পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ৯ এপ্রিল ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতির যে চুক্তি হয়, তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ২২ এপ্রিল। এর আগে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি বা নতুন চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হলে আবার শুরু হবে যুদ্ধ। তবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই উদ্যোগে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মিসরও। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে আবার সংঘাত শুরুর সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা অনেকটাই অচলাবস্থার মধ্যে পৌঁছায়। এগুলো হচ্ছে—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বিলোপ এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করা এবং লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ করা। এছাড়া, আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীগুলো ইরানের সমর্থন বন্ধ করে দেওয়া, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং ইরানের কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রেও রেঞ্জ বা পাল্লা কমানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা এখনো হয়নি এবং হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন যেসব দাবি উত্থাপন করছে, তা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই মানা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ওয়াশিংটনের কাছে তুলে দেবে না ইরান। তুরস্ক সফররত ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাবে না। এমনকি বিষয়টি নিয়ে আলোচনারও সুযোগ নেই বলে খাতিবজাদেহর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা।
অন্যদিকে, ইরানের দাবি মেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এরপরও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত আছে। পাশাপাশি ইরানের নৌবন্দরগুলো এখনো অবরোধ করে রেখেছে মার্কিন বাহিনী, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে জানিয়েছে ইরান।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের নৌবন্দরগুলো অবরোধ করার অভিযানে অংশ নিচ্ছে তাদের ১২টির বেশি যুদ্ধজাহাজ। এগুলোর সহযোগিতায় মোতায়েন করা হয়েছে যুদ্ধবিমানও। বর্তমানে তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো সাগরে তল্লাশি চালাচ্ছে এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার সন্দেহে কিছু জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ২৩টি জাহাজকে ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালির দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গত শনিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো প্রয়োজনে জব্দ করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) মার্কিন বাহিনীর এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তারা হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দিয়েছে। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কয়েকটি নৌযান এই প্রণালি পার হলেও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইরানি নৌযান ও বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করেনি। তাই এই প্রণালির দিকে এগিয়ে আসা যেকোনো নৌযানকে ‘শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতাকারী’ হিসেবে গণ্য করে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তারা ওয়াশিংটনকে ব্ল্যাকমেইল করতে চায়; কিন্তু সেই সুযোগ তারা পাবে না। তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের লেনদেন শতভাগ সম্পন্ন’ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বন্দরগুলোয় নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে। সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে ইরানের ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুদ্ধবিরতি আলোচনায় প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রবিবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তারা বিশ্বাস করেন না এবং যুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে আবার শুরু হতে পারে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে এটা স্পষ্ট, যুদ্ধবিরতি আলোচনায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি আগ্রহ বা মনোযোগের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি এবং ইরানের প্রতিরোধের মধ্যে একটি সংঘাত ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। কিন্তু এরপরও যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবার আলোচনা বসার তোড়জোড় করা হচ্ছে কেন?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির দিকে ঝুঁকে পড়ার তিনটি প্রধান কারণ থাকতে পারে। এগুলো হচ্ছে—অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি, তা হলো—উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ৩০ শতাংশে নেমে আসা।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে তার সামরিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রায় দেড় মাসের অব্যাহত হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি এবং শাসনব্যবস্থারও পতন ঘটাতে পারেনি তারা।
যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অস্বাভাবিক দিকগুলোর একটি হলো, এই যুদ্ধবিরতি মাত্র ১৫ দিনের জন্য সীমাবদ্ধ। যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যুদ্ধবিরতি সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সীমাবদ্ধ হয় না, এখানে একটি নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এটি গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই যুদ্ধ শেষ করতে চায়, নাকি বৃহত্তর সামরিক প্রস্তুতির জন্য সময় নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে ব্যবহার করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর বোঝার জন্য বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। সরাসরি আক্রান্ত না হলে ইরান সাধারণত পাল্টা আক্রমণ করে না। তবে, ৪০ দিনের লড়াইয়ের পর দেশটি তার ক্ষত সারিয়ে তুলতে, দুর্বলতাগুলো মোকাবিলা করতে এবং সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে কাজ করছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সমর্থনে দেশটি তার সামরিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও সক্রিয় সামরিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ অঞ্চলে স্থলবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের একটি ব্রিগেড, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা মেরিন সেনা এবং ১৪২তম আর্টিলারি ব্রিগেড এই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। নৌশক্তির দিক থেকে একটি বিমানবাহী রণতরী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে, আরেকটি ওমানের দক্ষিণে রয়েছে এবং তৃতীয়টি এই অঞ্চলের পথে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র সি-১৭ গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান ব্যবহার করে ব্যাপক হারে গোলাবারুদ স্থানান্তর করছে। এই অঞ্চলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, টার্মিনাল হাই-অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করা হচ্ছে। এমন তথ্যও রয়েছে, ইউরোপে থাকা মার্কিন বাহিনীর গোলাবারুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও উপসাগরীয় অঞ্চলে নিয়ে আসা হয়েছে।
তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের জন্য কাজ করছে। ইরানের ধ্বংস করা স্থির রাডারগুলোর পরিবর্তে ভ্রাম্যমাণ কৌশলগত রাডার এবং এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস) আগাম সতর্কীকরণ বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলকেও ব্যাপকভাবে সমর্থন করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের মাইন পাতার বিষয়টিও এখানে উল্লেখযোগ্য। বসরার উপকূলে ইরানের পাতা মাইনগুলো উপকূলীয় প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছে এবং এগুলো সামুদ্রিক যান চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রের মাইন অপসারণের উদ্যোগ ভিন্ন যে উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করে, তা হলো—একটি সম্ভাব্য উভচর অভিযানের পথ প্রশস্ত করা। এটা এই সম্ভাবনাকে আরো জোরদার করে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি ও বসরা উপকূল থেকে ইরানে স্থল হামলার পরিকল্পনা করেছে। এই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন আর্টিলারি ইউনিটগুলোও এই সম্ভাবনাকে সমর্থন করছে।
এসব তথ্যের আলোকে এ কথা স্পষ্ট করেই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দিনের জন্য সংঘাত বন্ধের বর্তমান ব্যবস্থাকে যুদ্ধবিরতি হিসেবে নয়, বরং নতুন করে কৌশলগত সামরিক শক্তি বৃদ্ধির একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু এবার তার চেয়ে ভিন্ন ও বৃহত্তর একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি, আরো নিবিড় এবং এতে বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানের পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী