দরজা খুলে সন্তানের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকেন মা। কারখানায় কর্মরত একজন শ্রমিক মাস শেষে বেতন পেয়ে সন্তানের স্কুলের খরচ দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ছোট দোকানের মালিক দিনের উপার্জন দিয়ে সংসার চালান। একজন উদ্যোক্তা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে গড়ে তোলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার ওপর নির্ভর করে বহু পরিবারের জীবিকা। একটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, গ্যাসের অসতর্ক ব্যবহার কিংবা সামান্য অবহেলা মুহূর্তেই এসব মানুষের জীবন ও স্বপ্নকে বিপন্ন করে দিতে পারে।
আগুনে শুধু ঘর, দোকান বা কারখানা পোড়ে না; হারিয়ে যেতে পারে পরিবারের আশ্রয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘদিনের সাধনায় গড়ে ওঠা জীবিকার অবলম্বন। কোনো ভবনে মানুষ আটকে পড়লে বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে অসহনীয় উৎকণ্ঠার। আগুন একসময় নিভে যায়, কিন্তু হারানো প্রাণ ফিরে আসে না। স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা সর্বস্ব হারানোর অসহায়ত্বও সহজে দূর হয় না।
বাংলাদেশের মতো শ্রম, উদ্যোগ ও সীমিত সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলা দেশে প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি জীবিকা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মূল্য অপরিসীম। সেই অর্জন রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত মানবিক, সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব।
প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে একটি পরিবার
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে—প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৪টি। এসব ঘটনায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ২৬৭ জন। আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ২৬৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অগ্নিদুর্যোগের ব্যাপকতা এবং তা মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ অবদান তুলে ধরে।
একই বছরের তথ্যে দেখা যায়, বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে ঘটেছে ৯ হাজার ৩৯২টি অগ্নিকাণ্ড, যা মোট ঘটনার প্রায় ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৭০৫টি। পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন ও স্থাপনার মধ্যে ৬২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩ হাজার ৩১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অর্থাৎ, পরিদর্শিত স্থাপনাগুলোর প্রায় ৩৭ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এই হিসাব দেশের সব ভবনের প্রতিনিধিত্ব না করলেও নিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়।
প্রতিটি মৃত্যুর সংখ্যা একটি শোকাহত পরিবারের কথা বলে। প্রতিটি আহত মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে চিকিৎসার ব্যয়, কর্মক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম এবং স্বজনদের উদ্বেগ। ক্ষতিগ্রস্ত একটি দোকান হতে পারে একটি পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। একটি কারখানা বন্ধ হলে বহু শ্রমিকের সংসারে অনিশ্চয়তা নেমে আসে। তাই অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মানুষের এই দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগও বিবেচনায় নিতে হবে।
আগুন লাগার আগেই দায়িত্ব নিতে হবে
অগ্নিকাণ্ডের পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, আগুন নিয়ন্ত্রণ করা এবং আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও সংশোধন করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কত দ্রুত আগুন নেভানো গেল, তার পাশাপাশি কতটি বিপর্যয় প্রতিরোধ করা সম্ভব হলো, সেটিও অগ্নিনিরাপত্তার সাফল্যের মানদণ্ড হওয়া উচিত।
বৈদ্যুতিক তার ও সংযোগ পরীক্ষা, গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার, দাহ্য পদার্থের সঠিক সংরক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল রাখা এবং জরুরি বহির্গমনপথ বাধামুক্ত রাখার মতো পদক্ষেপ বহু দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে পারে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা জরুরি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করাও সমান জরুরি।
বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। বহুতল ভবন, শিল্পকারখানা, বিপণিবিতান ও ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ বাড়ছে। এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে নিরাপত্তার প্রস্তুতিকেও এগিয়ে নিতে হবে। ভবনের সৌন্দর্য, ব্যবসার আকার এবং উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে, সেখানে থাকা মানুষ বিপদের সময় নিরাপদে বের হতে পারবেন কি না।
নিরাপত্তায় বিনিয়োগ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা
ভবনমালিক, উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের অগ্নিনিরাপত্তার জন্য পরিকল্পিত অর্থ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাজেটে উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, সতর্কসংকেত, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে। সরঞ্জাম কেনার পর সেগুলো সচল রাখা, নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং ব্যবহারের দক্ষতা নিশ্চিত করতেও অর্থ ও তদারকি প্রয়োজন। বিপর্যয়ের পর ব্যবসা পুনর্গঠন এবং মানুষের জীবনে নেমে আসা অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করলে এই বিনিয়োগের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
ছোট ব্যবসা ও সীমিত আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মতভাবে ধাপে ধাপে ঝুঁকি কমানো জরুরি। অনেক কাজের জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ মেরামত, সিঁড়ি ও বহির্গমনপথ পরিষ্কার রাখা এবং জরুরি পরিকল্পনা সবাইকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রশিক্ষণ ও সহজ নির্দেশনার মাধ্যমে তাদের সহায়তা করতে পারে।
পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের ঘর থেকে
প্রত্যেক নাগরিক নিজের ঘরের নিরাপত্তা পর্যালোচনা করুন। বৈদ্যুতিক তার ও সুইচের অবস্থা কেমন? একই সংযোগে একাধিক উচ্চক্ষমতার যন্ত্র চলছে কি? গ্যাসের চুলা, পাইপ ও সংযোগ পরীক্ষা করা হচ্ছে কি? সিঁড়ি, করিডোর, ছাদে যাওয়ার পথ কিংবা জরুরি বহির্গমনপথে মালামাল জমে আছে কি?
আবাসিক ভবন, দোকান ও কর্মস্থলে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকারিতা এবং ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিবারের সবাইকে নিরাপদে বের হওয়ার পথ ও বাইরে সমবেত হওয়ার স্থান জানাতে হবে। শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার ব্যবস্থা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। বিপদের মুহূর্তে এই প্রস্তুতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
শ্রমিকের নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করুন
একজন শ্রমিক কারো মা, বাবা, সন্তান কিংবা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। কাজ শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব। কারখানা ও গুদামে জরুরি বহির্গমনপথ বাধামুক্ত রাখতে হবে এবং কর্মীরা উপস্থিত থাকা অবস্থায় এসব পথ যেন সহজে খোলা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা, দাহ্য ও রাসায়নিক পদার্থ পৃথকভাবে ও নিরাপদে সংরক্ষণ এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও বাস্তবসম্মত মহড়ায় অংশ নিতে হবে, যাতে তারা জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বেরিয়ে আসার পদ্ধতি জানেন। মহড়ায় ধরা পড়া ঘাটতিগুলোও সংশোধন করতে হবে। এমন কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে কর্মীরা নির্ভয়ে নিরাপত্তার ত্রুটির কথা জানাতে পারেন এবং কর্তৃপক্ষ তাদের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। প্রতিদিন কর্মস্থলে থাকা মানুষের পর্যবেক্ষণ ঝুঁকি শনাক্তে মূল্যবান সহায়তা দিতে পারে।
নিয়মের বাস্তব প্রয়োগে প্রতিষ্ঠিত হোক আস্থা
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০-সহ প্রযোজ্য আইন, অগ্নিনিরাপত্তাবিধি এবং ভবন নিরাপত্তার শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অনুমোদন বা সনদ সংগ্রহের পাশাপাশি বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর রাখাও অপরিহার্য।
রাসায়নিক গুদাম, হাসপাতাল, পোশাক কারখানা, বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বহুতল ভবনে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যকর করা জরুরি। ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সময় অগ্নিনিরাপত্তা বিবেচনা এবং ব্যবহারের পর নিয়মিত তদারকি—দুটিই প্রয়োজন। ভবনের ব্যবহার, বৈদ্যুতিক লোড কিংবা অভ্যন্তরীণ বিন্যাস বদলালে নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মাণের সময় নিরাপদ থাকা ভবনও পরে অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
উচ্চঝুঁকির স্থাপনাগুলোর হালনাগাদ ডিজিটাল তালিকা এবং নির্ধারিত পরিদর্শনসূচি থাকা প্রয়োজন। ত্রুটি সংশোধনের জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা দিতে হবে এবং পরবর্তী যাচাইয়ে নির্ধারিত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষ উদ্ধারব্যবস্থা ও উদ্ধারকারীর সুরক্ষা
প্রতিরোধের পাশাপাশি দ্রুত ও দক্ষ উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। ফায়ার সার্ভিসের ২০২৬ সালের ২ মার্চ হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালু ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ছিল ৫৩৮টি। এই সেবাকে কার্যকর করতে প্রতিটি স্টেশনে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল, সচল যানবাহন, উপযুক্ত সরঞ্জাম এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ ঘনবসতিপূর্ণ নগর ও শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী বহুতল ভবনে পৌঁছাতে সক্ষম অগ্নিনির্বাপণ যান, আধুনিক পাম্প, তাপীয় ক্যামেরা, শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং ভবনধস মোকাবিলার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে। রাসায়নিক দুর্ঘটনা মোকাবিলায় বিশেষায়িত ইউনিট, নদী ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ-উদ্ধার সক্ষমতা এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে প্রশিক্ষিত অনুসন্ধান ও উদ্ধার দলের প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।
উদ্ধারকাজে নাগরিকদের সহযোগিতা জরুরি
অগ্নিকাণ্ডের সময় নাগরিকদের সহযোগিতা উদ্ধারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্ধারযানের চলাচলের পথ খোলা রাখুন, ঘটনাস্থলে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলুন এবং উদ্ধারকারীদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। জরুরি অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারসেবার জন্য দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিন এবং ঘটনার সঠিক অবস্থান ও প্রয়োজনীয় তথ্য জানান।
পরিবার, ভবনমালিক, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রম করে ঘর গড়েন, সন্তানকে শিক্ষিত করেন এবং প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। তাদের প্রত্যাশা খুব সাধারণ—সন্তান ঘরে ফিরবে, শ্রমিক কাজ শেষে পরিবারের কাছে পৌঁছাবেন এবং ব্যবসায়ী দোকান খুলে জীবিকা অর্জন করবেন।
এই প্রত্যাশা পূরণে আগুন লাগার আগেই আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে। এমন এক বাংলাদেশ আমাদের গড়ে তুলতে হবে, যেখানে উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তাও এগিয়ে চলে—যেন আগুনে কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ, কোনো শ্রমিকের জীবিকা কিংবা বাংলাদেশের স্বপ্ন পুড়ে না যায়।
লেখক : মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর