হোম > ধর্ম ও ইসলাম

সুস্বাস্থ্য, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের সমন্বিত দর্শন

সিয়াম সাধনা

এস এ আর ছিবগাতুল্লাহ

সিয়াম বা সাওম আরবি শব্দ সওম থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সংযম, বিরত থাকা বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। ইংরেজিতে একে Fasting এবং ফার্সিতে রোজা বলা হয়। শরিয়তের পরিভাষায়—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, পাপাচার ও জৈবিক চাহিদা থেকে সচেতন বিরত থাকাই সাওম বা রোজা।

ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় হিজরি বর্ষে রোজা ফরজ করা হয়। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব—বিভিন্ন ধরনের রোজার বিধান রয়েছে। আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুলের জীবনেই উপবাস ছিল আধ্যাত্মিক সাধনার একটি অপরিহার্য অংশ। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে যে রোজার মূল লক্ষ্য তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘হে ঈমানদাররা তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)

আধ্যাত্মিক সাধনা থেকে বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য

রমজানের রোজা মূলত ইবাদত হলেও আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ও মনোবিজ্ঞানে এর বহুমাত্রিক উপকারিতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, নির্দিষ্ট সময় খাদ্যবিরতি শরীরকে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহারে বাধ্য করে, ফলে বিপাকক্রিয়া সুশৃঙ্খল হয় এবং কোষীয় পুনর্গঠন ত্বরান্বিত হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে উপবাসকে অটোফেজি প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়Ñযেখানে সুস্থ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে ভেঙে শরীরকে ভারসাম্যে রাখে। এই গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহসুমি ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এরপর থেকেই উপবাস ও রোজার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বিশ্বজুড়ে নতুনভাবে আলোচিত হতে থাকে।

গবেষণায় দেখা যায়, সময়নির্দিষ্ট উপবাস—ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়, অতিরিক্ত চর্বি হ্রাসে সহায়ক, প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখে, কোষের পুনর্নবীকরণ ত্বরান্বিত করে, হৃদরোগ ও বিপাকজনিত ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

এ কারণে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে intermittent fasting পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, যার সঙ্গে ইসলামি রোজার সময়ভিত্তিক সংযমের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

পরিপাকতন্ত্র, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বিষমুক্তকরণ

খাদ্যবিরতির ফলে পরিপাকতন্ত্র নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম পায়। এতে হজমশক্তি পুনর্গঠিত হয় এবং দীর্ঘদিনের বিপাকীয় ভারসাম্যহীনতা কমতে পারে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রমজানে অনেক রোজাদারের ওজন ধীরে ও নিরাপদভাবে হ্রাস পায় এবং পাকস্থলীর অতিরিক্ত অম্লতা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে। শরীরে জমে থাকা কিছু বিপাকীয় বর্জ্য ও টক্সিন অপসারণেও উপবাস সহায়ক বলে বহু চিকিৎসাবিদ মত দিয়েছেন। ১৭৬৯ সালে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. পিটার ভেনিয়ামিভ রোজা (Fasting) নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন এবং রোজা রাখার উপদেশ দেন। কারণ রোজা থাকায় পরিপাকতন্ত্র একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশ্রাম পায়, ফলে সুস্থ হওয়ার পর তা ঠিকমতো নিজের কাজ চালাতে থাকে। লুট জানায়ের মতে, খাবারের উপাদান থেকে বছরজুড়ে শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ টক্সিন (Toxin) চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তির সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হলো উপবাস (রোজা)। আর রোজা রাখার ফলে শরীর সতেজ হয়, কর্মক্ষমতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার সম্ভাবনা জোরদার হয়।

মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক প্রভাব

রোজা শুধু শারীরিক অনুশীলন নয়; এটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণও বটে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ মানুষের আত্মসংযম, ধৈর্য ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি delayed gratification বা বিলম্বিত তৃপ্তি অর্জনের এক কার্যকর অনুশীলন, যা ব্যক্তিত্ব গঠন ও মানসিক স্থিতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসাবিদ ড. হেলমুড লুটজানার The secret of successful Fasting গ্রন্থে-বছরে কিছুদিন উপবাস বা রোজা থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন-রোজা শরীরকে নীরোগ, কর্মক্ষম ও দীর্ঘজীবী হতে সাহায্য করে। কায়রো থেকে প্রকাশিত ‘Science calls for Fasting’ গ্রন্থে থেকে পাওয়া যায় পাশ্চাত্যের চিকিৎসাবিদরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, ‘The power and endurance of the body under Fasting conditions are remarkable: After a fast properly taken the body is literally born afresh.’ বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগম্যন্ড নারায়ণ বলেন, রোজা মনস্তাত্ত্বিক ও মস্তিষ্কের রোগ নির্মূল করে।

রমজান সামাজিক ন্যায়বোধ ও মানবিক সংহতিও জাগ্রত করে। দরিদ্রের কষ্ট অনুধাবন, দান-সদকা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক-সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হওয়া—এসবই রোজার সামষ্টিক কল্যাণধর্মী দিক।

ধর্মীয় অনুশাসন ও মানবকল্যাণের সেতুবন্ধ

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা পালন করে, আল্লাহ তার আগের গুনাহ মাফ করে দেন (বুখারি ও মুসলিম)। এই আধ্যাত্মিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানও রোজার বহু স্বাস্থ্যগত সুফল নির্দেশ করছে।

অতএব, রোজা শুধু ধর্মীয় বিধান নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, শারীরিক সুস্থতা, মানসিক স্থিতি ও সামাজিক ন্যায়বোধের সমন্বিত জীবনপদ্ধতি। দেড় হাজার বছর আগে প্রবর্তিত এই ইবাদত আজও মানবস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার আলোচনায় প্রাসঙ্গিক—বরং নতুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে।

লেখক : লেকচারার, যুক্তিবিদ্যা বিভাগ, সিটি গার্লস কলেজ, খুলনা

এই রমজানে যেভাবে সন্তানকে আল্লাহভীরু বানাবেন

রমজানে বর্জনীয় ১০ কাজ

মুক্তির মোহনা রমজানের জুমা

মসজিদে নববির শিক্ষক আবদুল্লাহর ইন্তেকাল

নবম তারাবি: পবিত্র কোরআন অকাট্য নির্ভুল এবং ধ্রুব সত্য

রমজানে পাপমুক্ত জীবনের প্রশিক্ষণ

অষ্টম তারাবি: সত্য ও সততা মুক্তি দেয়

এ বছর জনপ্রতি ফিতরা কত, জানাল ইসলামিক ফাউন্ডেশন

জিকিরে সজীব রোজাদার

সপ্তম তারাবি: হিজরত, নুসরত ও জিহাদ