হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

চট্টগ্রামের মানচিত্রে শহীদ জিয়ার পদচিহ্ন

জাহিদুল করিম কচি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চট্টগ্রামের নাম মিশে আছে এক অনন্য গৌরবে। আর এই চট্টগ্রামের প্রতিটি বাঁকে জড়িয়ে আছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে এখান থেকেই শুরু হয়েছিল তার বিদ্রোহের পথচলা, আর ১৯৮১ সালে এই শৈল শহরেই সমাপ্তি ঘটে তার কর্মময় জীবনের। চট্টগ্রামের ‘বিপ্লব উদ্যান’ থেকে সার্কিট হাউস, কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ‘রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়’—সবই আজ ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের রাজসাক্ষী।

বিপ্লব উদ্যান : প্রথম বিদ্রোহের স্ফুরণ

জিয়াউর রহমানের জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং তার অবদান শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামেরই প্রতীক। চট্টগ্রাম নগরের ২ নম্বর গেট এলাকায় অবস্থিত বিপ্লব উদ্যান তার অন্যতম স্মৃতিচিহ্ন। এটি কেবল একটি উদ্যান নয়, এটি একটি সাহসের প্রতীক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্দেশ অমান্য করে জিয়াউর রহমান এখানেই প্রথম প্রতিরোধের ডাক দেন। তার আগে ২৫ মার্চ রাতে তিনি পাকিস্তানি সেনা অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেজর জানজুয়াকে গ্রেপ্তার করেন এবং একই রাতে হত্যা করেন। এই জানজুয়া নিকৃষ্টভাবে বাঙালিদের দমনে হত্যায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। একই রাতে আরো অনেক শত্রুকে হত্যা করা হয়। পরে মেজর জিয়াউর অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্ব নেন। তিনি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার সৈনিকদের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বর্তমানে বিপ্লব উদ্যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষিত আছে।

কালুরঘাট ও স্বাধীনতা কমপ্লেক্স : স্বাধীনতার ঘোষণা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত এই বেতারকেন্দ্র থেকেই জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এখানেই তিনি ‘আই রিভোল্ট, উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ করেছিলেন। ২০০৬ সালে এই স্মৃতিকে অমর করতে কালুরঘাটে গড়ে তোলা হয় ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’, যা বর্তমানে ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’ বা ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত। ১৬ দশমিক ৩৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই পার্কে আহসান মঞ্জিল, জাতীয় সংসদ ভবন ও লালবাগ কেল্লার মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতিরূপ রয়েছে। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ ৭১ মিটার উঁচু স্বাধীনতা টাওয়ার, যেখান থেকে পুরো শহর ও কর্ণফুলী নদীর রূপ উপভোগ করা যায়।

জিয়া স্মৃতি জাদুঘর : জীবনের শেষ অধ্যায়

নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক পুরোনো সার্কিট হাউস। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এই ভবনেই এক সামরিক অভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার স্মৃতি রক্ষার্থে এটিকে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তর করা হয়। ১১৩ বছরের পুরোনো এই ভবনে এখনো জীবন্ত আছে জিয়াউর রহমানের ব্যবহার করা সেই কাঠের খাট। মেঝেতে লেগে আছে লাল রক্তের ছোপ। তার ব্যবহার করা সামগ্রী ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো সংরক্ষিত আছে, যা দর্শনার্থীদের ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

রাঙ্গুনিয়ার প্রথম কবর : নিভৃত এক স্মৃতি

জিয়াউর রহমান শাহাদাতবরণ করার পর বিদ্রোহীরা গোপনে তাকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার জিয়ানগর এলাকায় দাফন করেছিলেন। যদিও তিন দিন পর মরদেহ উত্তোলন করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, তবুও সেই স্থানটি ‘প্রথম কবর’ হিসেবে ঐতিহাসিক মর্যাদা পায়। ১৯৯৫ সালে এই স্থানের পাশে চার একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’। বর্তমানে এটি কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে এতিম ও দুস্থ শিশুদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিংয়ের মতো কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হয়।

অবহেলার ছায়া ও সত্যের জয়গান

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো বারবার বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যতবারই জনগণের কাঁধে বন্দুক রেখে ক্ষমতায় এসেছে, ততবারই জিয়াউর রহমানের স্মৃতিগুলোতে হায়েনার মতো হামলে পড়েছিল। বাদ যায়নি তাদের মন্ত্রী-এমপিদের অবাঞ্ছিত ও কটূক্তিমূলক মন্তব্যও। কোথাও সাইনবোর্ড থেকে নাম মুছে ফেলা হয়, কোথাও আবার আড়াল করে দিয়ে ইতিহাসকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টার মতো নানা অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে রাঙ্গুনিয়ার কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকে বর্তমানে ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’ নামটি আর দৃশ্যমান নেই। তাছাড়া সার্কিট হাউসকে ১৭ বছর ধরে জিম্মি করে রাখা হয়। জিয়া শিশুপার্ক উচ্ছেদ করে সেখানে অন্য নামে পার্ক করা হয়। এতে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায় জিয়া স্মৃতি জাদুঘর। তবে মানুষের হৃদয় থেকে কি জিয়াউর রহমানকে কখনো মুছে ফেলা সম্ভব? তারা তো জানত না, কোনো স্থাপনার নামফলক সরিয়ে দিলেই জনমানস থেকে ইতিহাসের সত্যকে মুছে ফেলা অসম্ভব।

চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গুনিয়া—শহীদ জিয়ার এই ‘ঐতিহাসিক রোড ম্যাপ’ বাংলাদেশের জন্ম ও পুনর্গঠনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই স্মৃতিচিহ্নগুলো কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংগ্রামের অবিনাশী স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

লেখক : আবাসিক সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ

‘হিন্দু শাসনই ভারত চালায়’

গণমাধ্যমের নৈতিক সংকট ও দায়বদ্ধতা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান : বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

শীতনিদ্রা থেকে বেরিয়ে আসছে সম্পাদক পরিষদ

বাঙালির ‘অ-যোদ্ধা’ ও ‘নারীসুলভ’ তকমার বিরুদ্ধে লড়াই

প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচন গণতন্ত্রের জয় নয়

কোরবানির চামড়াশিল্পে সিন্ডিকেটের থাবা

দক্ষিণ এশিয়া কেন ইইউ মতো হতে পারবে না

রেলওয়ের উন্নয়নে আধুনিকতা উপেক্ষিত

পশ্চিম তীর থেকে পশ্চিমবঙ্গ