হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিপর্যয়ের মুখে লেবার পার্টি

ইরান যুদ্ধে স্টারমারের সমর্থন

জো গিল

ছবি: সংগৃহীত

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার তার দেশের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে। বিশেষ করে, ব্রিটেনের গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি এবং ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া বিমানঘাঁটি ব্যবহার করেছে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো। অবশ্য ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের শুরুতে স্টারমার প্রথমে ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমানের প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকার করেছিলেন; কিন্তু পরে ট্রাম্পের হুমকিতে তিনি নতিস্বীকার করেন। তার এই সিদ্ধান্তে দেশটির অধিকাংশ মানুষ ক্ষুব্ধ। এর প্রভাব আগামী মাসের স্থানীয় ও বিকেন্দ্রীভূত আইনসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবি ঘটাতে পারে।

ব্রিটেনের বিরোধী দল—বিশেষ করে, গ্রিন পার্টি যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়ার ঘোর বিরোধী। দলটির নেতা জ্যাক পোলানস্কি ইসরাইলকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘এটি একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র, যা যুদ্ধাপরাধ করছে এবং আরো করার হুমকি দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য সরকারকে মেরুদণ্ড সোজা করে এই যুদ্ধে আমাদের ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে।’ ইরানে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’ হুমকির জবাবে জ্যাক পোলানস্কি এ কথা বলেছেন।

পোলানস্কির এই বক্তব্যের পর পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির চেয়ে গ্রিন পার্টি অনেকটাই এগিয়ে আছে। অথচ মাত্র এক বছর আগেও দলটির এই অবস্থান ছিল অকল্পনীয়। এই জনসমর্থন আগামী মাসের স্থানীয় ও আইনসভা নির্বাচনে গ্রিন পার্টি বড় ধরনের সাফল্য এনে দেবে এবং অন্যদিকে লেবার পার্টির ভরাডুবি হবে বলে ধারণা করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।

গাজা ও ইরান যুদ্ধে ব্রিটেনের সহযোগিতার কারণে লেবার পার্টি ও স্টারমারের জনসমর্থন ক্রমেই কমছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুই বছরেরও কম সময়ে তিনি গাজায় ইসরাইলের গণহত্যায় সহায়তা করেছেন এবং এপস্টাইন কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানে বোমা হামলার জন্য যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। এই দুটি যুদ্ধে মদত দেওয়ার জন্য স্টারমারকে আসন্ন নির্বাচনে মূল্য দিতে হবে।

আগামী ৭ মে যুক্তরাজ্যে স্থানীয় ও বিকেন্দ্রীভূত আইনসভার নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনে লেবার পার্টি ভরাডুবি অনেকটাই নিশ্চিত। এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, নির্বাচনে দলটি প্রায় ২,০০০ কাউন্সিলর পদ হারাবে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় নানা বিষয় ভোটারদের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধ এবং স্টারমারের পররাষ্ট্রনীতিও এই নির্বাচনে ভোটারদের কাছে বিবেচ্য বিষয় হবে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প যখন প্রথমে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে নেওয়ার এবং তারপর ‘এক রাতের মধ্যে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস’ করার হুমকি দেন, তখন স্টারমারের সরকার নীরব ছিল। এই নীরবতা স্পেন, ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপীয় প্রধান ন্যাটো মিত্রদের প্রতিক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ এসব দেশ ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের জন্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার উপসাগরীয় দেশগুলোয় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার নিন্দা করেছেন। কিন্তু ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা প্রায় সফল হওয়ার মাঝেই দেশটির ওপর চালানো আগ্রাসনের কোনো সমালোচনা করেননি তিনি।

একইভাবে তিনি হরমুজ প্রণালি অবরোধ করার জন্যও ইরানের নিন্দা করেছেন। কিন্তু ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, ক্লাস চলাকালে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা করে ১৭০ শিশুকে হত্যা, বিশ্ববিদ্যালয়, সেতু, জ্বালানি কেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং বেসামরিক ভবন লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার বিষয়ে টু শব্দও করেননি তিনি। এমনকি ট্রাম্পের একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি নিয়েও লেবার সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।

স্টারমারের ব্যর্থ কূটনীতি

হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার প্রচেষ্টায় কূটনৈতিক পথ খুঁজে বের করতে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার জন্য স্টারমার গত বৃহস্পতিবার আবুধাবিতে পৌঁছান। কিন্তু যুক্তরাজ্যের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। গত সপ্তাহের একটি অনলাইন শীর্ষ সম্মেলনে তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ এই অঞ্চলের প্রধান দেশগুলো অংশ না নেওয়ায় এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে স্টারমার যুক্তরাজ্যকে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী করে তুলেছেন। কাজেই তিনি একজন সৎ মধ্যস্থতাকারী হতে পারেন না। তিনি ইরান ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার সমালোচনা করেননি কখনোই। এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ ব্রিটেনকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

তবে, রাতারাতি এটা ঘটেনি। ব্রিটেনের প্রভাবের এই ক্ষয় হয়েছে ধীরে ধীরে। ইরাক যুদ্ধ এই অঞ্চলজুড়ে ব্রিটেনের ওপর বিশ্বাসকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে এবং দেশটিকে নেতার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্রেক্সিট ব্রিটেনের কূটনৈতিক পরিধিকে আরো সংকুচিত এবং প্রভাবকে সীমিত করেছে।

কিন্তু প্রভাব ছাড়া কূটনীতি হলো লোকদেখানো। অস্বস্তিকর সত্যটি হলো, ব্রিটেনকে এখন আকস্মিকভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে না। যে বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের আগের প্রভাবের পতনকে সুস্পষ্ট করেছে, তা হলো গাজার যুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকা। গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ব্রিটেন ইসরাইলি নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে নিজেদের যুক্ত করেছে এবং গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি।

আর এখন ইরান যুদ্ধের সময় দেশটি যখন কথা বলার চেষ্টা করছে, তখন দেখছে যে, কেউ তা শুনছে না, গুরুত্ব দিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবৈধ যুদ্ধকে অন্ধভাবে সমর্থন দেওয়ার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে ব্রিটেন। বর্তমানে লেবাননে ইসরাইলের গণহত্যার বিরুদ্ধেও ব্রিটেনের কোনো বক্তব্য নেই।

ইসরাইল বরাবরের মতোই দাবি করছে, লেবাননে তাদের বোমা হামলা হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে করা হচ্ছে। কিন্তু ইসরাইল যেগুলোকে হাস্যকরভাবে ‘হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার’ বলছে, সেগুলো ছিল আসলে একটি শোকসভা, সেতু, অ্যাপার্টমেন্ট এবং বাড়িঘর যেখানে হামলায় গোটা পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ইসরাইলের দাবিকেই সমর্থন দিয়ে আসছে।

গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই ঐকমত্যের মূলে রয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আদর্শের দীর্ঘস্থায়ী ধারণা। এই ধারণা অনুযায়ী লেবানন, ফিলিস্তিন বা অন্য কোথাও দখলদারিত্ব বা আক্রমণের শিকার অশ্বেতাঙ্গদের সশস্ত্র প্রতিরোধ সেই দেশগুলোর বেসামরিক জনগণকে কোনো আইনি বা নৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার অযোগ্য করে তোলে। কিন্তু যখন তারা শ্বেতাঙ্গ ইউক্রেনীয় হয়, তখন বিষয়টি হয় ভিন্ন রকম।

স্টারমার ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ব্রিটেনের প্রকৃত জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ইসরাইল এবং ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাজ্যের সমর্থনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। গাজার গণহত্যায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলেল সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে ব্রিটেন। এ কারণে ব্রিটেন আজ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে।

কিন্তু দেশটির প্রকৃত জাতীয় জাতীয় স্বার্থ নিহিত রয়েছে ইসরাইলের পক্ষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ও অবৈধ যুদ্ধের কনিষ্ঠ অংশীদার এবং পোষ্য কুকুর হিসেবে নিজের ভূমিকার অবসান ঘটানোর মধ্যে। ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষ ইরানে শাসন পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য ইসরাইলের গণহত্যা অভিযানের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না। স্টারমার এবং লেবার পার্টি এই বিপজ্জনক জোটের সঙ্গে মারাত্মকভাবে জড়িয়ে পড়েছে, যার প্রতিক্রিয়ায় আগামী মাসের নির্বাচনে লেবার পার্টির পরাজয় সুনিশ্চিত।

মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর হয়তো লেবার পার্টি তাদের ব্লেয়ার-যুগের ভ্রান্ত ধারণা থেকে জেগে উঠবে এবং শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দেখানোর পথে ফিরে আসবে। অন্যদিকে, গ্রিন পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটসসহ অন্যান্য দল মধ্যপ্রাচ্যে এই চিরস্থায়ী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সৃষ্ট জনরোষের সুফল ভোগ করবে নির্বাচনে ভালো ফল করার মাধ্যমে।

কনজারভেটিভ ও রিফর্ম পার্টির সমর্থকদেরও এটা জেনে রাখা উচিত যে, তাদের দলীয় নেতারা একটি বৈশ্বিক উগ্র-ডানপন্থি অক্ষের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটনের ফ্যাসিস্ট এবং ইসরাইলে তার ফ্যাসিস্ট মিত্রদের সমর্থন করে আসছে, যারা অবৈধ যুদ্ধ ও গণহত্যায় জড়িত। কিন্তু ইসরাইল ও আমেরিকার সঙ্গে ব্রিটেনের এই অনৈতিক জোটের দ্রুতই অবসান দেখতে চায় দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী

পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি

নানামুখী সংকটে জনভোগান্তি স্বস্তি কবে-কীভাবে

ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন

শিক্ষাপ্রশাসন, মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব ও শিক্ষার মান

অফিস ছুটি এক দিন বাড়ানো কেন জরুরি

যুদ্ধবিরতি অচলাবস্থা ও শান্তির অনিশ্চিত পথ

দেয়াললিখনের আড়ালে কী বার্তা

ইরান যুদ্ধ : ভুল নাকি প্রকৃতির প্রতিশোধ

বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ

বিচার বিভাগ কেন স্বাধীন হয় না