সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমাপনী ভাষণটি ছিল সংযত, সাবলীল কিন্তু দৃঢ় বার্তায় ভরপুর। বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মতো অনেক দেশ ১৯৭২/১৯৭৩ সালের দিকে স্বাধীন হয়েছে কিন্তু তারা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। আমরা পারি নাই কেন? কারণ বিভিন্নভাবে এই দেশের গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে! গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—সবকিছু বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা ডিবেট করব, আমরা আলাপ করব, আমরা আলোচনা করব, আমরা বসে কথা বলব। কিন্তু কোনোভাবেই এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না!’
এত দিন যারা তার রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা দলকে কড়া সমালোচনার চোখে দেখেছেন, তারাও এই ভাষণের পর এক ধরনের স্বস্তি ও আশার আলো খুঁজে পেয়েছেন। বিএনপি এবং তারেক রহমানের ইদানীংকালের কট্টর সমালোচক পিনাকী ভট্টাচার্যও লিখেছেন, রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তব্য হয়েছে তারেক রহমানের!
সংসদে নিজের চেয়ারটি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন—‘মাননীয় স্পিকার, এই চেয়ারটি থেকে উঠে আপনার সামনে অনেক পপুলার কথা বলতে পারতাম কিন্তু আমি তা বলতে পারি না। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পপুলার কথা বলতে আমারও ইচ্ছে জাগে। এই চেয়ারটি খুব কঠিন একটা চেয়ার। বাইরে থেকে মনে হবে এই চেয়ারে বসলে খুব আরাম। আসলেই মোটে আরামের নয়—আগুনে তপ্ত হিট আসছে। এই চেয়ার আমাকে মনে করিয়ে দেয়, No, you have to take the right decision not the popular decision.’
সেদিনের সেই ভাষণটিতে আসলেই কোনো কৃত্রিমতা ছিল না! তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে মনে হয়েছে তিনি মনের কথাটিই বলছেন! কয়েক মাসের মধ্যেই তার এই উপলব্ধি প্রমাণ করে, তিনি শুধু ক্ষমতা ভোগ করতে আসেননি; বরং দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি কতটুকু সক্ষম হবেন—সেটি নির্ভর করে popular decision আর right decision-এর মধ্যে কতটুকু সমন্বয় করতে পারেন, তার ওপর। এটাই একজন রাজনীতিবিদের কারিশমা! এর মাধ্যমেই একজন রাজনীতিবিদ (Politician) রাষ্ট্রনায়কে (Statesman) পরিণত হতে পারেন! এ রকম একটা সুযোগ যেমনি করে তার সামনে এসেছে, তেমনি করে জুলাই সনদ এবং সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো একটা লিটমাস টেস্ট হিসেবে তার সামনে আবির্ভূত হয়েছে!
একই ধরনের লিটমাস টেস্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান! ফারাক্কা বাঁধ, দক্ষিণ তালপট্টি, একমুখী পররাষ্ট্রনীতিকে ঘুরিয়ে বহুমুখী বানানো এসব টেস্টে তিনি উতরে গিয়েছিলেন!
এখনো স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হন, এর পরের দিন আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেছিলেন, আমরা আজ এক ওমরকে হারালাম! এই লিগ্যাসি তারেক রহমানের এক বড় সম্পদ। এই সম্পদটিকে তাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে!
আমাদের সেই শিক্ষকসহ দেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী শহীদ জিয়ার মধ্যে কেন হজরত ওমর (রা.)-এর ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন, তারেক রহমানকে সেই বিষয়টিও ভাবতে হবে!
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তি—ফুরাতের তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে থাকে, হাসরের সেই কঠিন বিচারের দিনে আমি এই ওমরকে জবাবদিহি করতে হবে! বর্তমান জমানার ওমররা যদি এই চেয়ারের দায়িত্ব নিয়ে ওমর (রা.)-এর হাজার ভাগের এক ভাগ চিন্তা করতেন, তবে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা অনেক আগেই দূর হয়ে যেত!
পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশটিতেও অর্ধেকের মানুষ জীবন নির্বাহে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছে। সেসব দেশগুলোতেও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে! ওসব পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সম্পদের বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। কাজেই এই দেশগুলোকে অনুসরণ করে কিংবা তাদের প্রেসক্রিপশন মেনে আমাদের দেশ থেকেও ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হবে না!
হজরত ওমর (রা.)-এর সেই যুগ থেকে পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে! মানবসভ্যতা প্রগতির সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেছে কিন্তু মানবিকতা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হতে পারেনি। তারেক রহমান যে আসনটিতে বসেছেন, সেই আসনটির দায়ে রয়েছে কয়েক কোটি বনি আদম, যারা গত রাতেও অর্ধ পেটে কিংবা খালি পেটে ঘুমুতে গিয়েছে! এই আসনটির দায়ে রয়েছে কয়েক কোটি বেকার কিংবা অর্ধ বেকার—যারা জীবন যন্ত্রণায় সারাক্ষণ ছটফট করছে। এই আসনটির দায়ে রয়েছে ১৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ (১১০ বিলিয়ন ডলার), যার বড় অংশ বিতাড়িত ইবলিশ সরকার জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গেছে! মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে সামনে আসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক সংকট!
এসব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটি তপ্ত হলেও ওনার আশপাশে যারা রয়েছেন, তারা এই উত্তাপটি ঠিকভাবে ঠাহর করতে পারছেন না বলেই মনে হচ্ছে! তারা এই আসনটির উত্তাপ না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কারো কারো ভাবসাব দেখে মনে হয় ক্ষমতার ভারে ওনারা বড্ড বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন—আর যেন ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছেন না!
আকাশ পানে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়ে শেখ হাসিনা দেশে আগুন জ্বালিয়ে নিজে শেষমেশ হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন! এখন তারেক রহমানের অ্যাকাউন্টে একই ‘রাজাকারের বাচ্চা’ গালি উচ্চারণ করছে মুজিব বাহিনীর ফজলু কমান্ডার এবং একই কিসিমে খোঁচা দিতে চাচ্ছেন আন্দালিব রহমান পার্থ!
বলা হয়, যেখানে স্বার্থ, সেখানেই পার্থ। শেখ সেলিমের ভাগনে এবং শেখ হেলালের মেয়ের জামাই হওয়া সত্ত্বেও হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বলে বেশুমার হাততালি কুড়িয়েছেন! তখনো ফাঁকে ফাঁকে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা এবং শেখ মণিকে নিয়ে গুণকীর্তন করেছেন। এ রকম একটা ভিডিও আবার ভাইরাল হয়েছে! সব স্বার্থের বরপুত্র সেই পার্থ যাদের খোঁচা দিতে চাচ্ছেন (সর্বশেষ সরকারি হিসাব মতে) তাদের চেয়েও নিজের ভাগে রাজাকারদের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। এই দলের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং একজন সিনিয়র মন্ত্রী (যাকে বিএনপির কো-ফাউন্ডার বলা হয়)—ওনারাও রাজাকার-গোত্রীয় মানুষ ছিলেন। তাদের সঙ্গেই বিএনপি একসঙ্গে দীর্ঘ সময় আন্দোলন করেছে, একসঙ্গে সরকার গঠন করেছে এবং দুজন নেতাকে মন্ত্রী বানিয়েছেন!
ফজলু কমান্ডারের আসল নেত্রী এবং পার্থর প্রিয় আন্টি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে উঠতে-বসতে রাজাকার বলে গালি দিতেন। এসব জেনেও ফজলু কমান্ডার বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন! স্মার্ট পার্থরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেননি—যুদ্ধ করেছেন শুধু রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে। চারদলীয় জোটের চার শীর্ষ নেতার একজন ছিলেন পার্থর নিজের বাবা! এখন মনে হচ্ছে মাইতি কাম শ্বশুর ধারার দিকে বেশি টান অনুভব করছেন।
মহামহিম ফজলু কমান্ডার ‘এই রাজাকারের বাচ্চা’ বলে সংসদে যে গালি দিয়েছেন, তা সবচেয়ে লাগার কথা প্রধানমন্ত্রীর পাশের চেয়ারটিতে যিনি বসেছেন তিনিসহ আরো বেশ কিছু ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যদের গায়ে। যতটুকু জানতে পেরেছি, কমপক্ষে সাত-আটজন ‘রাজাকারের বাচ্চা’ এখনো ট্রেজারি বেঞ্চের শোভাবর্ধন করছেন। নিজের বাপের কীর্তি ঢাকতে এদের কেউ কেউ ফজলুর গালি শুনে আরো জোরে জোরে টেবিল থাপড়িয়েছেন! বাকিরা টেবিল থাপড়িয়েছেন—কারণ একটু কম থাপড়ালে নিজের বাপকে আবার এই তালিকায় ঢুকিয়ে দেয় কি না—সেই ভয় থেকে! সময় এখন যে যত শক্তভাবে রাজাকারদের গালি দিতে পারবে—সে তত উঁচু মাপের বিএনপি! এই মওকায় মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার দলে সুপার-ডুপার হিরো হয়ে পড়লেন মুজিব বাহিনীর এই ড্যাশিং কমান্ডার!
প্রিয় ভাগিনা কাম জামাই আন্দালিব এবং ফজলু কমান্ডারদের কাজে উৎসাহিত হয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, খুব তাড়াতাড়ি আমি দেশে ফিরব! ওদিকে বিজেপি বাংলার মসনদ দখল করেই শেখ হাসিনাকে বৈধ প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে অবৈধ ঘোষণা করেছে! শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনাকে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে স্যালুট করে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন! ওদিকে হারপিক মজুমদার নামক এক আওয়ামী ল্যাসপেন্সার ক্রমাগত অস্ত্র হাতে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন!
এমতাবস্থায় বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি শুধু নাকে তেল দিয়েই ঘুমাচ্ছে না; বরং একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে মাসল ফোলাচ্ছে!
কখনো কখনো নির্দোষ ও সংগত বক্তব্যও পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান যেভাবে আল্লাহর আইন কায়েমের জন্য সংসদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—সেটাকেও তপ্ত লোহায় হঠাৎ পানি ঢেলে দেওয়ার মতো লেগেছে! আইনের শাসন (অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারসহ) প্রতিষ্ঠিত হলেই আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার দিকে একটি সমাজ এগিয়ে যায়! একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, ‘আমি ইউরোপে ইসলাম দেখেছি, মুসলমান দেখি নাই। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে খালি মুসলমান দেখি, ইসলামকে দেখতে পাই না।’
আমরা কেন যেন নিজেদের মধ্যে মিলগুলো না দেখে অমিলগুলোই বড় করে তুলে ধরছি! একটি কওমের সবাই একই মাপের ঈমানদার হবে না। এ কারণেই আল্লাহ বেহেশতে আটটি স্তর রেখেছেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রণীত বিএনপির ১৯ দফার অন্যতমটি হলো—আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে এই বাক্যটি যুক্ত করা হয়েছে। সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম যোগ করা হয়েছে! শেখ মুজিবের সময় বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ইসলামিক পরিভাষা ও সিম্বল পরিবর্তনের যে হিড়িক শুরু হয়েছিল, সেটি শক্ত হাতে থামিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান!
আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে একজন মুসলমান কোরআনের বিরুদ্ধে যেতে পারে না! এই ছোট বাক্যটির গভীরতা আসলেই অপরিসীম! কাজেই এ রকম একটা ‘বিশ্বাসী, তবে খানিকটা গোনাহগার’ দলকে ইসলামের বাইরে ঠেলা দেওয়া ইসলামিস্টদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না! আবার বিএনপির ভেতরে অনেকে আছেন, যাদের মনে হয় বিএনপির অনেক কিছু না জেনেই দলটিতে বেচারা বা বেচারিরা ঢুকে পড়েছেন! মাঝে মাঝে মনে হয়, কার শিরনি খাচ্ছে এটা মোল্লা জানে না!
ডিজিটাল ফেতনার এন্ট্যাঙ্গেলে সরকার ও বিরোধী দল
সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে টানাপোড়েন এবং সংঘাত দৃশ্যমান হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। এই পরিস্থিতি যারাই সৃষ্টি করুক না কেন, তারা সরকার কিংবা রাষ্ট্রের প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না। বরং এটি স্পষ্ট, একটি সুপরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে—যেখানে অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা হতে পারে।
বিতাড়িত ইবলিশ শয়তান এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেই বেছে নিয়েছে! এই ডিজিটাল ফেতনা এমনই এক ফেতনা তাতে কে লীগ, কে দল আর কে জামায়াত—তা ঠাহর করা যায় না! এই সুযোগে ইবলিশ শয়তানের দল বর্তমান সরকারি দল এবং বিরোধী দল—উভয় দিকেই হাওয়া দিচ্ছে। দুটি পক্ষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিতে অতি-উৎসাহী নেতাকর্মীদের একটু ওয়াচে রাখা দরকার। তাদের অনেকেই সরাসরি বিতাড়িত ইবলিশ শয়তানের পক্ষ নিয়ে কাজ করছে!
সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থানে রয়েছে ছাত্ররাজনীতি। সরকার ও বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠনগুলো বর্তমানে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তরুণদের স্বভাবগত আবেগ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। যথাযথ দিকনির্দেশনার অভাবে তারা সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে—এমনকি অপপ্রচার বা ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার শিকারও হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বলপ্রয়োগ বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং এটি পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তুলতে পারে এবং সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠনকেও সম্পদ (asset) থেকে দায় (liability)-এ পরিণত করতে পারে। আদর্শগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্তিশালী নৈতিক অবস্থান, সংযম, ধৈর্য এবং গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব।
এমন বাস্তবতায় একটি গঠনমূলক প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। উভয় রাজনৈতিক দল থেকে ঠান্ডা মাথার, অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে ১০ সদস্যের একটি যৌথ ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম (সিএমটি)’ গঠন করা যেতে পারে। এই টিম ছাত্র ও যুবসমাজের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এই সিএমটির অন্যতম প্রধান কাজ হবে একটি যৌথ ‘Code of Conduct’ প্রণয়ন করা, যা উভয় দলের নেতাকর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক হবে। এর মাধ্যমে একটি জেন্টেলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব—যেখানে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে যে, কেউ যদি এই আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে সাইবার অপরাধে জড়ায়, তাহলে তাকে চিহ্নিত করে দলীয় শাস্তি, বহিষ্কার বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একই সঙ্গে, এই টিমের তত্ত্বাবধানে সরকারের সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা গেলে ডিজিটাল ফেতনা, অপপ্রচার এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হলে দেশ আবার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের দিকে ধাবিত হতে পারে—যেখানে রাজনৈতিক সংঘাত সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। তাই এখন সময় আবেগ নয়, প্রজ্ঞার; প্রতিশোধ নয়, সমঝোতার।
আল্লাহ আমাদের প্রিয় দেশকে সব অশান্তি ও বিভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুন।
লেখক : কলামিস্ট