হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আর কত খেসারত দেবে শিক্ষার্থীরা

শিক্ষায় নৈরাজ্য

মেহেদী হাসান

দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বহুমাত্রিক নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। এসব নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলার কারণে বছরের পর বছর ধরে বর্ণনাতীত ভোগান্তি আর অপূরণীয় খেসারত দিয়ে চলছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। অসহায় শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরা আজ ক্লান্ত-শ্রান্ত। কিন্তু গভীর পরিতাপের বিষয় হলো, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষা খাতসহ দেশের সার্বিক ক্ষেত্রে মানুষ যে পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিলেন, তা হয়নি। সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে অতি কঠোরতা অবলম্বনের কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জীবনে নেমে এসেছে ফেল করার কলঙ্কসহ নিদারুণ মর্মবেদনা।

মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনার আমলে শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষাকে তামাশায় পরিণত করা হয়েছিল। পরীক্ষা মানেই প্রশ্নপত্র ফাঁস আর গণহারে জিপিএ ৫ প্রাপ্তি। পরীক্ষাব্যবস্থা ও খাতা মূল্যায়নসহ সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল । অগণিত শিক্ষার্থী নিজেরাও বিস্মিত হতো জিপিএ ৫ তালিকায় তাদের নাম দেখে। ২০২১ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ৯৫ শতাংশ এবং ১ লাখ ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পান। ২০২২ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৬ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পায় ১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায়ও তখন বিভিন্ন বছর শতভাগের কাছাকাছি পাস ও গণহারে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির ঘটনা ঘটে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ ব্যাপকভাবে কমতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় এ বছর ৩১ অক্টোবর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার যে ফল প্রকাশিত হয়েছে, তা আওয়ামী আমলের সম্পূর্ণ বিপরীত।

অনেকে এটাকে শিক্ষার স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করলেও বাস্তবে এর খেসারত দিচ্ছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এবার ১২ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন এবং এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক—তথা ৫ লাখ ৯৪ হাজার শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। সারা দেশে গড় পাসের হার ৫২ শতাংশ, জিপিএ পেয়েছেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। ২২ বছরের মধ্যে এটা সর্বনিম্ন পাসের হার।

সন্দেহের অবকাশ নেই, নৈরাজ্য পিছু ছাড়ছে না শিক্ষা খাতের। সর্বশেষ এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল শিক্ষা খাতের নতুন অনেক নৈরাজ্যকর চিত্র সামনে এনেছে। গত আগস্টে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। ফল প্রকাশের পর আবার খাতা মূল্যায়নের আবেদনের কারণে নতুন করে তিন হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায়। এ থেকে পরিষ্কার—খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপক মাত্রায় অনিয়ম, অবহেলা আর নৈরাজ্য বিরাজ করছে। সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে চায়ের দোকানে বসে ফ্যাসিবাদপন্থি এক শিক্ষককে বন্ধুবান্ধব নিয়ে খাতা মূল্যায়নের ঘটনা হাতেনাতে ধরা পড়েছে। আড়ালে এ ধরনের আরো কত নৈরাজ্য চলছে, তার হিসাব কে রাখে?

এবার এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। প্রথমবারের মতো পূর্ণ সিলেবাসে সব শিক্ষা বোর্ডে সমন্বিত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরীক্ষার রুটিনে যেমন কম ছুটি ছিল, তেমনি কঠিন ছিল পরীক্ষার প্রশ্ন। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের প্রশ্নপত্র অত্যন্ত কঠিন, এমনকি বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করেছেন কেউ কেউ। এর ওপর একের পর এক বিভিন্ন প্রশ্নপত্রে ভুল ও অসংগতি ছিল। এ কারণে বিভ্রান্তি ও ক্ষতির শিকার হয়েছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী। প্রশ্নে ভুল ও অসংগতির কারণে উত্তর লিখে তা আবার কেটে দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এভাবে নষ্ট হয়েছে অনেকের মূল্যবান সময়, কিন্তু সে অনুযায়ী তারা ক্ষতিপূরণ পাননি। কেবল পদার্থবিজ্ঞানে দুটি প্রশ্নে ভুলের কারণে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যারা প্রশ্নের ভুল বুঝতে পেরে পরে তা কেটে দিয়ে অন্য প্রশ্নের উত্তর লিখেছেন, তারা এ ক্ষেত্রে কোনো উপকার নয়, বরং ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার কারণে চরম দুর্ভোগের শিকার হন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এ অবস্থায় পরীক্ষা কিছুদিন স্থগিত রাখার জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনমনীয় অবস্থান নেয়। কিন্তু এতসব সমস্যা, নৈরাজ্য, অদক্ষতা আর অব্যবস্থাপনার কারণে খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যতটুকু নমনীয় নীতি অবলম্বন করার প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি।

সর্বোপরি পরীক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও অযোগ্যতার বলি হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। মাত্র এক বিষয়ে ফেল করেছেন দুই লাখ ৯৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২২ হাজারের অধিক। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, দুই বিষয় পর্যন্ত যারা ফেল করেছেন, তাদের আবার পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু ফুল সিলেবাস আর অত্যন্ত কঠিন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কপালে যে ফেলের কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে দেওয়া হলো, এর দায়ভার কে নেবে? এক বিষয়ে ফেল করা প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলো আজ যে সামাজিক অসম্মানের শিকার ও মর্মবেদনা ভোগ করছেন, এর দায়ভারই বা কে নেবে? আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি কিছুটা নমনীয় নীতি অবলম্বন করত, তাহলে এই ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত। এদিকে দুই বিষয় পর্যন্ত ফেল করা শিক্ষার্থীরা পুনঃপরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেলেও পাসকৃত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।

কারণ ঢাকা, রাজশাহী, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন পুনঃপরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, পুনঃপরীক্ষায় বিপুল শিক্ষার্থী পাস করবে এবং তাদের মধ্যে অনেকেই কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেতেন। তাছাড়া ফেল করা এই কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর অনেকেই পরীক্ষার পরপরই বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য। কিন্তু ফেল করার কারণে তাদের সবকিছু এখন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ভর্তি কোচিং বাদ দিয়ে এখন আবার তাদের শুরু করতে হচ্ছে পুনঃপরীক্ষার প্রস্তুতি। এই যে বঞ্চনা, ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি—এর দায়ভার কি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নেবে?

এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে অনেক শিক্ষার্থীর পরবর্তী জীবনের গতিপ্রকৃতি। বর্তমান উচ্চ বাজারদরের জীবনে একজন শিক্ষার্থীকে এইচএসসি পর্যন্ত টেনে আনতে অভিভাবকদের কতটা ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়, তা কি কখনো চিন্তা করেন আমাদের নীতিনির্ধারকরা? সম্ভবত করেন না। যদি করতেন, তাহলে লাখ লাখ শিক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে তারা এ ধরনের নিষ্ঠুর তামাশা করতে পারতেন না।

আমাদের পরীক্ষাব্যবস্থায় অবিলম্বে আমূল সংস্কার আনা অপরিহার্য। আমাদের বিশ্বাস, উপযুক্ত শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারলে শিক্ষার্থীদের এই ফেল করার সংস্কৃতি থেকে বের করে আনা সম্ভব হবে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর যে পরীক্ষার মাধ্যমে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে ফেলের কলঙ্ক জোটে, সেই পরীক্ষাব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি পরীক্ষা জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার মাপকাঠি হতে পারে না। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থা তরুণ প্রজন্মের মেধা ও যোগ্যতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে চূড়ান্তরূপে ব্যর্থ ও অকার্যকর। আজ যে শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছে, এজন্য সে যতটা না দায়ী, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি দায়ী আমাদের জীর্ণ, অকার্যকর ও ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থা এবং পচন ধরা পরিবার ও সমাজকাঠামো। এটি নিশ্চিত, এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করা অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যাদের প্রতিভা যোগ্যতা পাস করা অনেক শিক্ষার্থীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

কিন্তু আমাদের ব্যর্থতা হলো, আমরা একটি পদ্ধতির মাধ্যমে বা একই পাল্লায় সবার মেধাকে মাপার ব্যবস্থা করি, যা কখনো ন্যায্য হতে পারে না। জরুরি ভিত্তিতে আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা দরকার, যেখানে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় বর্তমান ফেল করার সংস্কৃতি থাকবে না। শিক্ষার অনেকগুলো লক্ষ্যের মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার্থীদের প্রতিভার বিকাশ ঘটানো, যার যা সক্ষমতা আছে, যার যেদিকে আগ্রহ, সে অনুযায়ী তাকে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রত্যেককে নিজ নিজ প্রতিভা অনুযায়ী ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা কিছু শিক্ষার্থীকে সফল আর অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে ব্যর্থ, অকৃতকার্য হিসেবে সিল মেরে দেয়। আমাদের শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা প্রতিবছর এভাবে লাখ লাখ তরুণের মেধার অকালমৃত্যু ঘটায়। সুতরাং এই পরীক্ষাব্যবস্থা আর চলতে পারে না।

একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে বের করে আনতে হবে। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লাঠি তুলে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু শিশুরা নির্যাতনমুক্ত হয়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কারণে বর্তমানে শিশুরা পরিবারে মা-বাবার দ্বারাই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এজন্য পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে পরীক্ষাব্যবস্থাসহ গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সততা এবং বর্তমান বাস্তবতা

নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতের লড়াই

উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার নির্মম বাস্তবতা

অনিশ্চিত সময়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে সবাই ডুববেন

সাধারণে বিপর্যয়, অসাধারণে অর্জন

অরুণাচলে ভারতের পরাজয়ের শঙ্কা

আওয়ামী লীগ পুনর্মিলনের আলোচনার আড়ালে

ক্ষমতার পালাবদল ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা

ঋণের জালে অর্থনীতি

হামের টিকা নিয়ে উদ্বেগ: শিশুদের জন্য মানসম্মত টিকা নিশ্চিত করুণ