সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রকাশিত সরকারি গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কোভিড-১৯ মহামারীকাল থেকেই জনস্বার্থে আমরা মূলধারার গণমাধ্যমে টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা সম্পর্কিত রেগুলেটরি এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিয়মিতভাবে তুলে ধরে আসছি। বিশেষ করে, বহুল আলোচিত ‘বঙ্গভ্যাক্স’ টিকার কার্যকারিতা নিয়ে যে সংশয় ও অসারতা তৈরি হয়েছিল, তা আমরাই প্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসি।
এরই ধারাবাহিকতায়, সম্প্রতি পাঁচ কোটি শিশুকে দেয়া টাইফয়েড টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়েও আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছি। বিশেষ করে টাইফয়েডের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত টিকা বাদ দিয়ে নতুন একটি টিকা প্রয়োগ করার বিষয়টি সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে— কোনো নির্দিষ্ট মহল কি টিকা কেন্দ্রিক লাভজনক ব্যবসার সাথে জড়িত কিনা।
হামের টিকা নিয়ে গত ২৭ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত আইইডিসিআর-এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, টিকা নেওয়া ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫ জনের (২৭.৫%) রক্তে হামের অ্যান্টিবডি নেগেটিভ এবং ৬.৮% শিশুর ফল অনিশ্চিত বা বর্ডারলাইন। মাত্র ৬৫.৭% শিশুর পরীক্ষার ফল পজিটিভ এসেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযানের পর সেপ্টেম্বরে পরিচালিত এই গবেষণা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বাংলাদেশের কোটি কোটি শিশুর জন্য যে টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে, তার উৎপাদনগত মান, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নকে আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি কিনা? টিকার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টির পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মহলের যে চরম গাফিলতি রয়েছে যা এখন অনেকটাই স্পষ্ট মনে হচ্ছে।
ইউরোপ ও আমেরিকার শিশুদের কোন টিকা দেয়া হয়?
বাংলাদেশে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে সাধারণত MR টিকা ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে প্রধানত MMR (হাম, মাম্পস, রুবেলা) বা জলবসন্তসহ MMRV টিকা ব্যবহৃত হয়। এমনকি যুক্তরাজ্য ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শিশুদের নিয়মিত কর্মসূচিতে MMRV ব্যবহার শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের FDA-অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে GSK-এর PRIORIX, Merck-এর M-M-R II এবং ProQuad। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত রয়েছে M-M-RVAXPRO এবং Priorix-Tetra। অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যবহৃত ভারতের Serum Institute of India (SII) এবং Biological E—উভয় প্রতিষ্ঠানের MR টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রাক্যোগ্যতা বা Prequalification পেলেও, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা যুক্তরাজ্যে এগুলোর নিয়মিত বাজারজাতকরণের অনুমোদন নেই (অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত)।
যখন কোটি কোটি শিশুর সুরক্ষার প্রশ্ন আসে, তখন টিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে FDA বা ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতো কঠোর মূল্যায়নের স্তর পার হওয়া টিকাগুলোকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে। অন্যথায়, যদি বিনা মূল্যে টিকা প্রদানই আমাদের মূল লক্ষ্য হয়, তবে টিকা দেওয়ার সময় জনগণকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে এই টিকা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ নাও করতে পারে।
অতীতের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বনাম বর্তমান বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান icddr,b অতীতে SII-এর MR টিকা নিয়ে একাধিক গবেষণা করেছে। ২০১৬ সালে Journal of Infectious Diseases-এ প্রকাশিত গবেষণায় অ্যান্টিবডির মাত্রায় কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেলেও, ২০২৫ সালে The Lancet Child & Adolescent Health-এ প্রকাশিত (২০১৭-১৮ সালের ট্রায়াল) গবেষণায় অভাবনীয় ফল পাওয়া যায়। সেখানে ৯ মাস বয়সে টিকার প্রথম ডোজ পাওয়া ২৯২ শিশুর মধ্যে প্রায় ১০০ শতাংশের শরীরেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল।
অথচ ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক জরিপে তা নেমে এসেছে ৬৫.৭ শতাংশে যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে শুধুমাত্র ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হলেই সেই টিকা বছরের পর বছর একই গুনগতমান ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখবে কিনা।
টিকা উৎপাদন ও গুনগত মান বজায় রাখা কেন এত কঠিন?
হামের টিকা সাধারণ কেমিকেল ড্রাগ নয়; এটি জীবন্ত দুর্বলকৃত ভাইরাস (live attenuated virus) দিয়ে তৈরি অত্যন্ত সংবেদনশীল জৈবপ্রযুক্তিগত পণ্য। কোষের বৈশিষ্ট্য, কাঁচামালের মান, উৎপাদন পরিবেশ কিংবা ফ্রিজ-ড্রাইং প্রক্রিয়ার সামান্য পরিবর্তনও টিকার গুনগত মানকে চরমভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এখানেই Batch-to-batch consistency বা ব্যাচভিত্তিক গুণগত সামঞ্জস্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানিকে শুধু কয়েকটি ভালো ব্যাচ তৈরি করলেই চলে না, দশকের পর দশক প্রতিটি ব্যাচের গুনগত মান এবং কার্যক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়। এ কারণেই FDA ও ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (EMA) ক্লিনিক্যাল গবেষণার পাশাপাশি টিকা উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
অপুষ্টি, কম বয়স কিংবা কোল্ড চেইন—এসবই কি যৌক্তিক ব্যাখ্যা?
২০১৭–২০১৮ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত এবং ২০২৫ সালে The Lancet Child & Adolescent Health-এ প্রকাশিত MR টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী শিশুদের দুই দলে যথাক্রমে ১০% ও ১২% শিশুর বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম ছিল (stunting) এবং ৫% ও ৪% শিশুর উচ্চতার তুলনায় ওজন কম ছিল (wasting)। এই ধরনের অপুষ্টির উপস্থিতি সত্ত্বেও নির্ধারিত টিকাদান সম্পন্ন হওয়ার পর পুরো গবেষণাদলের প্রায় ৯৯–১০০% শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি (seroconversion) তৈরি হয়েছিল। এমনকি মাত্র ছয় মাস বয়সে MR টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পরও ৯৪% শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়।
যদিও অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের পৃথক ফল প্রকাশিত হয়নি, গবেষণাটি দেখায় যে বাংলাদেশের মতো পরিবেশে কম বয়স এবং অপুষ্টির উপস্থিতি সত্ত্বেও MR টিকার মাধ্যমে অত্যন্ত ভালো প্রতিরক্ষা অ্যান্টিবডি অর্জন সম্ভব। সুতরাং শুধু বয়স বা অপুষ্টিকে সাম্প্রতিক টিকার অকার্যকারিতার প্রধান কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যথেষ্ট নয়।
এছাড়া, ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) কোল্ড চেইন ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের একটি নথি অনুযায়ী, ঢাকার মহাখালীতে EPI সংরক্ষণাগারে ৩৮টি কোল্ডরুম ও ফ্রিজাররুম রয়েছে, যেখানে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ডোজ টিকা সংরক্ষণের সক্ষমতা আছে। তাই নির্দিষ্ট কোনো তাপমাত্রাগত ত্রুটির প্রমাণ ছাড়া কোল্ড চেইনকে দায়ী করা যুক্তিসংগত নয়। উৎপাদনের সময় কোনো টিকার কার্যক্ষমতা অপর্যাপ্ত থাকলে, পৃথিবীর সেরা কোল্ড চেইনও সেই ঘাটতি দূর করতে পারে না।
FDA এবং EMA অনুমোদন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
FDA এবং EMA টিকার গুনগত মান (CMC/Quality), Batch-to-batch consistency ও প্রডাক্টশন প্লান্টের মান নিয়মিত তদারকি করা হয়। ইউরোপে OCABR নামের একটি স্বাধীন সরকারি ব্যাচ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রস্তুতকারকের বাইরেও নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে ব্যাচ যাচাই করে থাকে। WHO Prequalification-এর গুরুত্ব উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনস্বীকার্য, তবে FDA বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদন পেতে WHO Prequalification তেমন কোনো ভূমিকাই রাখে না। টিকার বাজাজাতকরণের অনুমোদন পেতে WHO Prequalification চেয়ে FDA এবং EMA এসেসমেন্ট খুবই নিবিড় এবং বিস্তৃত। তাই বাংলাদেশের উচিত WHO Prequalification-এর পাশাপাশি FDA বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদনকে টিকা নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণগত নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা।
ভারতে টিকা উৎপাদনের ১২৫ বছরের ইতিহাস রয়েছে এবং সাশ্রয়ী টিকা সরবরাহে SII-এর অবদান রয়েছে। তবে অতীব তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো যে ভারতের নিজস্ব গবেষণায় উদ্ভাবিত কোনো টিকা আজ পর্যন্ত (অক্টোবর ২০২৬) FDA বা EMA অনুমোদন পায়নি। তাই বাংলাদেশের শিশুদের জন্য সংগৃহীত MR টিকার উৎপাদনগত মান এবং আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের তথ্য-প্রমাণ কতটা শক্তিশালী, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
টিকা নির্বাচন ও ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বাধীন ও স্বচ্ছ
বাংলাদেশের উচিত FDA এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত MMR টিকাগুলোকে সংগ্রহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। যদিও এসব টিকার নিয়মিত ব্যবহারের বয়স সাধারণত ১২ মাস থেকে (ইউরোপে কিছু ক্ষেত্রে ৯ মাস), কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে এগুলো কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে রেগুলেটরি বডি, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ, ইউনিসেফ ও প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
যেসব বিজ্ঞানী নির্দিষ্ট কোম্পানির টিকা গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে জড়িত, তাঁদেরকে স্বার্থ সংঘাতের (Conflict of interest) বিষয়টি বিবেচনা করে টিকা নির্বাচন এবং চূড়ান্ত ক্রয়-সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখা একান্ত জরুরী। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির স্বার্থ নয়, টিকার রেগুলেটরি ও বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়নই (CMC/Quality, non-clinical and clinical) হতে হবে চূড়ান্ত ভিত্তি। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী সমাধান বাদ দিয়ে শুধু টিকা নিয়ে ব্যস্ত থাকার মূল কারণ বিদেশি ফান্ডিং এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন, যেখানে দেশের মানুষকে পরীক্ষামূলক গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনৈতিক ও জনস্বার্থবিরোধী।
উপসংহার
বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু উন্নত বিশ্বের শিশুদের মতোই নিরাপদ, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য টিকা পাওয়ার অধিকার রাখে। সাম্প্রতিক হামের টিকার অ্যান্টিবডি জরিপের ফল হালকাভাবে নেওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। টিকা কেনার সময় শুধু কত কোটি ডোজ বা কত কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, তা দেখলে চলবে না। দেখতে হবে প্রতিটি ডোজের মান ও কার্যকারিতার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্য। শিশুর জীবন রক্ষার প্রশ্নে টিকার মান নিয়ে আপস করার কোনো সুযোগ নেই।
ড. রেজাউল করিম: নেদারল্যান্ডস-প্রবাসী ইমিউনোলজিস্ট, যিনি বায়োলজিকস ও টিকা উদ্ভাবন এবং মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ।
ড. জুবায়ের রহমান: ইমিউনোলজিস্ট, যুক্তরাষ্ট্র।
ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন: সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার (R&D), বায়োটেক বিভাগ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড; এবং প্রেসিডেন্ট, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।