আছিয়া থেকে রামিসা
মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আছিয়ার পর আবার আট বছর বয়সি ফুলের মতো ফুটফুটে রামিসাকে পাশবিক নির্যাতনে জীবন দিতে হলো। সোহেল রানার মতো একজন ইয়াবাসেবী তার স্ত্রীর সহযোগিতায় মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করল। জবানবন্দিতে ঘাতক এ কথা জানিয়েছে।
২০২৫ সালের ৬ মার্চ মাগুরা সদর উপজেলায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে বোনের শ্বশুর হিটু শেখ সাত বছরের আছিয়াকে যৌন নির্যাতন করে হত্যার চেষ্টা করে এবং এ ঘটনা জেনেও বাবাকে সহায়তা করে বোনের স্বামী ও শাশুড়ি। মুমূর্ষু অবস্থায় আছিয়াকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখান থেকে প্রশাসনের সহযোগিতায় ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৩ মার্চ আছিয়া সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে এই সমাজকে এই শিশুদের নিরাপত্তা দানে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করে চলে যায়। আছিয়া বেঁচে গেলে কি সুস্থ থাকতে পারত? তার শরীরের ক্ষত, গলায় শ্বাসরোধ করতে গিয়ে যেভাবে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে এই মেয়ে কীভাবে বাঁচত? আমি সিএমএইচ হাসপাতালে গিয়েছিলাম তাকে দেখতে। ছোট অচেতন শরীরটা হাসপাতালের আইসিইউর বিছানায় যেন দেখা যাচ্ছে না। তার মা আয়শা পাশে বসেছিলেন। সিএমএইচে সর্বাধুনিক চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়েছিল, প্রধান সার্জনকে প্রধান করে আটজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৩ মার্চ যেদিন আছিয়া মারা যায়, আমরা অনেকে গিয়েছিলাম সিএমএইচে। তখন আছিয়ার মায়ের একটি কথা আমার এখন খুব মনে পড়ছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমি তো আইসিইউতে ওর পাশে বসে আল্লাহর কাছে বলেছি, এই কষ্ট থেকে ওকে তুলে নাও। কত কষ্ট থেকে একজন মা সন্তানের মৃত্যু কামনা করতে পারে! তখন ছিল রোজার মাস। লাশ আর্মির হেলিকপ্টারে করে মাগুরায় নেওয়া হয়। লাশের সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং মাগুরার প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করেছে তার লাশ নেওয়া ও দাফনের জন্য। মাগুরাবাসী ক্ষুব্ধ, তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। দেশবাসী ক্ষুব্ধ হয়েছে। অবিলম্বে শাস্তি দাবি করেছে।
রামিসার বয়স আট বছর। বাবা-মায়ের চোখের মণি। তাকে ১৯ মে মিরপুরের পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। পিশাচ সোহেল রানা ২০ মে দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তার বাসায় রামিসার মস্তকবিহীন দেহ খাটের নিচ থেকে এবং বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনার বিবরণ শুনতে গিয়েও শিউরে উঠতে হয়।
দুটি ঘটনায় একটি মিল হচ্ছে যে অপরাধীকে তার পরিবারের সদস্যরাও সহযোগিতা করেছে। তারাও মামলার আসামি। সোহেল রানার স্ত্রী কী করে একজন নারী হয়ে তার সন্তানসম একটি মেয়েকে এক নরপশুর হাতে তুলে দেয়? আছিয়াকে ধর্ষণের ক্ষেত্রেও হিটু শেখের ছেলে এবং স্ত্রী এই ধর্ষণে শরিক ছিল এবং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। মনে হচ্ছে, নেকড়ের যৌন ক্ষুধায় পরিবার ‘খাদ্য’ জোগাচ্ছে! এই দেশে আমাদের শিশুরা, বিশেষ করে মেয়েরা কি এভাবে পৈশাচিক নির্যাতনে মরতে থাকবে?
আছিয়ার ঘটনায় সারা দেশ ফুঁসে উঠেছিল এবং সবপর্যায়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত বিচারও করেছিল, কিন্তু শিশু ধর্ষণ এবং হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মোটেও বন্ধ হয়নি। এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। এই তথ্য দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বরাতে বিবিসি। তার আগেও ঘটেছে। এমনকি মাদরাসায় ছেলেরা বলাৎকারের শিকার হচ্ছে এবং তাদের হত্যাও করা হচ্ছে। মাদরাসায় পড়া মেয়েরাও তাদের শিক্ষকদের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে।
রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা চরম শোক ও কষ্টে একটি কথাই বলেছেন, যা সব মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’ তার এই কথা সারা দেশে এত শিশু ধর্ষণের ঘটনায় বিচারহীনতার প্রতি ইঙ্গিত করে। আছিয়া ধর্ষণ এবং হত্যা মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলায় দ্রুততম বিচার করার জন্য আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়। বিচারের ৩৪ দিনের মাথায় ১৭ মে (২০২৫) মূল আসামি হিটু শেখকে (আছিয়ার বোনের শ্বশুর) মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। বিচারিক আদালত বাকি তিন অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছে প্রমাণের অভাবে। কিন্তু এ ধরনের অপরাধের সহযোগীদের কোনো ধরনের শাস্তি না দেওয়াটাও বিচারের দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, মামলাটি উচ্চ আদালতে আপিল পর্যায়ে বিচারাধীন। এক বছর পার হলেও হিটু শেখ কারাগারে আছে; তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এখনো হয়নি। আমরা মানবাধিকারের দৃষ্টিতে দেখলে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে নই। কিন্তু যেখানে আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে এবং রায় দেওয়া যেতে পারে, তাহলে কার্যকর কেন করা হয় না? আর যে অভিযুক্ত মাসুম শিশুদের ধর্ষণের মতো নৃশংস কাজ করতে পারে, তাদের হত্যাও করতে পারে, তার জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কি হবে না? আদালতের নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে এটিকে কোনো শাস্তি বলে কেউ গণ্য করবে না। ভুক্তভোগীর আত্মা চিৎকার করে উঠবে, ওরা আমাদের যারা বাঁচতে দিল না, তাদের তোমরা কী করে এই পৃথিবীতে থাকতে দাও? মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। অপরাধীরা সাবধান হবে।
কিন্তু তবু প্রশ্ন থেকে যায় যে, আমরা শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার বিচার করছি প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে আইন দিয়ে। শুধু শিশুদের ক্ষেত্রে ধর্ষণকে ১৬ বছর বয়সের কম হলে তার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী ‘যৌনকর্ম’ অর্থ ‘কোনো নারী বা শিশুর যোনি বা পায়ুপথ বা মুখের অভ্যন্তরে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে পুরুষাঙ্গ বা দেহের যেকোনো অংশ কিংবা অন্য যেকোনো বস্তুর প্রবিষ্টকরণ’। আইনের ৯-এর ধারায় সংশোধন করে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।’ এই সংশোধনীর উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে—“ধারা-২ ‘বলাৎকার’ অর্থ কোনো ছেলেশিশুর মুখ বা পায়ুপথে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত যৌনকর্ম; এবং ‘ধর্ষণ’ অর্থে বলাৎকারও অন্তর্ভুক্ত হইবে। কাজেই ছেলেশিশুদের বলাৎকারের বিরুদ্ধেও বিচার করা যাবে।”
সার্বিকভাবে দেখতে গেলে এটা ভেবে দেখার সময় হয়েছে যে, মহামারির মতো ঘটতে থাকা শিশু ধর্ষণ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিচার করলে শিশুদের প্রতি ঘটে যাওয়া এই নিষ্ঠুর আচরণের সঠিক বিচার হয় কি না। শিশুদের ধর্ষণের ক্ষেত্রে শুধু পার্থক্য হচ্ছে, এখানে সম্মতি আছে কি নেই, সেটি দেখার কোনো সুযোগ নেই, যেটি ১৬ বছরের বেশি নারীর ক্ষেত্রে হাজারবার ‘প্রমাণ’ করতে হয়। আর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাইতে গিয়ে আদালতের কাছ থেকে রায় পেলেও কার্যকর করা হয় না। তাহলে শিশুদের জীবন কি এভাবে হুমকিতে থেকে যাবে? রামিসার বিচার চাইতে গিয়ে এলাকার শিশুরা বলছে, ‘আমাদের হাতে দিয়ে দাও, আমরাই বিচার করব’। সেটাও তো সম্ভব নয়। মনে রাখা দরকার, সোহেল রানা ইয়াবা সেবনকারী। অতএব এই অপরাধ প্রতিরোধের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে এবং বিশেষ করে মাদকসেবীদের ও ব্যবসায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
১৯৯৫ সালে দিনাজপুরে পুলিশদ্বারা সংঘটিত ১৪ বছর বয়সি ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সম্মিলিত নারীসমাজের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী আন্দোলন করেছিল। মামলার শুনানিতেও ইয়াসমিনের মায়ের সঙ্গে বারবার কোর্টে গিয়ে আমরা হাজির হয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেই অপরাধী তিন পুলিশের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হয় ১৯৯৭ সালে এবং ২০০৪ সালে রংপুর কারাগারে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। প্রায় ৯ বছর লেগে গিয়েছিল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে। তখনো বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় শত শত ভুক্তভোগী বিচার না পেয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তারা নীরবে কাঁদে।
এবার রামিসাসহ বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার পরিবারকে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়ে এসেছেন। তার এই আন্তরিকতার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু ডিএনএ টেস্টের জন্য অপেক্ষা করার তো কথা নয়। অপরাধী ১৬৪ ধারায় স্বীকার করেছে। তাহলে বিচারে দেরি হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি আশা করব, ক্রমাগতভাবে ঘটে যাওয়া প্রতিটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার দ্রুত করা হবে।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা