হোম > ইসলাম ও জীবন

ধর্মীয় মূল্যবোধে অবহেলার কুফল

উম্মেহানি বিনতে আবদুর রহমান

জীবনের এই সফরে সন্তান আমাদের জন্য পরীক্ষার মাধ্যম। সন্তানকে মানুষ করা মানে শুধু তাকে বড় চাকরি বা উচ্চ ডিগ্রির পথে এগিয়ে দেওয়া নয়। সন্তানের প্রকৃত তরবিয়ত হলো তার অন্তরে মায়া, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বীজ বপন করা। যে বীজ থেকে একদিন সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। এই সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। আর সেই ভুলের মূল্য কখনো কখনো দিতে হয় অত্যন্ত নির্মমভাবে। সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে নূর জাহান বেগম নামের এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী- কয়েক দিন আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ না পাওয়ায় মরদেহে পচন ধরে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। এরপর বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, এই মায়ের এক ছেলে যুগ্মসচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যও উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ সমাজের প্রচলিত মানদণ্ডে বিচার করলে এই পরিবারকে সফল পরিবারের তালিকাতেই রাখা হয়। কিন্তু এ ঘটনা আমাদের সামনে একটি নির্মম প্রশ্ন তুলে ধরে, সফলতা আসলে কী?

আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সন্তানের বড় চাকরি, বিদেশে বসবাস, উচ্চ ডিগ্রি কিংবা সামাজিক মর্যাদাকেই সফলতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। অথচ একজন মা-বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো; তাকওয়া, সততা, অধীনস্থ সবার প্রতি সন্তানের হক আদায়ের মানসিকতা, সন্তানের ভালোবাসা, খোঁজখবর এবং পাশে থাকার নিশ্চয়তা। অথচ আজ আমাদের অনেকেই সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে এই শিক্ষাই দিতে ভুলে যাই, যা তাকে একজন প্রকৃত বিবেকবান, হৃদয়বান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। তাই নূর জাহান বেগমের ঘটনা থেকে আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন—

প্রথমত, সন্তানকে ইসলামের মূল্যবোধ শেখানো কতটা জরুরি। ইসলাম সন্তান গঠনের ক্ষেত্রে শুধু জ্ঞানার্জনের কথা বলেনি; বরং ঈমান, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ এবং বাবা-মায়ের হক আদায়ের শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন—‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তোমরা তারই ইবাদত করো এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না।’ (সুরা আল-ইসরা : ২৩) অন্যত্র আল্লাহতায়ালা বলেন—‘তোমরা আমার প্রতি এবং তোমাদের বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা লুকমান : ১৪) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—‘আল্লাহর সন্তুষ্টি বাবার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যে।’ (জামে তিরমিজি)

আজকের বাস্তবতা হলো, আমরা সন্তানকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও ক্যারিয়ারের শিক্ষা দিচ্ছি কিন্তু তার অন্তরে আল্লাহভীতি, বাবা-মায়ের মর্যাদা, আত্মীয়তার হক এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা সেভাবে দিচ্ছি না। যে সন্তান ছোটবেলা থেকে ইসলামের মূল্যবোধে বেড়ে ওঠে, সে বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝা মনে করে না। স্ত্রীর প্রতি বর্বর আচরণ করে না। নিজ সন্তানের দায়িত্বের ব্যাপারে মাহরুম থাকে না; বরং তাদের সেবাকে জান্নাতের পথ মনে করে। কারণ সে জানে, পৃথিবীর সব অর্জনের চেয়েও আল্লাহর সন্তুষ্টি অনেক বড়।

দ্বিতীয়ত, শুধু রেজাল্ট নয়, সন্তানকে সুশিক্ষা দেওয়াই আসল লক্ষ্য। বর্তমান সমাজে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সন্তানের রেজাল্ট, জিপিএ, চাকরি, ব্যবসা ও আয় নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, তার চরিত্র, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে ততটা ভাবেন না। অথচ একটি ভালো রেজাল্ট একজন মানুষকে শিক্ষিত করতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষিত করতে পারে না। সুশিক্ষা হলো এমন শিক্ষা, যা মানুষের অন্তরে মায়া, ভালোবাসা, সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। যে শিক্ষা মানুষকে শেখায়, বাবা-মায়ের হক আছে, সন্তানের হক আছে, প্রত্যেক আত্মীয়তার হক আছে, প্রতিবেশীর হক আছে, সমাজের হক আছে, মুসলিম উম্মাহর হক আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম।’ (সহিহ বুখারি) আবার নবীজি বলেছেন—‘প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

আমরা যদি সন্তানের অন্তরে ছোটবেলা থেকেই মূল্যবোধ, মায়া-মমতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের হক আদায়ের চেতনা জাগ্রত করতে পারি, তাহলে সে শুধু একজন সফল পেশাজীবী নয়; বরং একজন উত্তম সন্তান, উত্তম স্বামী, উত্তম বাবা এবং উত্তম নাগরিক হিসেবেও গড়ে উঠবে। নূর জাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি গভীর সামাজিক সতর্কবার্তা। ওই ঘটনা আমাদের নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে দেয়—জাগতিক সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও মানুষ ব্যর্থ হতে পারে, যদি সে মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়।

তাই আসুন, আমরা সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, সুশিক্ষিত করি। শুধু ডিগ্রি নয়, আমাদের সন্তানের চরিত্র গঠনে গুরুত্ব দিই। শুধু বড় চাকরি নয়, বড় হৃদয়ের মানুষ তৈরি করি। কারণ একজন মা-বাবার সবচেয়ে বড় সম্পদ; সন্তানের ভালোবাসা, তার প্রতিটি দায়িত্ববোধ এবং স্বজনদের অসুস্থতায় পাশে থাকার উষ্ণ আশ্বাস। আমাদের চাইতে হবে সন্তানের সেই সফলতা, যা তাকে জান্নাতের পথে নিয়ে যায়, এমন তাকওয়া যা তাকে অন্যের প্রতি এক বিন্দু জুলুম থেকে হেফাজত করে, এমন আখলাক; যার সুগন্ধে হাজারো লাখো হৃদয় আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হবে!

কোরবানি আমাদের কী শেখাল

অপরাধীর বিচার নিশ্চিতে ইসলামের আদর্শ

মায়ের প্রতি সম্মান জানানো সন্তানের জন্য সুসংবাদ

কোরবানির গোশত সংরক্ষণ করা যায় কতদিন

দেশে ফিরেছেন ৬,১৭৫ বাংলাদেশি হাজি

রাতেই শুরু হচ্ছে হজ যাত্রীদের ফিরতি ফ্লাইট

হজ শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে মক্কা ছাড়ছেন হাজিরা

মোহাম্মদ (সা.) প্রথম যে পশু কোরবানি করেছিলেন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব পশু কোরবানি দেওয়া হয়

কোরবানি কার নামে হবে, যা বলছে ইসলাম