হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতের লড়াই

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

অক্টোবরের শুরুর দিকে ভারতের মন্ত্রিসভা নরেন্দ্র মোদির ২৫ বছরের শাসনকালের প্রশংসা করল। তারা বলল, মোদি নাকি দেশের সাধারণ মানুষের জীবন পুরো বদলে দিয়েছেন। এক মাসজুড়ে নানা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল; কিন্তু কাজটা ঠিকঠাক এগোলো না।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে হঠাৎ ভারতজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে এই আন্দোলন মোদিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিল। তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকারী, ছাত্র আর বিরোধী দলগুলো মোদি ও তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলল। তারা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার আর চাকরির দাবি জানিয়ে রাস্তায় নেমে এলো।

মোদি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, এখন কী করা উচিত। গত জুলাই মাসে তিনি শিক্ষামন্ত্রী বদলে ফেলেছিলেন। এখন তিনি শক্ত হাতে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করছেন। দিল্লিতে সরকার মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল, ট্রেন চলাচল বাতিল করল, আর রাস্তাঘাট আটকে দিল। পুলিশ হাজার হাজার মানুষকে পেটাল, অনেককে আটকে রাখল। সেই হিংস্রতার দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা পৃথিবী দেখে ফেলল।

বয়স্ক ভোটারদের কাছে মোদির প্রভাব এখনো আছে। তার চিন্তাভাবনা কম শক্তিশালী নয়। তবে বিরোধী দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি বেশ দুর্বল। তা সত্ত্বেও রাজপথের এই অশান্তি মোদির জন্য এক বড় ধাক্কা। এতে স্পষ্ট হয়ে গেল, তার অর্থনৈতিক ভাবনা আজকের তরুণদের কাছে একদম কাজ করছে না। জোরজবরদস্তি করে তিনি যে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন, তাতে ক্ষোভ প্রকাশের আর কোনো পথ খোলা নেই। ২৫ বছর ধরে তিনি কী করলেন, তা খতিয়ে দেখার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।

২০০১ সালের জানুয়ারি মাসের কথা। গুজরাটে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেলেন। ওই কঠিন সময়ে বিপদে পড়া গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে মোদিকে সামনে আনা হলো। ৫১ বছর বয়সি এই সাধারণ পার্টি কর্মীর আগে কোনো প্রশাসনিক পদের অভিজ্ঞতা ছিল না।

পরের বছরই গুজরাটে শুরু হলো ধর্মীয় দাঙ্গা। এক ট্রেনে আগুনে কিছু হিন্দু তীর্থযাত্রী মারা যাওয়ার পর শুরু হলো মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা। তাতে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারালেন। মোদি এই ঘটনার জন্য কখনো ক্ষমা চাননি। উল্টো নির্বাচনে মানুষের ভেদাভেদকে কাজে লাগিয়ে বিপুল ভোটে জিতে এলেন। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। পরপর পাঁচটি নির্বাচনে জিতলেন তিনি, যার মধ্যে দুটো গুজরাটে আর তিনটি দেশের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে।

আরএসএসের কর্মী হিসেবে কাজ করার সময় মোদি রাজনীতির নানা কলাকৌশল শিখেছিলেন। সাধারণ ভারতের মানুষের ভয় আর আশা তিনি খুব কাছ থেকে বুঝেছিলেন। হিন্দুদের মনে জমা হওয়া ক্ষোভকে তিনি খুব চমৎকারভাবে কাজে লাগালেন।

গুজরাটে মোদি হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে ব্যবসার সুবিধা মিলিয়ে এক নতুন রাজনীতি শুরু করলেন। ব্যবসায়ীদের কর ছাড় দিলেন, জমি দিলেন। আবার একই সঙ্গে আদালত আর পুলিশের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রাখলেন। নিজের একটা সৎ আর নিঃস্বার্থ রাজনীতিবিদের ইমেজ তৈরি করলেন।

প্রধানমন্ত্রী হয়ে মোদি তার সেই পুরোনো ছক দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিলেন। সব ক্ষমতা গিয়ে জমা হলো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাতে। সব মন্ত্রী আর বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা কেবল ওপরের নির্দেশ মেনে চলতে লাগলেন।

ভারতের ইতিহাসে কেবল জওহরলাল নেহরু আর ইন্দিরা গান্ধীর হাতে এমন একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল। মোদি তাদের উল্টো পথে হেঁটে নিজের জায়গা তৈরি করলেন। হিন্দুত্ববাদ, সরকারি অনুদান আর বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধার ওপর ভর করে তিনি কংগ্রেসকে দুর্বল করে দিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর মতোই তিনিও নিজের একটা আলাদা পরিচিতি গড়ে তুললেন আর দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনলেন।

গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বড় জায়গা করে নিল। এখন ভারতের ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাস করে। এত কিছুর পরও মোদিকে প্রবল ক্ষোভের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিজেপি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জায়গা শাসন করছে সত্যি, তবে মানুষের বিরক্তিও দিন দিন বাড়ছে।

মোদির কাজের মূল্যায়ন করতে হলে তিনটি জায়গায় চোখ রাখতে হবে—দেশের অর্থনীতি, সমাজ আর গণতন্ত্র।

অর্থনীতির দিক থেকে মোদি ছিলেন ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এক আধুনিকতার রূপকার। তিনি সারা দেশে ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবস্থা, অনলাইনে টাকা লেনদেন আর জিএসটি চালু করলেন। দেশের মহাসড়কগুলোর দৈর্ঘ্য ৬০ শতাংশ বাড়ালেন, আর গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিলেন। বিনা খরচে খাদ্যশস্য আর সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর মতো সরকারি সুবিধাগুলো গরিব মানুষের মনে তার বড় ভিত্তি তৈরি করে দিল।

মোদি বড় বড় ব্যবসায়ীর পাশে দাঁড়ানোর নীতি পছন্দ করতেন। গৌতম আদানির মতো শিল্পপতিদের সঙ্গে তার বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠল। দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার বার্ষিক ছয় শতাংশে গিয়ে পৌঁছাল। জিনিসপত্রের দামও নিয়ন্ত্রণে ছিল।

কিন্তু এই লাভের বড় অংশ চলে গেল উঁচুতলার মানুষদের কাছে। ২০১৪ সালে আদানির সম্পদ ছিল সাত বিলিয়ন ডলার, যা বাড়তে বাড়তে ১০০ বিলিয়ন ডলার পেরিয়ে গেল। অথচ গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের আয় বাড়ল বছরে মাত্র এক শতাংশ। আর ২০১৭ সালের পর থেকে মাইনে পাওয়া কর্মচারীদের আসল আয় কমে গেল প্রায় পাঁচ শতাংশ।

বিক্ষোভের মুখে পড়ে মোদিকে কৃষি ও জমি-সংক্রান্ত আইন পিছিয়ে নিতে হয়েছিল। দেশে নতুন কলকারখানা থেকে তেমন স্থায়ী চাকরি তৈরি হলো না। এখনো দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সেই কৃষির ওপরই ভরসা করে আছেন। উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা বাড়লেও ভালো চাকরির অভাব থেকে গেল, যা দেশের যুবসমাজকে হতাশ করে তুলল। ক্ষমতা প্রয়োগে মোদি সফল হলেও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হলেন।

সামাজিক দিক থেকে ভারত আরো বেশি উগ্র জাতীয়তাবাদী আর হিন্দুত্বকেন্দ্রিক হয়ে উঠল। দেশের ২০ কোটি মুসলিমের জীবন দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়াল। মোদি ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে মিলিয়ে দিলেন, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ অযোধ্যার রাম মন্দির উদ্বোধন। বিজেপি নাগরিকত্ব আর পারিবারিক আইনেও নানা পরিবর্তন নিয়ে এলো।

বিরোধী দলগুলো এর জবাবে কিছুটা নরম ধর্মীয় রাজনীতি শুরু করল। তবে তরুণদের আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ককপিট জনতা পার্টি (সিজেপি) সবসময় ধর্মীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে।

মোদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কথা বলাকে প্রশ্রয় দিলেন। বড় দাঙ্গা কিছুটা কমলেও কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে ঘিরে দল বেঁধে হামলার ঘটনা বহুগুণ বেড়ে গেল।

চাকরির অভাব নিয়ে তরুণ ভোটারদের এই রাগ ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে বড় ধাক্কা দিল। তারা একা সরকার গঠন করতে না পেরে জোট বাঁধতে বাধ্য হলো। ভারতে ৩০ বছরের কম বয়সি ভোটারদের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ, আর তারা ধীরে ধীরে মোদির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি

মোদির শাসন যেভাবে দেশের গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আন্দোলনকারীরা এখন তার ওপর নজর দিচ্ছে। তাদের দাবি, এসআইআর (বিশেষ ভোটার সংশোধন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোদি নির্বাচনে কারচুপি করেছেন। ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে এই ঘটনাকে ইন্দিরা গান্ধীর আমলের সেই জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

যারা সরকারের পক্ষে বলেন, তাদের যুক্তি হলো ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কাজটা অনেক দিন আটকে ছিল। আর যেসব নাম বাদ গেছে, তার বেশিরভাগই ভুল নথি ছিল। কিন্তু বাস্তব কথা হলো, এই কাজটা করা হয়েছে বড্ড তাড়াহুড়ো করে, এক কেন্দ্র থেকে এবং অত্যন্ত অস্পষ্টভাবে। লাখ লাখ আসল ভোটার লড়াই করার কোনো সুযোগ না পেয়ে নিজেদের ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেছেন।

সমালোচকরা সরাসরি মোদিকে একনায়ক বলতে ছাড়ছেন না। তবে এসআইআরের কারণে নির্বাচনের ফলাফলে খুব বড় কোনো হেরফের হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। বিরোধীরাও মানুষের সামনে মোদির চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প দাঁড় করাতে পারেনি। তবুও মোদি সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন নিষ্ঠুরভাবে। তিনি আদালতের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন, সংবাদমাধ্যমকে চাপে রেখেছেন আর রাজনৈতিক শত্রুদের বিরুদ্ধে আইনি মামলা দায়ের করে হেনস্তা করেছেন। লড়াই না করে তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।

দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সততা এবং বর্তমান বাস্তবতা

আর কত খেসারত দেবে শিক্ষার্থীরা

উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার নির্মম বাস্তবতা

অনিশ্চিত সময়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে সবাই ডুববেন

সাধারণে বিপর্যয়, অসাধারণে অর্জন

অরুণাচলে ভারতের পরাজয়ের শঙ্কা

আওয়ামী লীগ পুনর্মিলনের আলোচনার আড়ালে

ক্ষমতার পালাবদল ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা

ঋণের জালে অর্থনীতি

হামের টিকা নিয়ে উদ্বেগ: শিশুদের জন্য মানসম্মত টিকা নিশ্চিত করুণ