দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার বাজেট। বাজেটের আয়-ব্যয় পরিকল্পনা দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা ও জীবনমান নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার পর থেকে বিগত পঞ্চান্ন বছরে বাজেটগুলো কখনোই জনমানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারেনি। বরং কখনো কখনো এই বাজেট হয়েছে শোষণের হাতিয়ার। আবার কখনো কখনো তা হয়েছে লুটপাট আর অর্থ পাচারের সুপরিকল্পিত বন্দোবস্ত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জুন পাস করা দেশের প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। এরপর ধীরে ধীরে বাজেটের আকার বড় হতে থাকে, রাজস্ব আয়ও বাড়তে থাকে। ১৯৭২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের বাজেটের পরিমাণ প্রায় এক হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রাজস্ব আয়ের তুলনায় বাজেট ব্যয় দ্রুত বাড়ার ফলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরের বাজেটের ঘাটতির পরিমাণ ৫০ শতাংশের আশপাশে ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০০০-এর মধ্যে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আরো বাড়তে থাকে; তবে মোট বাজেটের শতাংশের হিসাবে তা ৩০ শতাংশের আশপাশে ছিল। ২০১৫ সালের পর ঘাটতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ, টাকার অঙ্কে, যা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার সমান। বর্তমানে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের সমান। বিশাল অঙ্কের এই ঋণ ও তার সুদ পরিশোধ সরকার এবং দেশের ওপর চাপ তৈরি করছে। দেশের এই ঋণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের যাচ্ছেতাইভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বরাদ্দ দেওয়া।
২০০১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বাজেট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষা খাতে বাজেট সবসময় ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যেই থেকে গেছে। ইউনেসকোর পরামর্শ অনুযায়ী জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি শিক্ষা খাতে ব্যয় বা বিনিয়োগ করা উচিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ১৮৯টি সদস্যদেশের মধ্যে যে ১০টি দেশ শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়, বাংলাদেশ তার একটি। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ২০ ভাগ বা মোট জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। তবে কোনো সরকারই তা আমলে নেয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছিল। এরপর থেকে গত ৯ বছরে এই বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট জিডিপির ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
শিক্ষার মতো একই অবস্থা দেশের স্বাস্থ্য খাতের। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। তার বেশির ভাগই খরচ হয় বেতন-ভাতায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার কথা বললেও তা আদৌ করা যায়নি। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশে বলেছে, জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে থাকা উচিত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির গড়ে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলো গড়ে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ ব্যয় করে। সেখানে আমরা ১ শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছি। স্বাস্থ্য খাতের আরেক মৌলিক সমস্যা হলো, স্বাস্থ্য খাতে যা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই প্রতিবছর অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের কৃষি খাতের বরাদ্দ সন্তোষজনক নয়। দেশের কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষির সঙ্গে জড়িত। ২০০১-এর দিকে বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৫-৭ শতাংশের মধ্যে ছিল, যা সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে ২০১০ সালে। এরপর বাজেট বরাদ্দ আবার কমে যায়। ২০১৩-১৪ সালের বাজেটে এ খাতের হিস্যা ছিল ১১ শতাংশের ঘরে। কৃষি খাতে বাজেটে বরাদ্দ ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বীজ, সার, সেচে ভর্তুকি বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি মনোযোগ দেওয়া দরকার কৃষিপণ্য বহুমুখীকরণ, প্রক্রিয়াকরণ, রপ্তানি বাড়ানো, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়।
করুণ অবস্থা বিদ্যমান প্রতিরক্ষা বাজেটের ক্ষেত্রেও। প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ৫ থেকে ৭ শতাংশেরর মধ্যে ওঠানামা করে আবার এই বরাদ্দের বড় অংশই চলে যায় বেতন-ভাতা বাবদ।
দারিদ্র্যপ্রবণ এ দেশে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দও সন্তোষজনক নয়। ২০০১-২৩ সময়কালে এই খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মান অনুযায়ী, একটা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির ৫ শতাংশ। এডিবির ২০২০ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে গরিবদের চেয়ে ধনীরাই সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা বেশি পান। এডিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপির মাত্র দশমিক ২ শতাংশ গরিব মানুষের পেছনে খরচ হয়। আর ধনীদের পেছনে খরচ হয় দশমিক ৮ শতাংশ।
দেশের বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায় বিগত বিভিন্ন সময়ে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে। ২০০১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুরুর দিকে সুদ ব্যয়ের হার প্রায় ৯-১০ শতাংশের মধ্যে ছিল এবং ধীরে ধীরে তা বেড়ে ২০০৯-এ ১৪ শতাংশের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর কিছুটা কমলেও তা বর্তমানে ১৫ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। সুদ ব্যয় বাবদ বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করার ফলে অন্যান্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখনই ঋণের লাগাম না টেনে ধরলে সামনের দিনে বাজেটের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হবে, কারণ সামনে সুদের সঙ্গে আসলও পরিশোধ করতে হবে।
আবার বাজেটের আয়ের গতিধারা দেখলে দেখা যায়, রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে সরকার সবসময় প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। ভ্যাটের ওপর বেশি নির্ভরশীলতা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজেট প্রণয়নে অন্যতম চ্যালেঞ্জ নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৮ শতাংশেরও নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের কারণে প্রয়োজনীয় খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না। আইএমএফ থেকে ঋণ পেতে তাদের শর্তগুলোর মধ্যে একটি হলো দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। বাজেটে পরোক্ষ কর কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা উচিত।
বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাজেটে বিলাসিতা ও কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ। সম্পদের অপ্রতুলতার কারণে বাজেটের আকার অতিরিক্ত বড় করা যেমন বাঞ্ছনীয় হবে না, আবার অতিমাত্রায় কৃচ্ছ্রসাধনও করা যাবে না। কৃচ্ছ্রসাধনার সঙ্গে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধনার ফলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বাজেটের আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প সাময়িকভাবে স্থগিত বা কাটছাঁট করা লাগতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। যেসব উন্নয়ন প্রকল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, সেগুলো আগে গুরুত্ব দিতে হবে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। একদিকে মূল্যস্ফীতি বা বাণিজ্য-ঘাটতি কমানোর চাপ, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের শর্ত পূরণ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট। রক্ষণশীল মুদ্রানীতি বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট নয়, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তাই বাজেটে রাজস্ব নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্যে সমন্বয় থাকা আবশ্যক। এছাড়া বাণিজ্যঘাটতি কমাতে রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানির বিকল্প খোঁজার/উৎপাদনের মতো নীতিমালা থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধির কোনো মূল্য নেই। বেকারত্ব এখানে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে, বেকারদের সঠিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারার কারণে দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আসন্ন বাজেট হতে হবে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি পুনরুদ্ধারমুখী বাজেট। বড় বাজেট প্রণয়নই শেষ কথা নয়—এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বাজেটের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাজেট অর্থনীতির গতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যথায় বড় আকারের বাজেটও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে।
লেখক : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (কাস্ট)