সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলায়, সমাজ বদলায়, রাষ্ট্র বদলায়—কিন্তু কিছু পরিবর্তন আছে, যা সভ্যতার অগ্রগতি নয়; বরং মানবিক পতনের লক্ষণ। আজ চারদিকে তাকালে আমার মনে হয়, আমরা যেন এক ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের যুগের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছি। বাহ্যিক উন্নয়ন, প্রযুক্তির বিস্ময়, অট্টালিকার ঝলকানি—সবকিছুর আড়ালে মানুষের ভেতরের আলো যেন ক্রমেই নিভে যাচ্ছে।
আমার সোনার বাংলাদেশ আজ যেন এক গভীর সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। শুধু দুর্নীতি, ঘুস, সন্ত্রাস কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নয়—আমি একে বলি মানবিকতার ক্যানসার। কারণ এই অসুখ শরীরের নয়, আত্মার। এই অসুখ মানুষের বিবেককে ধ্বংস করে দেয়। মানুষের ভেতরের মমতা, লজ্জা, দায়বোধ, সহমর্মিতা—সবকিছুকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়।
অনেকদিন আগে শ্রদ্ধেয় আব্দুল্লাহ আল মামুন একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন— ‘সুবচন নির্বাসনে’। তখন হয়তো আমরা নাটকটিকে সমাজবাস্তবতার শিল্পরূপ হিসেবে দেখেছি। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই নামটি যেন আমাদের বর্তমান সময়ের নির্মম দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন শুধু সুবচনই নির্বাসনে নয়—নির্বাসনে গেছে মূল্যবোধ, সততা, ন্যায়বিচার, শ্রদ্ধা, ভক্তি, মমত্ববোধ, এমনকি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হত্যা, গুম, ধর্ষণ, প্রতারণা, নিষ্ঠুরতা আর অমানবিকতার অসংখ্য সংবাদ। প্রতিদিন যেন আমরা একটু একটু করে সহিংসতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। এ এক ভয়ংকর লক্ষণ। কারণ যে সমাজ অন্যায়ের সংবাদে আর কেঁপে ওঠে না, যে সমাজ নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সহাবস্থান করতে শিখে যায়—সে সমাজ ধীরে ধীরে আত্মাহীন হয়ে পড়ে।
কিন্তু সবকিছুর চেয়ে আমাকে সবচেয়ে বেশি শিউরে তোলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা। পাঁচ বছরের শিশু। ছয় বছরের শিশু। সাত বছরের অবুঝ প্রাণ। এরা তো পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল সত্তা। ওদের চোখে থাকে বিস্ময়, মনে থাকে কৌতূহল, মুখে থাকে অকারণ হাসি। তারা খেলতে চায়, গল্প শুনতে চায়, মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়তে চায়। পৃথিবীকে তারা বিশ্বাস করতে শেখে বড়দের মুখ দেখে।
আমাদের সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে—সব শিশু ফেরেশতার মতো পবিত্র। সত্যিই তো, ওদের ভেতরে কোনো পাপ নেই, কোনো কপটতা নেই, কোনো হিংসা নেই। অথচ সেই নিষ্পাপ শিশুর দিকেই কিছু বিকৃত মানুষ হায়েনার মতো কুদৃষ্টি দেয়। যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্য একটি শিশুর জীবন, মন, ভবিষ্যৎ—সবকিছু ধ্বংস করে দিতে তাদের একটুও দ্বিধা হয় না। মানুষের মানসিক বিকৃতি কত ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছালে একটি শিশু পর্যন্ত নিরাপদ থাকে না!
পল্লবীর সেই শিশুটির কথা মনে পড়লে এখনো বুকের ভেতর কষ্ট জমে ওঠে। আমি বারবার ভাবি—সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে শিশুটি কি কাউকে ডাকতে পেরেছিল? মায়ের নাম ধরে কাঁদতে পেরেছিল? নাকি আতঙ্কে শুধু চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল? একটি অবুঝ শিশুর শেষ আতঙ্ক কল্পনা করতেও আমার হৃদয় ভেঙে যায়।
সেই রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই যেন সেই নিষ্ঠুর দৃশ্য কল্পনায় ফিরে এসেছে। আমার নিজের নাতনির মুখ মনে পড়েছে। মনে হয়েছে—এই দেশের প্রতিটি শিশুই তো আমাদের সন্তান, আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; সেটি সমগ্র সমাজের ব্যর্থতার আর্তনাদ।
আজ আমরা উন্নয়নের অনেক কথা বলি। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো—সবকিছু নিয়েই আমাদের গর্ব। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হচ্ছে—কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয়, বরং সেই সমাজ কতটা নিরাপদ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক—তা দিয়ে বিচার করা হয়। যে সমাজ তার শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, নারীদের সম্মান রক্ষা করতে পারে না, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে না—সে সমাজ বাহ্যিকভাবে যত উন্নতই হোক, ভেতরে ভেতরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
আমি এখনো বিশ্বাস করি—মানুষের ভেতরের আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। এখনো এই দেশে অসংখ্য সৎ মানুষ আছেন, মমতাময় মানুষ আছেন, প্রতিবাদী মানুষ আছেন। এখনো মায়েরা সন্তানকে ভালোবাসতে শেখান, শিক্ষকরা মানবিকতার কথা বলেন, শিল্পীরা সত্য উচ্চারণ করেন। তাই আশার জায়গাটুকু এখনো বেঁচে আছে।
আমাদের ফিরে যেতে হবে মানবিকতার কাছে। পরিবারে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, রাষ্ট্রচিন্তায়—সব জায়গায় নতুন করে মূল্যবোধের চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ একটি সভ্য সমাজ শুধু আইন দিয়ে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে বিবেক, সহমর্মিতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধের ওপর।
আমি আজও বিশ্বাস করি—এই অন্ধকারের মধ্যেও আলো সম্ভব। কারণ মানুষ এখনো সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। যদিও সারাক্ষণ প্রশ্ন করি এ কোন দেশে, কোন সমাজে বাস করছি আমরা?
চারদিকে তাকালে আজ মনে হয়—মানুষ যেন ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকেই নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলছে। শিশু, কিশোরী, গৃহবধূ—কেউ রেহাই পাচ্ছে না। প্রতিদিন সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায় নতুন কোনো ধর্ষণ, গণধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার সংবাদ। শব্দগুলো এত বেশি শুনতে শুনতে আমরা যেন আতঙ্কের মধ্যেও অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। অথচ কোনো সভ্য সমাজের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর সংকেত আর হতে পারে না।
আমার বারবার মনে পড়ে একসময়ের কথা। তখন বখাটেদের প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দিলে কিশোরীদের মুখে এসিড নিক্ষেপ করা হতো। কত সুন্দর মুখ, কত স্বপ্নময় জীবন, কত পরিবারের আনন্দ—এক মুহূর্তে ঝলসে যেত। সেই বিভীষিকা শুধু একজন নারীর মুখ পোড়াতো না; তার আত্মবিশ্বাস, ভবিষ্যৎ, স্বাভাবিক জীবনযাপন—সবকিছুকে ধ্বংস করে দিত।
সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের অত্যন্ত জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’-এ প্রখ্যাত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও অসামান্য উপস্থাপক ফজলে লোহানী একটি হৃদয়বিদারক প্রতিবেদন প্রচার করেছিলেন। অনুষ্ঠানে এসিড-সন্ত্রাসের শিকার এক ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হলে সারা দেশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানুষ প্রথমবার এত গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল—একটি অপরাধ শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো সমাজকেই বিকলাঙ্গ করে দেয়। গণমাধ্যম তখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; সমাজের বিবেক জাগ্রত করারও এক শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল।
পরবর্তী সময়ে কঠোর আইন ও শাস্তির ব্যবস্থা হওয়ায় এসিড-সন্ত্রাস অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু যারা ঝলসে গিয়েছিল—তাদের জীবনের ক্ষত কি আর কোনোদিন মুছে গেছে? অনেক কিশোরী হয়তো আজও আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। সমাজ হয়তো ধীরে ধীরে ঘটনা ভুলে যায়, কিন্তু ভুক্তভোগীর জীবন থেকে সেই দগ্ধ স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
আজ মনে হয়, আমরা যেন আরো ভয়াবহ এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। নিষ্ঠুরতার রূপ আরো বীভৎস, আরো পৈশাচিক হয়ে উঠেছে। শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন, গণধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা—সবকিছু মিলিয়ে সমাজের ভেতরের অন্ধকার যেন আরো উন্মোচিত হচ্ছে।
সাংবাদিক জিমি আমীর এক পোস্টে গভীর বেদনায় লিখেছিলেন—
‘শিশুর প্রতি এই পাশবিক নির্যাতনে কার কাছে বিচার চাইবো? আল্লাহ বিচার করবেন।’
এই বাক্য শুধু একটি মানুষের হতাশা নয়; এটি যেন আজ অসংখ্য বিবেকবান মানুষের আর্তনাদ। যখন মানুষ বিচারব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং নৈতিক অবস্থানের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন সেই সমাজ গভীর সংকটে পড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকব?
একটি শিশুর কান্না, একটি নারীর আর্তচিৎকার, একটি পরিবারের ধ্বংস—এসব কি কেবল খবরের কাগজের কয়েকটি লাইন হয়ে থাকবে? সমাজ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়াতে না পারে, তবে সেই নীরবতাও একধরনের অপরাধ হয়ে যায়।
আমার আরো মনে পড়ে ডাক্তার ইকবালের সেই বহুল আলোচিত ঘটনার কথা। পরকীয়া সম্পর্কে বাধা দেওয়ায় তিনি নিজের স্ত্রীকে হত্যা করেছিলেন। আদালতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং তার ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়। তখন কিছু বিবেকহীন মানুষ তার শাস্তি স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন—খুনিদের কোনো ক্ষমা নেই। যথাসময়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছিল।
আজ সেই ঘটনাগুলো মনে পড়ায় বারবার ভাবি—রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান কত গুরুত্বপূর্ণ। আইন শুধু কাগজে থাকলে হয় না; অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে—এই বিশ্বাস সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কারণ বিচারহীনতা অপরাধকে উৎসাহিত করে, আর ন্যায়বিচার মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথাও আজ খুব মনে পড়ে। নয় মাসের সেই ভয়াবহ সময়ে শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই যুদ্ধ করেননি; অসংখ্য মা-বোন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কত পরিবার ভেঙে গেছে, কত নারীর জীবন ক্ষতবিক্ষত হয়েছে—তার সম্পূর্ণ ইতিহাস হয়তো কখনো লেখা শেষ হবে না। তবু সেই সময় মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা গভীর রাতে গোপনে বাড়িতে এসে মা-বোনদের বলতেন— ‘আর কটা দিন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এই বাক্যের ভেতরে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, নিরাপত্তার স্বপ্ন, মর্যাদার স্বপ্ন।
দেশ স্বাধীন হলো। যুদ্ধশেষে বীরেরা ফিরে এলো। মানুষ নতুন করে আশা করতে শিখলো। মনে হয়েছিল—এবার আর কোনো হানাদার নেই, কোনো বিদেশি শাসক নেই; এখন এই দেশের শিশু-কিশোরেরা স্বাধীন আকাশের নিচে নিরাপদে খেলবে, মায়েরা নিশ্চিন্তে সন্তান বড় করবে, নারীরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচবে।
আমার ভাই আম্মাকে বলতেন—
‘দেশ স্বাধীন হলে দরজা খুলে ঘুমাবেন শান্তিতে।’
আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি—
সেই শান্তি কি সত্যিই এসেছে?
আমরা কি সত্যিই নিরাপদে আছি?
সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো—যে সমাজে মানুষ ভয় নিয়ে বাঁচে, যে সমাজে নারী ও শিশু নিরাপদ নয়, যে সমাজে ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতা বড় হয়ে ওঠে, সেই সমাজ ধীরে ধীরে তার মানবিক ভিত্তি হারাতে থাকে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সেতু, রাস্তা বা অট্টালিকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই, যখন একজন শিশু নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, একজন নারী মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে এবং একজন সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা রাখতে পারে।
আমি এখনো আশা হারাইনি। কারণ এই দেশের মাটি এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহন করে। এখনো অসংখ্য মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, প্রতিবাদ করেন, মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ান। হয়তো একদিন আমরা আবার এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব— যেখানে শিশুর হাসি ভয়হীন হবে, নারীর পথচলা নিরাপদ হবে, মানুষ মানুষকে আর ভয় পাবে না। দেশের বর্তমান বাস্তবতায়, গরিব অসহায় মা-বাবা—যাদের জীবন প্রতিদিনই দারিদ্র্যের নির্মম কশাঘাতে ক্ষতবিক্ষত—তারা শেষ আশ্রয় হিসেবে সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করেন। দু’মুঠো ভাত, একটু নিরাপদ ভবিষ্যৎ, আর ধর্মীয় শিক্ষার ভরসায় তারা বুকের ভেতর একফালি স্বপ্ন লালন করেন।
একজন দিনমজুর বাবা, একজন বিধবা মা, কিংবা কোনো শ্রমজীবী পরিবার মনে করেন—সন্তান অন্তত আলোর পথে যাবে, মানুষ হবে, ধর্মভীরু হবে, সমাজে সম্মানের সঙ্গে বাঁচবে। কিন্তু কত ভয়ংকর নিষ্ঠুর বাস্তবতা—অনেক ক্ষেত্রে সেই বিশ্বাসের আড়ালেই ওঁৎ পেতে থাকে হায়েনার মতো কিছু মানুষরূপী জানোয়ার।
পবিত্রতার পোশাক পরে, ধর্মের ভাষা মুখে নিয়ে, তারা নিষ্পাপ শিশুদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। যখন সেই শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় হাসপাতালের বেডে কাতরায়, তখন একজন অসহায় মা বুক চাপড়ে ডাক্তারকে বলেন—
‘এর চেয়ে মরে গেলে ভালো হতো…’
এই একটি বাক্যের ভেতরে শুধু এক মায়ের কান্না নেই—আছে একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, একটি সমাজের নৈতিক পতন, একটি সভ্যতার লজ্জা।
আমি বহু বছর গণমাধ্যমে কাজ করেছি। মানুষের আনন্দ দেখেছি, বেদনা দেখেছি, যুদ্ধ দেখেছি, দুর্ভিক্ষ দেখেছি, স্বাধীনতার উল্লাস দেখেছি। কিন্তু আজকের এই সমাজে শিশু নির্যাতনের যে বীভৎসতা দেখি, তা আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। কারণ একটি সমাজ কতটা অসুস্থ হয়ে গেলে শিশুর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারে না? কতটা মূল্যবোধহীন হয়ে গেলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও শিশুর আর্তনাদ শোনা যায়?
পিশাচ সেই হুজুরদের কি বিচার হয়েছে? হয়তো কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হইচই হয়। কিছু টকশো, কিছু মানববন্ধন, কিছু বিবৃতি। তারপর সব স্তব্ধ। খেলারামেরা খেলে যায়। ক্ষমতা, প্রভাব, রাজনৈতিক ছত্রছায়া আর সামাজিক ভণ্ডামির আড়ালে অপরাধীরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়।
আর আমরা?
আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাই।
এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
আরো মনে পড়ে নব্বই দশকের সেই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের কথা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কুলাঙ্গার ছাত্র ধর্ষণকে বিকৃত গর্বে ‘সেঞ্চুরি’ বলে ঘোষণা করেছিল। কী ভয়াবহ মানসিক অবক্ষয়! ক্রিকেটের সেঞ্চুরি নয়—বাংলাদেশের মাটিতে নারীর সম্ভ্রমহানিকে সে বিজয়ের ভাষায় উচ্চারণ করেছিল।
সেদিন যদি সেই কুলাঙ্গার মানিককে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির আওতায় আনা যেত, তাহলে হয়তো পরবর্তী কয়েক দশকে অসংখ্য শিশু, কিশোরী, নারী এমন পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতো না। অপরাধ যখন শাস্তিহীন থাকে, তখন তা সমাজে সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়—দায়মুক্তির সংস্কৃতি। যেখানে অপরাধী জানে, শেষ পর্যন্ত তার কিছুই হবে না। আর সেই বিশ্বাসই অপরাধকে আরো বেপরোয়া করে তোলে।
হায় সভ্যতা!
হায় স্বাধীনতা!
যে স্বাধীনতার জন্য লাখো মানুষ রক্ত দিল, মা-বোন সম্ভ্রম হারালেন, সেই স্বাধীন দেশে আজ একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না! আইয়ামে জাহেলিয়াতের বর্বরতাকেও যেন হার মানায় এই কদর্যতা।
আজ আমরা দেখি—
মানুষ আন্দোলন করে, শাসকের ভিত কাঁপিয়ে দেয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু ধর্ষিত, নির্যাতিত, রক্তাক্ত শিশুর আর্তনাদে সমাজের এক বড় অংশ নীরব দর্শকে পরিণত হয়। এই নীরবতাও এক ধরনের অপরাধ।
আজ বারবার মনে পড়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নীতির প্রশ্নে অনড় ছিলেন। খুনির কোনো ক্ষমা নেই—এই বার্তাই তিনি জাতিকে দিয়েছিলেন। আইনের শাসনের প্রশ্নে তিনি আপস করেননি।
আজ তাই সেই প্রশ্নই আবার ফিরে আসে—
রাষ্ট্র কি অপরাধীর পাশে দাঁড়াবে, নাকি নির্যাতিত মানুষের পাশে?
সভ্য সমাজ কি ধর্ষকের মানবাধিকার নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হবে, নাকি ধর্ষিত শিশুর জীবনের ধ্বংসস্তূপ নিয়ে?
সব নির্যাতিত শিশু-কিশোরীর মা-বাবার আকুল আর্তি আজ একটাই—
দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। বিচারহীনতার অবসান চাই।
রাষ্ট্র যেন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়—এই বাংলার মাটিতে শিশুনির্যাতন, ধর্ষণ, নারী নিপীড়নের কোনো স্থান নেই। কারণ একটি জাতির প্রকৃত সভ্যতা পরিমাপ করা হয় তার শিশু, নারী ও দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে। যে সমাজ তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অট্টালিকা কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অহংকার করলেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।
আমি আজ গভীর বেদনা নিয়ে শুধু এটুকুই বলতে চাই—
বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক পুনর্জাগরণ, পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন, সামাজিক জবাবদিহি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
নতুবা ইতিহাস একদিন আমাদের ক্ষমা করবে না। আজ সব নির্যাতিত শিশু-কিশোরীর মা-বাবার আকুল আর্তি একটাই—
ধর্ষক ও শিশুনির্যাতকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করুক। যে অপরাধ একটি শিশুর জীবন ধ্বংস করে দেয়, সেই অপরাধের বিচারও হতে হবে এমন দৃষ্টান্তমূলক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পিশাচ এই নৃশংসতার সাহস না পায়।
লেখক : সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন