ভারতের মিডিয়া ‘দ্য উইক’ এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদকে প্রশ্ন রেখেছে, ‘এনসিপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ কি ধর্মরাষ্ট্রে পরিণত হবে?’ আল জাজিরার সাংবাদিক নিবাসন জৈন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সরকারের প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ঘুরেফিরে প্রশ্ন করছেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ সেকুলারিজম হারাল কি না!’ ১৭ মাস ধরে ভারতের মিডিয়া ও সাংবাদিকদের একই প্রশ্ন। ভারতের রাজ্যসভার সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে এনসিপি-জামায়াত জিতলে বুঝতে হবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি।’
অথচ ২০১৪ সালে জনপ্রিয় ভোটে জিতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। গুজরাটের মুসলিম গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের স্বশাসন বাতিল করে একে সরাসরি দিল্লির শাসনের অধীনে এনে প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরির আদলে মুসলিম নিধন করা হয়েছে সেখানে। উত্তর প্রদেশে মুসলিম নাগরিকদের গৃহ বুলডোজার দিয়ে একে একে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন শিবসেনার নেতা আদিত্য যোগী। ফ্রিজে গরুর গোশত রাখা কিংবা ট্রাকে করে গরু নিয়ে যাওয়ার অপরাধে মুসলমানদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বোরকা পরা মুসলিম নারীর গায়ে হোলির রঙ ছুড়ে তাকে দিয়ে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিইয়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। হিন্দুত্ববাদীদের হাতে মুসলিম নিধন ও নির্যাতন ঢেকে রাখতে প্রচারণা মুভি ‘কাশ্মীর ফাইলস’, ‘কেরালা ফাইলস’ ও ‘কলকাতা ফাইলস’ মুক্তি দিয়ে মুসলিমবিদ্বেষের আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের মোগল শাসনের গল্প হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিতে দেখে মুসলিম ঘৃণামূলক ‘ছাব্বা’ মুভি তৈরি করে মোগল শাসকের সমাধি ভাঙতে হিন্দুদঙ্গলকে উসকানি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানের মুসলমান হত্যাই যথেষ্ট নয়; ইতিহাসের মোগল মুসলমানদের কচুকাটা করে ‘ছাব্বা’ ছবির পরিচালক মুসলিম হত্যার ১০১টি কায়দা দেখিয়েছে চলচ্চিত্রের পর্দায়। ঘৃণা যদি একটি শিল্প হয়, ভারতের এসব চলচ্চিত্র শিল্পী তার মায়েস্ত্রো।
বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির নির্মাণ করেছেন নরেন্দ্র মোদি; ভারতের ‘সেকুলার’ সংস্কৃতির মামা ও খালারা সেখানে গিয়ে ভক্তিতে থরথর করে কেঁপেছেন। প্রায়ই ভারতের ইনসমনিক হিন্দুত্ববাদী বৃদ্ধেরা স্বপ্ন দেখেন, প্রাচীন মসজিদের নিচে নানারকম মন্দিরের উপস্থিতির। অমনি তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যত হয় শিবসেনা ও বজরং দল। প্রাচীন মাজার ভাঙার ক্ষেত্রেও ‘জয় শ্রীরাম’ রাষ্ট্রের ভক্তেরা তাদের মুসলিমবিদ্বেষ উগরে দিয়েছে। নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বৃত্তের কেউ এর প্রতিবাদ করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ৮০ বছরের শত্রু চিহ্নিতকরণের ফরমুলায় তাদের ‘পাকিস্তানের তোতা’ ডেকে ‘পাকিস্তানে চইলা যাইতে’ বলা হয়। গদি মিডিয়ার পোষা কাকেরা তখন একযোগে চেঁচায়—‘পা-পা-পা-পাকিস্তান।’
টডের তরবারিতে মুসলমানকে কচুকাটা করার হিন্দুত্ববাদী জিঘাংসা ভারতের মিডিয়ার মূল সুর হয়ে উঠেছে; সাংবাদিকেরা হিন্দুভারত উদয়ের আনন্দে কপালে লম্বা লাল তিলক এঁকে শিকারি সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে; ফেক নিউজ আর প্রোপাগান্ডার গন্ধমাদন পর্বত বয়ে নিয়ে বেড়াতে একেকজন তারকা সাংবাদিক হয়ে উঠেছে; একেকজন রামভক্ত হনুমান।
মোদি যখন ছাইমাখা নাঙ্গা সাধুদের ষষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন, গদি মিডিয়ার সাংবাদিকেরা তখন বিদ্বেষের নাঙ্গা নৃত্য করে অপসাংবাদিকতার ছাই মেখে।
এখন প্রশ্ন জাগছে—ভারতের সাংবাদিক ও মিডিয়া নিজেই যখন ধর্মরাষ্ট্রের ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে অখণ্ড ভারতের লাখ টাকার স্বপ্ন দেখছে, তখন বাংলাদেশে সেকুলারিজমের হারিয়ে যাওয়ার হাহুতাশে হাপুস নয়নে কাঁদছে কেন! নিজে যখন কাদাখোঁচা পাখির মতো ধর্মরাষ্ট্রের পোকা খেয়ে বাঁচছে, তখন বাংলাদেশ ‘ধর্মরাষ্ট্র’ হয়ে যাবে কি না—এই দুশ্চিন্তায় পালকি শর্মা, নিবাসন, অর্ণব গোস্বামী, দীপ হালদারের ঘুম আসছে না কেন! শতছিদ্র ঝাঁঝর কর্তৃক সুচের পেছনের ছিদ্র খোঁজার মতো যেন এই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি।
এই প্রশ্নের উত্তর দীপ হালদারের ‘লস্ট হাভেলিজ’ গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায়। ঠাকুরদার পিতলের ঘড়া দেখিয়ে তাতে ‘জমিদার বংশের মিথ’ রচনা; একটা ইটের দালানের স্তূপ দেখিয়ে সেটাকে হাভেলি বলে বর্ণনা করার যে ঠাকুরমার ঝুলি; একটা নকশা করা চৌকি দেখিয়ে তা নিয়ে ‘পালঙ্ক’ চিত্রনাট্য রচনা—এসবই ব্রিটিশের পিয়ন-চাপরাশি-অর্ডারলি-জুতো পালিশকারীর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রাতারাতি জমিদারি পাওয়া আর পঞ্চাশের দশকে তা হারিয়ে ফেলার গল্প। ১৯৪৭ সালের বাস্তবতায় অনেক সম্পন্ন মুসলমান তাদের দালান ফেলে অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিল। এরপর শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে আবার তারা জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ফেলে আসা দালানকে ‘লস্ট হাভেলি’ বলে তাদের নাতি-নাতনি বই লেখে না; ফেলে আসা নকশাদার চারপায়ীকে ‘পালঙ্ক’ বলে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখে ফেলে না।
সুলতানি, মোগল ও নবাবি আমলে পূর্ব বাংলার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সম্পন্ন কৃষকের যে জমি ছিল, তা কেড়ে নিয়ে ব্রিটিশ সাহেবেরা তাদের চাকর-বাকরদের দিয়েছিল। সেই জমিজমা ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে আবার কৃষকের কাছে ফিরে গেছে। কিন্তু ১৭৯৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সাহেবের চাকরবাকরের যে লটারি পাওয়া জমিদারের জীবন, আজ সেই জামবাটি নেই, গরম দুধও নেই; আছে কেবল ‘ফুঁ’টা।
ভারতের সাংবাদিক ও মিডিয়া সেই ‘ফুঁ’ দিতে আসে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের কিছু নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের ছেলেমেয়ে, যাদের দাদু-নানা জমিদারের বাড়ির চাকরবাকর ছিল, তারা শিখেছে পুজোর আরতি দেওয়া সেকুলার; কিন্তু নামাজ পড়া বড্ড মুছুম্মানি। জগন্নাথ হলে ৭৪টি মণ্ডপ বড্ড সেকুলার; আর টিএসসিতে কাওয়ালি বড্ড মুছুম্মানি। এদের ওপর ভর করে ভারত তার হারানো জমিদারি ফেরত পেতে চায়। এ কারণে তার ধ্যাড়ধেড়ে হিন্দুত্ববাদ বড্ড প্রগতিশীলতার অথোরিটি নিয়ে বড় মুখ করে প্রশ্ন করে—‘আমার দাদুর সেকুলারিজমের বদনাটি হারিয়ে গেল শেষে; হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।’
ইতিহাসে খুঁজলে দেখবেন, সুলতানি-মোগল-নবাবি আমলে হিন্দু-মুসলিমের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল পূর্ববঙ্গে। ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হিন্দু জমিদার আর বঙ্কিম চন্দ্রের মতো রেসিস্ট কর্মকর্তাদের নিগ্রহ-নিপীড়ন আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার ব্যাকরণ সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ব্যাকরণ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশকে তার শেকড়ে ফিরতে হবে; হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সম্প্রীতিময় সমাজ গড়তে হবে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ঘৃণা-বিদ্বেষ আর মিডিয়ার গেরুয়া ফ্রেমিংয়ের উসকানি থেকে দূরে থাকতে হবে।
জার্মানির খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল প্রমাণ করেছে, কী করে সামাজিক গণতন্ত্র, কল্যাণরাষ্ট্র ও সাম্যচিন্তার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া যায়। প্রত্যেকটি নাগরিকের মর্যাদার জীবন নিশ্চিত করতে না পারলে সংবিধান, রাজনীতি, প্রতিদিনের দলান্ধ কচকচানির আর কোনো অর্থ থাকে না। বাংলাদেশকে আসলে মানবিক রাষ্ট্র হতে হবে। ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলা দানব রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অতন্দ্র থাকতে হবে।