হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আগামীর রাষ্ট্রে চাই ইনসাফের অর্থনীতি

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব ও ড. মুহাম্মদ মহিউদ্দীন সরকার

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে বর্তমানে এসে হাজির হয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় অর্থনীতির গৌরবগাথা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি ওয়াকিবহাল। কৃষিভিত্তিক স্বনির্ভর অর্থনীতি, মসলিন কাপড়ের ঐতিহ্যগত সুনাম, নৌবন্দরের সুবিধা এবং শিল্প ও কারুকার্যের প্রাচুর্যে এই অঞ্চল ছিল সমৃদ্ধ, যার ফলে বিদেশি বণিকশ্রেণি এই ব-দ্বীপে এসে নোঙর গেড়ে বসে। আমাদের সমৃদ্ধি ও আভিজাত্যকে ঔপনিবেশিক শক্তি দিনে দিনে ধ্বংস করতে থাকে। সেই সূত্র ধরে আজ আমরা পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে পরিচিত!

বাংলাদেশের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা ও অগ্রগতির সুযোগ, যা আমরা এখন পর্যন্ত কাজে লাগাতে পারিনি এবং কাজে লাগানোর মানসিকতাও দেখাচ্ছি না। আমরা কেবল নিরাশাকাতর, স্থূলদৃষ্টি নিয়ে অর্থনীতির পরিকল্পনা সাজাচ্ছি। সংকট আর সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজালে দেশ বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারবে না। আমাদের একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও শক্তিমত্তা নিয়ে আশাবাদী হতে হবে এবং সেই আলোকে আমাদের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত জনসংখ্যাকে আমরা বোঝা হিসেবে জেনেছি, জানানো হয়েছে। অথচ এই জনসংখ্যার সুবিধা, অর্থাৎ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা আমরা অতটা ভাবি না। বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্প থেকে অর্জিত রপ্তানি আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানমতে, সদ্যবিদায়ী বছরে প্রবাসীরা মোট ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশের মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, যার অবদান দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। এই দুটি খাতই আমাদের জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করছে। জনসংখ্যাকে যেখানে একটি সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, সেটাই আমাদের সম্ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ হয়েছে। নতুন আকাঙ্ক্ষার আলোকে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির সংজ্ঞায়ন প্রয়োজন। কেবল ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমির স্বপ্ন দেখালে হবে না, আমাদের টেকসই উন্নয়নের কথা মাথায় নিয়ে এগোতে হবে। গুণগত মানোন্নয়ন ছাড়া মানুষের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার জিডিপির মরীচিকায় জনগণকে ডুবিয়েছে। সার্বিক প্রস্তুতি ছাড়াই এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিকে অরক্ষিত করে ট্র্যাপে ফেলার নামান্তর। যথাযথ প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রকৃত সমস্যা ও সংকটগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। কেবল দৃশ্যমান কিছু বাহ্যিক উন্নয়ন দিয়ে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন টেকসই ও কার্যকর হয় না। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির সুফল পেতে হলে আমাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যবচ্ছেদ করাটা আমাদের জন্য আবশ্যক। আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তারা যেন অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে সচেতন ও তৎপর থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল তাত্ত্বিকভাবে আমাদের দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের পথ দেখানো সম্ভব নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে প্রকৃত সমাধান। পাশাপাশি রাষ্ট্রকাঠামোয় সততা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থনীতির কতগুলো নির্দেশকে সংখ্যাগত উন্নতি হলেই পুরো অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, তা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ জনগণের জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটেছে কি না, সেদিকে আমাদের সচেতন ও সজাগ দৃষ্টি আবশ্যক এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকটগুলো কী—এই প্রশ্নের জবাবে অনেকগুলো বাহ্যিক দিক চোখের সামনে ধরা দিতে পারে। তবে সবকিছুর গোড়ায় আছে একটি অদৃশ্য হাত আর সেটা দুর্নীতি। প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতি নিজেই একটা নীতিতে পরিণত হয়ে গেছে। নিয়মতান্ত্রিক দুর্নীতি আমাদের অন্যতম একটি সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশ একটি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বারবার উঠে আসছে। এর প্রভাবে বিদেশিরা বিনিয়োগের জন্য খুব একটা উৎসাহ পাচ্ছে না। এফডিআই ইনফ্লো এখনো থমকে আছে ব্যাড রেপুটেশনের জন্য। ভারত, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ড এগিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে বলে ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস দাবি করেছে। এগুলো আসলে কীসের টাকা? এখানে কি কেবল দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতারাই জড়িত? আমলারাও কি দুর্নীতির বড় মাপের অংশীদার নয়? যদিও বলা হচ্ছে, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে, কিন্তু তা বাস্তবে পরিণত হওয়ার সংশয় ও শঙ্কা থেকেই যায়। সর্বাগ্রে আমাদের দুর্নীতিকে বিদায় জানাতে হবে।

খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী সরকারের পতনের পর খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে। তার পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে বটে। পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী নেতাদের শত শত ঋণ অপরিশোধিত, যা এনপিএলে পরিণত হচ্ছে। পতিত সরকারের সময়ে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ নানা সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হতো। কিন্তু এবার বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো তথ্য গোপন রাখেনি, যার ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ ৩৩ কোটি টাকা। এটি ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৪ দশমিক ৬০ শতাংশ! বিনিয়োগের নামে নেওয়া বিশাল অঙ্কের এই অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয় কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই। এছাড়া ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়া হয় বিশাল অঙ্কের টাকা। একজন সম্ভাব্য ঋণখেলাপিকেই আরো বেশি ঋণ দেওয়া হয়। খারাপ ঋণের রেকর্ড থাকা বৃহৎ শিল্পকে আরো বেশি ঋণ দেওয়া হয়, যেখানে এসএমই খাত ভালো পারফরম্যান্স করেও ঋণ পাচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংকিং নীতিমালায় কার্যকর পরিবর্তন নিয়ে আসার বিকল্প নেই।

আমাদের আরেকটি মৌলিক সংকট হলো বৈদেশিক ঋণ। বছরের পর বছর ধরে আমরা একটি দুষ্টচক্রের আবর্তে পতিত হয়েছি অপরিকল্পিত ঋণ গ্রহণের ফলে। মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বাংলাদেশে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। আমাদের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ৪৮৩ ইউএস ডলার! আর সেই ঋণের সুদের ভার বহন করতে হচ্ছে আমাদেরই। অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘাটতি বাজেটের ব্যয় মেটাতেই বারবার ঋণ নিতে হচ্ছে। এই বৈদেশিক ঋণের কারণে রাষ্ট্রের ডোমেস্টিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। রিজার্ভ সংকট মেটাতে আইএমএফ থেকে বাংলাদেশ সরকার ঋণ নিচ্ছে। আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণের অনুমোদন দেয়। ২০২৫ সালের জুনে ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ছাড় করেছে। একইসঙ্গে ঋণের মেয়াদ ছয় মাস এবং ঋণের পরিমাণ ৮০০ মিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছে। এ নিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। এই ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে আমাদের ডোমেস্টিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়ছে। সরকার চাইলেও কৃষি উৎপাদনের কাঁচামালের জন্য পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতে পারছে না। জ্বালানি সংকটও বৃদ্ধি পেয়েছে আগের তুলনায়। শিল্প উৎপাদনে অস্থিরতা লক্ষ করা গেছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, আইএমএফের ঋণের শর্ত নেতিবাচক বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। তারা অবশ্য স্বনির্ভর ও টেকসই অর্থনীতির জন্যই শর্তারোপ করেছে, কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায় আমরা ঋণের শর্তগুলো পূরণ করতে কতটুকু প্রস্তুত! এতে করে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো সমাধানের জন্য আমাদের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক মন্দার অন্যতম কারণ ছিল কোনো প্রকার বাছ-বিচার ও পরিকল্পনা ছাড়াই দেশি ও বিদেশি ঋণ গ্রহণ। তারা ঋণ গ্রহণ করে অযাচিত মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, যার সুদূরপ্রসারী কোনো ইতিবাচক আউটপুট ছিল না।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরেকটি মৌলিক সংকট হলো বেকারত্ব। বেকারের সংজ্ঞা অনুযায়ী, মনে হতে পারে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার অনেক কম। যেহেতু দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এক দশক ধরেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। শিক্ষিত বেকারের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ। তাহলে বেকারসংখ্যা এত কম কেন? এটা মূলত বেকারের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার দুর্বলতার জন্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাকে বেকার হিসেবে ধরা হবে না। এক মাস ধরে কাজপ্রত্যাশী এবং সর্বশেষ এক সপ্তাহে কেউ যদি এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ না পায়, তাদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হবে। আমরা যে বেকারের আধিক্য দেখি, তারা মূলত ছদ্ম বেকার। আর এই ছদ্ম বেকারের সংখ্যা কোটির চেয়েও বেশি। শিক্ষা কারিকুলাম ও পেশাগত কাঠামোর মধ্যে বিস্তর ফারাকের জন্য আমাদের দেশের গ্র্যাজুয়েটরা তাদের দক্ষতা অনুযায়ী বৃত্তি নির্ধারণ করতে পারে না। পর্যাপ্ত কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তবিক প্রশিক্ষণ অনেকেরই নেই। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে সৃষ্ট সরকারি চাকরির প্রতি মোহ বেকার উৎপাদনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার পথটিও সুগম নয়। পুঁজি সংগ্রহ ও অনিরাপত্তার কারণে প্রতিভাবান তরুণেরা উদ্যোক্তা হয়ে দেশে অবদান রাখার পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

বৈদেশিক বাণিজ্যেও আমরা পিছিয়ে আছি। মোট আমদানি মোট রপ্তানির পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি। এই বছর আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণ করার পর প্রথম ধাক্কা আসবে আমাদের রপ্তানি খাতের ওপর। আমাদের তৈরি পোশাক মূলত রপ্তানি হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় ও আমেরিকায়। ২০২৯ সালের পর দেশের রপ্তানিকারকদের পণ্যমূল্য কমানোর মাধ্যমে বাড়তি শুল্কব্যয়ের ৪০ শতাংশ নিজেদেরই বহন করতে হতে পারে। উত্তরণ-পরবর্তী রূপান্তরকাল শেষ হলে বাংলাদেশ ইইউতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে। তখন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে। ফলে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আমাদের সার্বিক প্রস্তুতির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোগী হতে হবে। নতুন এফটিএ ও পিটিএ গড়ে তুলতে হবে। আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। ‘Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP)’-এ যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা পাবে, যেখানে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে। নতুন একটা ব্লকে রপ্তানি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ আবশ্যক। গুটিকয়েক পণ্যের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকেই যায়। ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক কালে উন্নতি করেছে, যেটা আরো বাড়ানো যেতে পারে। কৃষিপণ্য রপ্তানি করার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মানবসম্পদ রপ্তানির পাশাপাশি কৃষিপণ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া যায়। আমদানি বিকল্প শিল্পের দিকে মনোযোগী হতে হবে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে।

কর-জিডিপি হারে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে—রাষ্ট্রের গুণগত ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যা কমপক্ষে ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার। অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক রাজস্ব সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে। রাজস্ব আহরণ এত কম হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কর সংগ্রহে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা আমাদের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সেক্ষেত্রে কর প্রদানে অটোমেশন ও জটিলতা নিরসন নিশ্চিত করতে হবে। এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার সমাধান করতে হবে।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে আরো বেশ কিছু সমস্যা ও সংকট রয়েছে। আয়বৈষম্যের প্রভাব আমরা সরাসরি উপলব্ধি করছি। মূল্যস্ফীতির কবলে সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস উঠে যাওয়ার উপক্রম। বাংলাদেশ একটি পটেনশিয়াল ইকোনমিক টাইগার, অথচ আমরা তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছি। নানা সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার সমাধান কী? এই ব-দ্বীপ কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হতে পারে? এত সম্ভাব্যতাকে ঠিক কীভাবে উৎপাদনশীল করা যায়, সেটাই মূলত ভাবার বিষয়। গ্রামীণ অর্থনীতির ফাঁকফোকরগুলো আবিষ্কার করে সমাধানের মাধ্যমে এর উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

ভঙ্গুর ও আস্থাহীন অর্থনীতির সমাধানকল্পে অনেকগুলো পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার ইতিবাচক প্রভাব আমরা এখনো লক্ষ করিনি। ব্যাধিগ্রস্ত অর্থনীতির চিকিৎসার জন্য কার্যকর সমাধান ও উদ্যোগ প্রত্যাশিত। কেবল কয়েকটা নির্দেশকে উন্নতি ঘটালে দেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গিয়েছে, সেটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। আমরা দেখেছি, আওয়ামী শাসনামলে মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে; কিন্তু এত কিছুর পরও জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি, আয়বৈষম্য বেড়েছে। কারণ অর্থনীতিতে ইনসাফ ছিল না।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের পলিসি নিতে হবে সম্ভাবনা ও শক্তিমত্তা বিবেচনায়। প্রতিটি পলিসির ক্ষেত্রে যে বিষয়টি অন্তর্নিহিত থাকতে হবে, সেটি হলো ন্যায্যতা তথা ইনসাফ। রাজনীতির মাঠে ইনসাফ বহুল প্রশংসিত শব্দ। শহীদ ওসমান হাদি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছেন। রাজনীতিবিদরা সভা-সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে আসছেন—ক্ষমতার মসনদে বসার সুযোগ পেলে ইনসাফ কায়েম করবেন। এখানে ইনসাফ কি স্রেফ একটি তত্ত্ব? এটা কোন ধরনের ইনসাফ? শাসন ও বিচারব্যবস্থায় ইনসাফের ধারণা মোটামুটি স্ফটিক স্বচ্ছ, কিন্তু ইনসাফের যে অর্থনৈতিক দিক আছে, সেটা আলোচনা করতে এখন পর্যন্ত তেমন কাউকে দেখা যায়নি।

শাসনতান্ত্রিক যেকোনো সিদ্ধান্ত ও কার্যপরিচালনার জন্য সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে কোনো জায়গাই দুর্নীতির ছোবল থেকে মুক্ত নয়। যতগুলো উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, তার স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। টেন্ডার বাণিজ্যের মূলোৎপাটন করতে হবে যেকোনো মূল্যে। বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে থাকতে হবে ইনসাফের নীতি। আমাদের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতার চিত্র নিয়মিত বিষয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার প্রভাব দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতিকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে। আমরা এমন একটি বাজেট প্রণয়ন চাই, যেটা হবে বাস্তবায়নযোগ্য, দক্ষ, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ফলপ্রসূ।

দেশের সামগ্রিক চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সুষম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। সম্পদগুলো যেন ক্ষুদ্রসংখ্যক পুঁজিপতির কাছে কুক্ষিগত হয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে একটা ইনসাফ ও সততার অর্থনীতি চালু রাখতে হবে। পরার্থপরতা ও হীনম্মন্যতাবোধ থেকে মুক্ত হয়ে যুগোপযোগী অর্থনীতির পথে হাঁটতে হবে। ব-দ্বীপীয় ভূমির সুবিধা, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, বঙ্গোপসাগর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক গ্যাস, জনগণের দেশপ্রেম—এই সবকিছু নিয়ে আমাদের অর্থনীতির রয়েছে অপার সম্ভাবনা। যদি প্রতিটি নীতি ও কাজে ইনসাফ ও সততার বীজ বুনতে পারা যায়, তবেই বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বের পথ ধরতে সক্ষম হবে আগামীর বাংলাদেশ।

লেখক : ১. এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস

২. ডেপুটি ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস

এপস্টেইন ফাইল : বিশ্বনেতাদের বীভৎস রূপ

আমার দাদুর সেকুলারিজমের বদনাটি হারিয়ে গেল শেষে

নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকার

ইনসাফের দাবিতে অর্থনীতির ইনকিলাব

রাজনৈতিক সংস্কৃতির নবায়ন ও ‘হাদি মডেল’

হারজিতে জেনজি নাকি সুইং ভোট ফ্যাক্টর

রাজনীতির ধারাপাত এবং এর পিচ্ছিল পথ

বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির শাশ্বত শবেবরাত

ক্ষমতার হিসাব আছে, মানুষের জীবনের নেই

উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারত একঘরে