হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নারীবাদ কি সর্বজনীন

শাহীদ কামরুল

উপনিবেশ ও উপনিবেশোত্তর নারীবাদ একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক তাত্ত্বিক চর্চা, যা নারীর অভিজ্ঞতাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতি, শ্রেণি ও উপনিবেশবাদের আলোকে বিশ্লেষণ করে। পশ্চিমা নারীবাদ যখন মূলত সাদা মধ্যবিত্ত নারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে উঠছিল, তখন উপনিবেশভুক্ত বিশ্বের নারীরা ভিন্ন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছিলেন, যেখানে জাতি, ঔপনিবেশিক শোষণ, ভাষা, ধর্ম এবং শ্রেণি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। এ প্রেক্ষাপটে উপনিবেশ ও তার উত্তরসূরি উপনিবেশোত্তর চিন্তাধারার ভেতর থেকে একটি বিশেষ ধারার নারীবাদ Postcolonial Feminism উদ্ভূত হয়। এটি শুধু লিঙ্গবৈষম্য নয়; বরং ঔপনিবেশিক শক্তির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনকেও বিশ্লেষণের আওতায় আনে।

নারীবাদ এক বিশ্বব্যাপী চেতনার নাম, যা নারীর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সমতার দাবিকে সামনে এনেছে। তবে এই নারীবাদ যখন উপনিবেশিত অঞ্চলে পৌঁছায়, তখন দেখা দেয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জটিলতা। কারণ, পশ্চিমা নারীবাদ প্রায়ই তৃতীয় বিশ্বের নারীদের এক ধরনের নির্যাতিত, পেছানো ও ‘উদ্ধারযোগ্য’ হিসেবে পরট্রেইট করে। এর ফলে নারীবাদ একটি একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণত হয়, যেখানে তৃতীয় বিশ্বের নারীরা তাদের কণ্ঠস্বর হারায় এবং পশ্চিমা চিন্তাবিদদের চোখ দিয়েই তাদের মূল্যায়ন করা হয়।

যা হোক, ঔপনিবেশিক নারীবাদ বলতে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝায়, যেখানে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো, বিশেষত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, নারীর মুক্তিকে ঔপনিবেশিক শাসনের একটি নৈতিক ও সভ্যতামূলক বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করেছিল। Edward Said-এর Orientalism গ্রন্থে উপস্থাপিত তত্ত্ব অনুযায়ী, পশ্চিমা শক্তিগুলো পূর্বকে বর্বর, অনুন্নত এবং নারী-নিপীড়ক হিসেবে চিত্রিত করে নিজেদের আধিপত্য (hegemony) ও ঔপনিবেশিক শাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ঔপনিবেশিক নারীবাদ এই একই কাঠামোর অংশ, যেখানে মুসলিম বা হিন্দু সমাজের নারীর পর্দা, বাল্যবিয়ে, বা বহুবিয়ে ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা সমাজ নিজেদের ‘উন্নত’ ও ‘উদ্ধারকর্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি দেখান, কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব পূর্বকে বর্বর, নারীসুলভ, অক্ষম ও রহস্যময় হিসেবে উপস্থাপন করেছে। নারীর শরীর, পোশাক, যৌনতা সব কিছু উপনিবেশের এক ধরনের ‘প্রজেক্টেড কামনা’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

উপনিবেশোত্তর নারীবাদ শুধু নারীর ওপর পিতৃতন্ত্রের প্রভাব নয়, বরং জাতি, শ্রেণি, ধর্ম, ভাষা এবং উপনিবেশের ইতিহাস—সব মিলিয়ে নারীর অবস্থান ও অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে। এই ধারার নারীবাদীরা মনে করেন, পশ্চিমা নারীবাদ যেমনভাবে তৃতীয় বিশ্বের নারীদের ‘অসহায়’ রূপে দেখায়, তা প্রকৃত অভিজ্ঞতা নয়। বরং তাদের নিজস্ব বাস্তবতা, ভাষা ও সংস্কৃতির ভেতরেই রয়েছে প্রতিরোধ, ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার সম্ভাবনা। উপনিবেশোত্তর নারীবাদ মূলত তৃতীয় বিশ্বের নারীর অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিকশিত একটি চর্চা। গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ চন্দ্র তালপাড়ে মোহান্তি, যিনি তার Under Western Eyes প্রবন্ধে বলেন, পশ্চিমা নারীবাদ তৃতীয় বিশ্বের নারীদের একটি এক ধরনের সমজাতীয় অভিজ্ঞতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করে, যা বাস্তবতাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। একজন আরব নারী, একজন ভারতীয় গৃহবধূ এবং একজন আফ্রিকান কৃষিজীবী নারীর অভিজ্ঞতা কখনোই এক ধরনের হতে পারে না, বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তা ভিন্ন। মোহান্তি বলেন, তৃতীয় বিশ্বের নারীদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের হয়ে কথা বলা এক ধরনের ‘জ্ঞানগত উপনিবেশবাদ’। তিনি বলেন, পশ্চিমা নারীবাদীরা তৃতীয় বিশ্বের নারীকে একটি একক, নির্যাতিত, অক্ষম চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেন। তৃতীয় বিশ্বের নারীরা শুধু নিপীড়নের শিকার নয়, তারা প্রতিরোধের, কৌশলের এবং সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে নিজেদের পরিচয় নির্মাণ করেন। Leila Ahmed তার ‘Women and Gender in Islam’ বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের সঙ্গে নারীবাদের দ্বন্দ্ব অনেকাংশেই পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির ফল, যা ইসলামের নারীবিষয়ক চর্চাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে।

ভারতীয় ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাবালটার্ন স্টাডিজ স্কুলে উপনিবেশে নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর তালাশ করা হয়। Gayatri Spivak এই তত্ত্বকে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনা করেন তার বিখ্যাত প্রবন্ধ Can the Subaltern Speak?-এ। তিনি বলেন, ‘Subaltern’ বা অধীনস্থ শ্রেণির নারী তার নিজস্ব কণ্ঠে কথা বলতে পারে না, কারণ তার অভিজ্ঞতা ও ভাষা উচ্চ শ্রেণির চিন্তার কাঠামোর বাইরে পড়ে যায়। পশ্চিমা ফেমিনিস্টরা যখন তৃতীয় বিশ্বের নারীর হয়ে কথা বলেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তারা সেই নারীর কণ্ঠস্বর দমন করেন, এমনকি আরো একবার ‘উপনিবেশিত’ করেন। তিনি বলেন, উপনিবেশিত নারীকে শুধু নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করলে, তার নিজস্ব এজেন্সি বা কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের ভাষায় ‘অবলা’ নারীকে বাঁচানোর নামে তাকে নীরব, অসহায় এবং নির্বাক করে ফেলা হয়। Spivak বলেন, ‘The subaltern cannot speak’—কারণ তার কণ্ঠস্বর পশ্চিমা বর্ণনার ফাঁকে হারিয়ে যায়। এটি নারীর পক্ষে কথা বলার একটি জটিল রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে।

লীলা আবু-লুঘোদ। তার ‘Do Muslim Women Need Saving?’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, পশ্চিমা নারীবাদ প্রায়ই মুসলিম নারীদের ‘হিজাব’ বা পর্দা পরাকে অবদমন হিসেবে চিত্রিত করে। কিন্তু এটি মুসলিম নারীদের নিজস্ব পছন্দ, যা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। তিনি আরো বলেন, পশ্চিমা মুক্তির ধারণা সবাইকে একটা স্টেরিওটাইপে ফেলে, যা প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি অসম্মান।

পোস্ট কলোনিয়াল নারীবাদ বিশ্বাস করে নারীর অভিজ্ঞতা শুধু লিঙ্গভিত্তিক নয়, বরং সেখানে জাতি, শ্রেণি, ধর্ম, ভাষা ও ইতিহাসের সন্নিবেশ ঘটে। একজন কৃষক মুসলিম নারী এবং একজন মধ্যবিত্ত হিন্দু শিক্ষিত নারী দুজনেই নারী হলেও তাদের সমাজে অবস্থান ভিন্ন। উপনিবেশোত্তর নারীবাদ এই ভিন্নতাকে মালুম করার কোশেশ করে এবং নারীর কণ্ঠস্বরকে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করতে চায়।

Saba Mahmood-এর Politics of Piety গ্রন্থে তিনি দেখান, কীভাবে মুসলিম নারীরা ধর্মীয় আচার-অনুশীলনের মধ্য দিয়েও ক্ষমতায়িত হতে পারেন। পশ্চিমা নারীবাদ যেখানে ‘পর্দা’ বা ‘ধর্মীয় অনুশাসন’কে নারীর নিপীড়ন বলে চিহ্নিত করে, Mahmood দেখান তা নারীর নৈতিক এজেন্সি হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়।

এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় সাহিত্যে। যেমন : Tsitsi Dangarembga-এর Nervous Conditions উপন্যাসে জিম্বাবুয়ের এক কিশোরী শিক্ষার সুযোগ পেয়ে কীভাবে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে পড়ে, তা দেখানো হয়েছে। Bapsi Sidhwa-এর Ice Candy Man উপন্যাসে ভারত ভাগের সময় নারীদেহ কীভাবে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়, তা উঠে আসে। আবার Chimamanda Ngozi Adichie-এর Purple Hibiscus-এ নাইজেরিয়ার পারিবারিক ও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই তুলে ধরা হয়েছে। আর বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলেন, ক্ষমতা শুধু শাসন নয়, বরং একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো, যা মানুষের শরীর, যৌনতা, ভাষা, আচরণ সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। উপনিবেশে নারীর শরীর হয়ে ওঠে ‘আধিপত্যের ক্ষেত্র’ যেখানে ধর্ম, আইন, শিক্ষা এবং যৌনতা নিয়ন্ত্রণ করে নারীর উপস্থিতিকে। ঔপনিবেশিক শাসন নারীর শরীর, যৌনতা ও ভূমিকা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান তৈরি করে, যা তাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে।

বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, দার্শনিক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ মার্টিনিকান ফ্রানজ ফানোঁ তার গ্রন্থ ‘Black Skin, White Masks’-এ বর্ণবাদ ও ঔপনিবেশিক চিন্তার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেন। তিনি দেখান, কীভাবে উপনিবেশিত মানুষ নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ‘উপনিবেশকারীর মানদণ্ডে’ নিজেকে তৈরি করে। এটি এক ধরনের internalized oppression। নারীরা যখন পশ্চিমা সৌন্দর্য বা মুক্তির ধারণাকেই ‘আদর্শ’ ধরে, তখন তারা নিজের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় হারায়। এদিকে Antonio Gramsci-এর ‘Cultural Hegemony’ ধারণা অনুযায়ী, কলোনিয়াল শক্তি শুধু অস্ত্র নয়, সংস্কৃতির মাধ্যমেও শাসন করে। নারীর আদর্শ রূপ, পোশাক, ভাষা ও আচরণও এই আধিপত্যের অংশ। নারীর প্রতি যে বৈষম্য, তা শুধুই আইন নয়, বরং সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।

বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও ফেমিনিস্ট লেখিকা Simone de Beauvoir-এর বিখ্যাত উক্তি : ‘One is not born, but rather becomes, a woman.’ এই তত্ত্ব দেখায়, নারী হওয়া একটি সামাজিক নির্মাণ, যা উপনিবেশিত সমাজেও প্রচণ্ডভাবে উপস্থিত। Judith Butler-এর Performativity Theory নারীর পরিচয়কে একটি সামাজিক ‘অভিনয়’ হিসেবে দেখায়, যেখানে নারীকে শেখানো হয় কীভাবে নারী হতে হয়। এই অভিনয় উপনিবেশে আরো জটিল হয়, কারণ সেখানে ‘নারীত্ব’ ও ‘পশ্চিমা নারী’ হওয়া আলাদা অভিজ্ঞতা। Homi K. Bhabha-এর ‘Hybridity’ তত্ত্ব Post-colonial feminism-এ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, উপনিবেশিত সমাজে পরিচয় কখনো একরৈখিক নয়, বরং এক ধরনের ‘hybrid’—যেখানে স্থানীয় ও ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির মিশ্রণ হয়। নারীর অবস্থানও সেই ‘দ্বৈত’ বা ‘সংকর’ পরিচয়ের ফাঁদে পড়ে।

এ কথা সত্য, Postcolonial Feminism-এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সময় এই তাত্ত্বিক আলোচনাগুলো অতিরিক্ত একাডেমিক হয়ে পড়ে এবং বাস্তব নারীর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গ্রামীণ, দরিদ্র ও মার্জিনালাইজড নারীদের কণ্ঠ এখনো এই আলোচনায় পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয় না। এছাড়া, কখনো কখনো ‘সংস্কৃতি’ ও ‘ধর্ম’ রক্ষার নামে এন্ড্রুসেন্ট্রিজমের সমালোচনাকে পাশ কাটানো হয়, যা নারীর অধিকার প্রশ্নে খুবই খাতারনাক।

পোস্ট কলোনিয়াল নারীবাদ নিজেও সমালোচনার বাইরে নয়। কিছু সমালোচক মনে করেন, এটি অধিকতর সাংস্কৃতিক রিলেটিভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে নারী নিপীড়নের প্রকৃত বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়। যেমন : ধর্মীয় অনুশাসন, পর্দা বা শরিয়াহ আইনের সমালোচনা করলে তা ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ হিসেবে দেখা হয়, ফলে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া, অনেক সময় লোকাল নারীবাদী আন্দোলন পশ্চিমা দাতাদের তহবিল নির্ভর হয়ে পড়ে, যা একটি ‘NGO feminism’ তৈরি করে। অনেক সময় বলা হয়, এটি বিশ্বব্যাপী নারী সংহতির পথে বাধা দেয়। পশ্চিমা নারীবাদীরা বলেন, এটি প্রায়ই পুরুষদের ‘শত্রু’ হিসেবে না দেখে ‘সাহচর্যকারী’ হিসেবে দেখে নেয়, যা নারীবাদের মূল চেতনার পরিপন্থী। আবার কেউ কেউ বলেন, Post-colonial feminism ‘ইতিহাসের আড়ালে গিয়ে সাংস্কৃতিক আত্মরতির এক রূপ’ হয়ে উঠেছে। তবে অধিকাংশ চিন্তাবিদই একমত এটি নারীর প্রকৃত মুক্তির এক অনিবার্য পথ।

পরিশেষে বলা যায়, উপনিবেশোত্তর নারীবাদ নারীর কণ্ঠস্বরকে শুধু পুনরুদ্ধার করে না, বরং তাকে একটি নতুন ভাষা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন দৃষ্টিকোণ দেয়, যা একাধারে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অস্তিত্বমূলক। উপনিবেশ ও উপনিবেশোত্তর নারীবাদ আমাদের দেখায় নারীর অভিজ্ঞতা কখনোই সর্বজনীন নয়। নারীকে বোঝার জন্য শুধু লিঙ্গ নয়; তার ভৌগোলিক অবস্থান, জাতি, ধর্ম, শ্রেণি, ভাষা ও সংস্কৃতি—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। Post-colonial feminism মূলধারার নারীবাদের সংকীর্ণতা ও ঔপনিবেশিক আধিপত্যের দ্বৈত সমালোচনা করে নারীকে ফিরিয়ে আনে তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর, অভিজ্ঞতা ও প্রতিরোধের ময়দানে। এ ধরনের নারীবাদ শুধু পুরোনো কাঠামোর ভাঙন নয়, বরং ভবিষ্যতের এক বিকল্প নারীত্ব ও স্বাধীনতার দিশা। উপনিবেশ ও উপনিবেশোত্তর নারীবাদ একটি জটিল, বহুবাচনিক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এটি শুধু নারী বনাম পুরুষ দ্বন্দ্ব নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ইতিহাস, জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসন, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে নারী কণ্ঠস্বরের সংগ্রাম। নারীবাদ সর্বজনীন নয়, বরং স্থানিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিকভাবে নির্মিত। তাই একটি বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থানিক ও উপনিবেশোত্তর দৃষ্টিভঙ্গির নারীবাদ ছাড়া, তৃতীয় বিশ্বের নারীদের কণ্ঠস্বর সর্বদা পর্দার আড়ালে থেকে যাবে। উপনিবেশোত্তর নারীবাদ শুধু নারীর অধিকারের কথা বলে না, বরং নারীর পরিচয় ও অভিজ্ঞতাকে একটি বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার প্রয়াস। এটি আমাদের শেখায় নারীর সমস্যা এবং সংগ্রাম এক জায়গার মতো নয়। প্রতিটি নারীর নিজস্ব বাস্তবতা আছে এবং সেই বাস্তবতা বুঝে নারীবাদকে এগিয়ে নিতে হয়। উপনিবেশোত্তর নারীবাদ নারীবাদের ‘এক ভাষা’ ভেঙে দিয়ে বহুবাচনিকতা ও বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

sahidkamrul25@gmail.com

রামিসার পরিণতি রাষ্ট্রের লজ্জা

বিদ্যুতের জন্য আর কত মূল্য দিতে হবে

এআই আইনের প্রয়োজনীয়তা

আমাদের মিডিয়ার শ্রেণিবিন্যাস

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ : নৈতিক বিপর্যয় ও আত্মজিজ্ঞাসা

হাদি হত্যা ও সাংস্কৃতিক লড়াই

গতানুগতিক বাজেট ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

ছাদেই লুকিয়ে আছে আগামীর বিদ্যুৎ

নেতানিয়াহু কেন ট্রাম্পের ইরান চুক্তি বানচাল করতে চান

ইতিহাসের কাঠগড়ায় গণহত্যাকারী শক্তি