হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

টেকসই উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনের চাবিকাঠি

শিক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি

সুলতান মাহমুদ সরকার

একটি বীজ মাটিতে পড়লে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরই শুধু ফল দেয়। শিক্ষাও ঠিক তেমন—এর ফল তাৎক্ষণিক নয়, তবু এর শিকড় একটি জাতির অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত। শিক্ষা শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, এটি মানবিক মর্যাদার ভিত্তি, অর্থনৈতিক মুক্তির পথ এবং সামাজিক রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু শাসন নয়, নাগরিকের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পরিবেশও তৈরি করা। আর সেই দায়িত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন হলো বার্ষিক বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের অগ্রাধিকার। অথচ বাজেটের পর বাজেটে শিক্ষা খাত এমন একটি অবস্থানে থেকে যাচ্ছে, যা দেখে মনে হয়, রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নয়, বর্তমান ব্যয়সংকোচনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, উন্নয়ন মানে শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি নয়—উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতার বিকাশ। আর সেই সক্ষমতা আসে শিক্ষা থেকে। একটি শিক্ষিত সমাজ শুধু বেশি উৎপাদন করে না, সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়সংগত পরিবর্তন আনার ক্ষমতাও রাখে। এই অনুধাবন থেকেই বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিক্ষায় যে পরিমাণ বিনিয়োগ করে, তা শুধু নীতির অংশ নয়; বরং এটি তাদের জাতীয় দর্শনের প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এই দর্শন এখনো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

ইতিহাস সাক্ষী যে, যে জাতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, সে জাতি পরিণতিতে অপরাজেয় হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত জাপান মাত্র কয়েক দশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল—এর মূল রহস্য ছিল শিক্ষায় তাদের নিরন্তর বিনিয়োগ। দক্ষিণ কোরিয়া ষাটের দশকে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা একটি কৃষিভিত্তিক দেশ ছিল। আজ সেই দেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির শীর্ষে। এই রূপান্তরের চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষা খাতে তাদের ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। দেশটি আজ জিডিপির প্রায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি শিক্ষিত, সচেতন ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আজকের বাস্তবতা হতাশাজনক।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের জনশক্তি। বিশাল এই জনগোষ্ঠী যদি দক্ষ হয়, তাহলে এটি হয়ে ওঠে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’—এটি এমন এক সুযোগ, যা বিশ্বের অনেক বৃদ্ধ জনমিতির দেশ পাচ্ছে না। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আমূল সংস্কার দরকার। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা প্রতিবেশী ভারতের তুলনায়ও অনেক কম। শিক্ষিত বেকারের উদ্বেগজনক সংখ্যা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতার সরাসরি প্রতিফলন। শিক্ষা যখন কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার পরিবর্তে সনদের কারখানায় পরিণত হয়, তখন বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। তাই বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারও সমানভাবে জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের বাংলাদেশি কর্মীরা বেশির ভাগ সময় অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে যান এবং তুলনামূলক কম মজুরি পান। অথচ ফিলিপাইন—যে দেশের জিডিপি একসময় আমাদের কাছাকাছি ছিল, আজ তারা দক্ষ নার্স, ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রযুক্তিবিদ রপ্তানি করে বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এই রূপান্তরের চালিকাশক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন সম্ভব কিন্তু তার জন্য শিক্ষা বাজেটকে প্রতীকী সংখ্যা থেকে বের করে কৌশলগত বিনিয়োগে পরিণত করতে হবে। রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে জ্ঞান ও দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর—এটিই আগামীর বাংলাদেশের টেকসই পথ।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উন্নত বিশ্বের শিক্ষা বরাদ্দের সঙ্গে তুলনাটি অপ্রিয় হলেও জরুরি। ফিনল্যান্ড জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে এবং বিশ্বের সেরা শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বারবার স্বীকৃতি পেয়েছে। মালয়েশিয়া করে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, ভারত এখন ৩ দশমিক ৫ শতাংশের ঘরে। ইউনেসকো দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলে আসছে। আর বাংলাদেশ? মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষায় জিডিপির অনুপাতে ব্যয়ের বিচারে বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৫তম। এই তুলনা শুধু সংখ্যার নয়, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যেরও। ফিনল্যান্ড মনে করে প্রতিটি শিশু মেধাবী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই মেধাকে বিকশিত করার পরিবেশ তৈরি করা। বাংলাদেশে শিক্ষাকে এখনো অনেকাংশে ব্যক্তির একার দায় হিসেবে দেখা হয়, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষায় মোট বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ রাখা হয়েছে, যা সংখ্যার বিচারে আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

বিগত বছরগুলোর চিত্র আরো উদ্বেগজনক। ২০১৯-২০ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এরপর ২০২২-২৩-এ তা দাঁড়ায় ১২ শতাংশে। ২০২৪-২৫-এ ছিল ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে এই পরিসংখ্যান প্রায় স্থবির—গত পাঁচ বছরে মোট বাজেটের অনুপাতে শিক্ষা খাত মাত্র শূন্য দশমিক কয়েক শতাংশ পয়েন্টের ওঠানামার মধ্যে আটকে রয়েছে। এর মানে হলো, শিক্ষার নামে প্রতিবছর কিছুটা বরাদ্দ বাড়ে কিন্তু তা মুদ্রাস্ফীতি, শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যোগের তুলনায় প্রকৃত অর্থে বাড়ে না। শিক্ষা খাতে বরাদ্দের একটি বড় অংশ শিক্ষকদের বেতন-ভাতায় চলে যায়। প্রকৃত গুণমান উন্নয়নে—গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অবকাঠামোয় বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। এছাড়া এমপিওভুক্তি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য শিক্ষা বাজেটের কার্যকারিতাকে গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ণ করে।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—১৯ হাজারেরও বেশি কওমি মাদরাসায় পড়া প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী আজও মূল বাজেট বরাদ্দের বাইরে। দাওরায়ে হাদিসের সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এই বিশাল শিক্ষার্থী গোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের কোনো কার্যকর পথ তৈরি হয়নি। জাতীয় শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে তাদের সংযুক্ত না করলে সামাজিক বিভাজন দীর্ঘ মেয়াদে আরো গভীর হবে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতি ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে দীর্ঘ মেয়াদে ১০ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রতিদান আসে। এই হিসাব মাথায় রাখলে শিক্ষায় বরাদ্দ কমানো আর ভবিষ্যৎ থেকে ঋণ নেওয়া একই কথা।

আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতকে তাই একটি রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা দরকার। জিডিপির অন্তত ৩ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা উচিত এবং ৫ বছরের মধ্যে ৪ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির উৎস হিসেবে গড়ে তোলা না হলে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রাথমিক শিক্ষায় গুণমান উন্নয়ন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার অবকাঠামো নিশ্চিত করাও একই গুরুত্বের দাবিদার। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্নের কথা বলা হয়, তা বাস্তবে রূপ নেবে শুধু তখনই, যখন শিক্ষায় বিনিয়োগ সত্যিকার অর্থে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হবে। আগামী দশকের বাংলাদেশ কতটা সমৃদ্ধ হবে, কতটা ন্যায়সংগত হবে, কতটা আত্মনির্ভরশীল হবে—তার নির্ধারক সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারণ করবে এবারের বাজেটে। শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখার এই মানসিক ও নীতিগত রূপান্তরই হবে টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত চাবিকাঠি।

লেখক : এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

অপরাজেয় ইরান ও মুসলিম নেতৃত্ব

নদী-জলাশয় বাঁচলেই ঢাকা বাঁচবে

একটি তপ্ত কেদারা এবং ডিজিটাল ফেতনা

শাপলার বেদনাবিধুর স্মৃতি ও নিভৃত বিচারের বাণী

গবেষণা হতে হবে বাস্তব চাহিদাভিত্তিক

সৌদির অর্থনীতি ঘায়েল করতেই ওপেক ছাড়ছে আমিরাত?

রাজনৈতিক দলের গড়ে ওঠা ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কথামালা

ভাইরাল ‘ভারচুয়াল’ সংস্কৃতির পথপরিক্রমা

ইরান যুদ্ধ : যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছেড়ে দিচ্ছে ইউরোপ

হাওরের হাহাকার