চাকরির আশায় অনলাইনে একটি বিজ্ঞাপনে আবেদন করার পর যদি সেই চাকরিই আপনার জন্য প্রতারণার ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে কী করবেন? বর্তমান সময়ে চাকরির সুযোগ খুঁজতে তরুণদের একটি বড় অংশ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করছে। অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপন সহজে পাওয়া গেলেও এর সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির প্রতারক। আকর্ষণীয় বেতন, বিদেশে চাকরি, ঘরে বসে আয় কিংবা দ্রুত কমিশন পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা যায়, ভুয়া অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন শুধু আর্থিক প্রতারণার মাধ্যম নয়; কিছু ক্ষেত্রে এটি মানব পাচারের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় প্রকাশিত ইউএনওডিসির Trafficked to Scam প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের মানুষকে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক দালালের মাধ্যমে বিদেশের অনলাইন প্রতারণামূলক কার্যক্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে। কিছু ভুক্তভোগী পরে আটকে পড়ে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতিসংঘও ২০২৬ সালের মানব পাচারবিরোধী দিবসের বার্তায় জানিয়েছে, অপরাধী চক্রগুলো বৈধ চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং পরে তাদের অনলাইন প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধ্য করতে পারে। অর্থাৎ, একটি ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন কখনো কখনো একজন চাকরিপ্রার্থীকে শুধু আর্থিক ক্ষতির নয়, আরো গুরুতর শোষণের ঝুঁকিতেও ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে সরাসরি আর্থিক প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সিআইডির তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, টেলিগ্রামে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব দিয়ে এক ব্যক্তিকে একটি নকল ওয়েবসাইটে নেওয়া হয়। সেখানে অনলাইন অর্ডার সম্পন্ন করার বিনিময়ে কমিশন এবং পরে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করলে বেশি লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দফায় ওই ব্যক্তি ৯৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা হারান। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলাটি তদন্তাধীন।
আন্তর্জাতিকভাবেও অনলাইন চাকরি-প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতারকরা ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ বা অন্যান্য কারণ দেখিয়ে অগ্রিম অর্থ দাবি করতে পারে। চাকরির আবেদনের সময় দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্যও অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে চাকরিপ্রার্থীদের সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে কোনো চাকরির বিজ্ঞাপন দেখেই অর্থ প্রদান করা বা জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকিং কিংবা অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য দেওয়া উচিত নয়। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, চাকরির বিজ্ঞাপন এবং যোগাযোগের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াও জরুরি।
তবে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও অপসারণ, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার দ্রুত তদন্ত এবং দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা প্রয়োজন। ইউএনওডিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও ভুক্তভোগীদের শনাক্তকরণ, আর্থিক তদন্ত এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
তরুণদের কর্মসংস্থানে অনলাইন মাধ্যমের ব্যবহার ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। তাই চাকরির দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল সচেতনতা ও তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। একটি চাকরির বিজ্ঞাপন সত্যিই কর্মসংস্থানের সুযোগ দিচ্ছে, নাকি প্রতারণার ফাঁদ—এই পার্থক্যটি বোঝার সক্ষমতা এখন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগই পারে অনলাইন চাকরির প্রতারণা ও এর সঙ্গে যুক্ত গুরুতর ঝুঁকি কমাতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়