে। নির্দিষ্ট শব্দ, আলো, স্পর্শ বা টেক্সচারের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা বা উদাসীনতাও দেখা যায়।
দেশের ৬৪টি জেলা এবং ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি কেন্দ্রে অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে।
সেনানিবাসে ‘প্রয়াস’ নামে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট এ ক্ষেত্রে কাজ করছে।
চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ
অটিজমের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা নেই। তবে বিভিন্ন থেরাপি ও শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের উন্নতি সম্ভব। গ্রামাঞ্চলে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম। অনেক অভিভাবক তাদের শিশুর অটিজম শনাক্ত করতে পারেন না।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমে অটিজমবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক অনুদান প্রদান করে।
নীতিমালা ও আইনি কাঠামো
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ : এই আইনের আওতায় অটিস্টিক ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়। মন্ত্রণালয় এই আইন বাস্তবায়নে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৮ (খসড়া) : অটিস্টিক ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
মায়ের ভূমিকা
অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বিকাশে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়েরা শিশুর আচরণের প্রাথমিক লক্ষণ, যেমন চোখে চোখ না রাখা ও কথা না বলা, শনাক্ত করতে পারেন। মায়েরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে শিশুকে ভাষা, সামাজিকতা ও দৈনন্দিন কাজ শেখাতে পারেন। ধৈর্য, ভালোবাসা ও সহজ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন তার মা। মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কাউন্সেলিং গ্রহণ করা উচিত। মায়েরা সমাজে অটিজম নিয়ে কুসংস্কার দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর মা-ই পারেন তার শিশুটিকে স্বাভাবিক জীবন উপহার দিতে।
বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা ও সেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক কাজ বাকি। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আরো সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রাথমিক শনাক্তকরণ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিশুরা সমাজের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়