বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাইনবোর্ডসর্বস্ব ছোট দলের বড় নেতারা যখন ক্ষমতার অংশীদার হয়ে ওঠেন, তখন তাদের অপরিণামদর্শী ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে নানা সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। মেকিয়াভেলি তার দ্য প্রিন্স গ্রন্থে ভাগ্যগুণে ক্ষমতায় উঠে আসা এই রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে বলেছেন, যারা হঠাৎ করে, অন্যের সহায়তায় কিংবা ভাগ্যের জোরে (Fortuna) ক্ষমতায় আসেন, তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার ভিত দুর্বল থাকে। দুর্বল ভিত ঢাকতে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী হিসেবে জাহির করতে তারা অতিরিক্ত কঠোর ও অহংকারী আচরণ করতে বাধ্য হন। শেখ হাসিনার শাসনামলে আমরা এ রকম দুজন রাজনীতিবিদ দেখেছিলাম। তাদের একজন ছিলেন জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং অন্যজন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।
শেখ হাসিনা তার দেড় দশকের শাসনামলে হাসানুল হক ইনুকে প্রধানত বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার চরিত্র হননের কাজে ব্যবহার করেছেন। তিনি খালেদা জিয়াকে প্রতিদিন অগ্নিসন্ত্রাসী ও এতিমের টাকা চুরির অপবাদ দিতেন। এমনকি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে চরম বিদ্বেষমূলক মন্তব্যও করতেন। রাশেদ খান মেনন তুলনামূলকভাবে ব্যক্তি চরিত্র হননের মতো আক্রমণাত্মক কথা কম ব্যবহার করলেও বিএনপিকে মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষক একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে চিত্রিত করতেন। বনেদি রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই বামপন্থি রাজনীতিক মতিঝিল এলাকায় সংসদ সদস্য হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থী ভর্তিতে দুর্নীতির বহু অভিযোগ ওঠে। তার এসব দুর্নীতির ঘটনা ছিল ওপেন সিক্রেট। তবে এই দুই নেতার মূল কাজ ছিল বিরোধী দলকে প্রতিদিন নোংরা ভাষায় আক্রমণ করা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর আশা করা হয়েছিল, দেশের রাজনীতিতে কিছু গুণগত পরিবর্তন আসবে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও আমরা দেখলাম, ছোট দলের কয়েকজন ‘বড় নেতা’ মন্ত্রী হয়েছেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচিত না হয়েও রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। মেকিয়াভেলির তত্ত্ব অনুযায়ী, তাদের আচরণে যথেষ্ট অহংকারী ও আক্রমণাত্মক মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।
সম্প্রতি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর একটি টেলিভিশন টকশোতে প্রশ্ন করেছেন, ‘হু ইজ হাদি?’ বাংলাদেশের মানুষের কাছে শরীফ ওসমান হাদি আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের একজন আইকন হিসেবে পরিচিত। তার হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা প্রমাণ করে, হাদির বক্তব্য, স্লোগান ও প্রচার-প্রচারণা এ দেশের মানুষের মনের কথা হয়ে উঠেছিল। এই সাক্ষাৎকারে নুরুল হক নুর ইঙ্গিত দিয়েছেন, হাদিকে পরিকল্পিতভাবে একজন বিপ্লবী বানানো হয়েছে। না, হাদি তার রক্তের বিনিময়ে বিপ্লবীর মর্যাদা পেয়েছেন। তার কবর কেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে দেওয়া হলো, তা নিয়েও কথা বলেছেন নুরুল হক নুর।
‘হু ইজ হাদি’ বা ‘হাদি কে’—এই প্রশ্ন করার আগে নুরুল হক নুরের উচিত ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জানতে চাওয়া, ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে কেন তিনি তার বাবা ও মায়ের কবর জিয়ারতের পর হাদির কবর জিয়ারত করেছিলেন।
‘হাদি কে’—এর জবাব দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নরেন্দ্র মোদির দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বলেছিলেন, কাকে দিয়ে বাংলাদেশের তরুণ এক নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল, তা তিনি জানেন। ভারতের জাতীয় স্বার্থে তিনি তা প্রকাশ করবেন না। হাদি ছিলেন সেই ব্যক্তি, যাকে ভারত হত্যা করেছিল—এমন দাবি করেছিলেন ভারতের একজন রাজনৈতিক নেতা।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সরকার বারবার হাদির খুনিদের ফেরত চাওয়ার বিষয়টিকে অনেকটা শর্ত হিসেবে যুক্ত করছে কেন, এর গুরুত্ব কি নুর বোঝেন? ‘হাদি কে’—এই প্রশ্নের জবাব হত্যাকাণ্ডের পর সংসদ ভবনের সামনে জানাজায় উপস্থিত লাখ লাখ মানুষের কাছে জানতে চাইতে হবে।
আজ হাদির কবর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নুরুল হক নুর। কিন্তু হাদির হত্যাকাণ্ডের পর যখন তার কবর কোথায় হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তখন নুর কেন এই প্রশ্ন তোলেননি? কিংবা যে রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছেন, সেই বিএনপি কেন এ নিয়ে কথা বলেনি? নুর হয়তো ভুলে গেছেন, বিএনপির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন এবং আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিমানবন্দরে হাদির লাশ গ্রহণ করেছিলেন।
স্বাভাবিকভাবে এখন এ প্রশ্ন আসবে হু ইজ নূর? নুরুল হক নুর ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলন ছিল নিছকই কোটা সংস্কার আন্দোলন, যার সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বড় কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই আন্দোলনের কারণে তিনি ছাত্রলীগের নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি শিক্ষার্থীদের সহমর্মিতা পেয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুমে নির্যাতনের কারণে ক্ষুব্ধ ছিলেন। ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে নুর প্রার্থী হওয়ার পর নির্যাতনের শিকার নুর ও তার ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেলকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। কারা নুরকে ভোট দিয়েছিলেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ যেসব সংগঠন সে সময় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, তাদের সমর্থকরা সবাই নুরকে ভোট দিয়েছিলেন। নুরের রাজনীতির মূলধন শুধু কোটা সংস্কার আন্দোলন নয়, ডাকসুর ভিপি হওয়াও। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ডাকসুর ভিপি হওয়া পর্যন্ত নুরের এই ত্যাগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। হাসিনাবিরোধী জনমত গঠনে এই সংগ্রামেরও ভূমিকা ছিল।
কিন্তু ডাকসুর ভিপি হওয়ার পর নুরের রাজনৈতিক চরিত্র প্রকাশ পেতে থাকে। ভিপি হিসেবে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তিনি শুধু ছাত্রলীগের কর্মী নন, হল কমিটির একজন পোস্টেড নেতা ছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন, হাসিনাকে দেখলে তার মায়ের মুখ ভেসে ওঠে। নুর ভিপি হওয়ার অনেক আগে থেকেই গুম, খুন ও নিপীড়নের জন্য হাসিনা ঘৃণিত ও নিন্দিত ছিলেন। কিন্তু নুরের চোখে খুনি হাসিনার চেহারা ভেসে ওঠেনি, এর মধ্যে তিনি স্নেহময়ী কোমল এক মায়ের মুখ দেখেছেন! এই উপমা দিয়ে নুর তার মাকেও অপমান করেছেন। হাসিনার এই মাতৃক্রোড়ে আশ্রয় নেয়ার মধ্যদিয়ে নুর ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে তার নেতৃত্বের পরিসমাপ্তি টেনে ছিলেন।
নুরুল হক নুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের মুহসিন হল শাখার উপ-মানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। স্কুলজীবনে তিনি ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, গ্রামের হাজারো দরিদ্র শিক্ষার্থীর মতো নুরও একজন চাকরিপ্রত্যাশী ছিলেন। কোটার কারণে চাকরি থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা ও ক্ষোভ থেকে তিনি এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সেই আন্দোলনে তিনি নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, এটি যেমন সত্য, তেমনি তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির আদর্শ ধারণ করতেন। ইতোমধ্যে তিনি মুজিববন্দনার রাজনীতি শুরু করেছেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির যে চেতনা তার মধ্যে রয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে তিনি হাসিনাবন্দনায় ফিরে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আজকে নুরের পরিচয় কী? একজন এমপি-প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছোট দলের এমন বহু নেতা মন্ত্রী ও এমপি হয়েছেন। ইতিহাসে তাদের নাম কখনো উচ্চারিতও হয় না। কিন্তু ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই যতদিন চলবে, হাদির নাম উচ্চারিত হবে। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে হাদির জানাজার কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে। হাদিকে আজ নুর চিনতে পারছেন না কিন্তু জাতীয় পার্টির বিজয় নগরে অফিসের সামনে নুর যখন সেনাবাহিনী ও পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, হাদি তার প্রতিবাদ করেছিলেন। এটাই হাদির পরিচয়। নুর ভারতের মিত্র ইসরাইলের একজন রাজনীতিবিদের সঙ্গে বিদেশে গিয়ে বৈঠক করেছিলেন। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু কেন তিনি এই বৈঠক করেছিলেন, সেই ব্যাখ্যা তিনি আজও দেননি।
ছোট রাজনৈতিক দলের নেতারা যখন ক্ষমতার অংশীদার হয়ে ওঠেন, তখন তাদের মধ্যে নানা ধরনের বিকার দেখা যায়। ইতোমধ্যে নুরুল হক নুর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে এমন বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অসদুপায় অবলম্বন করার কারণে নিজের পছন্দের চাকরিপ্রার্থীকে গ্রেপ্তার করায় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি করছেন। তার দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মতিঝিলে আওয়ামী লীগ পরিচালিত বাংলার বাণীর সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে। অথচ এই সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এ দেশের মানুষ আশা করেছিল, দেশের রাজনীতিতে কিছু গুণগত পরিবর্তন আসবে। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু দেশ আবার পুরোনো ধারার রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও এখন ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধী দল ও ভিন্নমতের ব্যক্তিদের চরিত্র হননের জন্য খুচরা নেতাদের ভাড়া করতে হচ্ছে। হাসিনাও এমন কৌশল নিয়েছিলেন, কিন্তু সেসব কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। নুরুল হক নুরদের উচিত পরগাছার রাজনীতি না করে আত্মমর্যাদার সঙ্গে নিজেদের রাজনীতি দাঁড় করানো। সরকারের উচিত রাজনীতিতে নতুন ইনু-মেনন যুগের অবসান ঘটানো। ক্ষমতাসীন দল যদি খুদ-কুঁড়োর বিনিময়ে বিতর্ক সৃষ্টির রাজনীতিকে কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে, তাতে দলের ভাবমূর্তি বাড়বে না; বরং জনআস্থায় ফাটল ধরবে।
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ
alfaz@dailyamardesh.com