হোম > ধর্ম ও ইসলাম

মাহে রমজান ও আল কোরআন

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

মাহে রমজানে ‘মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী রূপে’ কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে । আরবি ভাষায় এ মহাগ্রন্থ অবতীর্ণ হওয়ার কারণও উল্লেখ করা হয়েছে কোরআনে- ‘(হে রাসুল) আমি তোমার ভাষায় কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা দুখান : ৫৮); ‘আমি একে করেছি কোরআন, আরবি ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা যুখরূফ : ৩); ‘আমি তোমার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায়, যাতে তুমি সতর্ক করতে পারো মক্কা ও এর চারপাশের জনগণকে।’ (সুরা শুরা : ৭); ‘আমি যদি আজমী ভাষায় (আরবি ব্যতিত অন্য যেকোনো ভাষায়) কোরআন অবতীর্ণ করতাম, তারা অবশ্যই বলত এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত হয়নি কেন? কী আশ্চর্য, এর ভাষা অনারব অথচ রাসুল আরবিভাষী।’ (সুরা হা মীম আসসাজদা : ৪৪); ‘আরবি ভাষায় এ কোরআন বক্রতামুক্ত, যাতে মানুষ সাবধানতা অবলম্বন করে।’ (সুরা জুমার : ২৮); ‘আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় এবং তাতে বিশদভাবে বিবৃত করেছি সতর্কবাণী, যাতে তারা ভয় করে অথবা তা হয় তাদের জন্য উপদেশ।’ (সুরা তাহা : ১১৩)

মাতৃভাষায় ভাবের আদান-প্রদান যতটা স্বাভাবিক ও সাবলীল অন্য ভাষায় ততটা নয়। একজন অক্ষরজ্ঞানহীনের পক্ষে ভাবের আদান-প্রদানে কোনো অসুবিধা হয় না নিজের মাতৃভাষায়। মাতৃভাষা আল্লাহর সেরা দান। স্থানীয়ভাবে, নিজস্ব নিয়মে প্রাকৃতিক অবয়বে গঠিত ধ্বনি ও শব্দমালার মাধ্যমে মানুষ ভাবের আদান-প্রদান করে থাকে। এলাকা বিশেষে নিজেদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সংহতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নিজস্ব ভাষা অন্যতম অবলম্বনের কাজ করে। অঞ্চল, গোত্র ও গোষ্ঠীর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য নির্দেশক হিসেবেও এবং নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশে বাহন হিসেবে ভাষা একটি অন্যতম নিয়ামক। জাতীয়তা বোধের বিকাশে ভাষার অবিসংবাদিত ভূমিকার কারণে ভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে অনেক দেশ গোত্র ও গোষ্ঠীকে।

আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল হওয়ার মধ্যে যে উদ্দেশ্য, অভিপ্রায় ও যৌক্তিকতা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন তার মধ্যে চিন্তা ও উপলব্ধির অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। একজন উম্মি রাসুলের কাছে তার নিজ ভাষায় ওহি এসেছে এবং তার অনুসারীদের মধ্যে তা প্রকাশ, প্রচার ও ব্যাখ্যার সুবিধার জন্য তো বটেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ আরবি এমন একটি সমৃদ্ধ ও সুপ্রাচীন ভাষা, এর গঠন ও প্রকাশশৈলী এমনই কাব্যিক ও সুরেলা, যার মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদানে ব্যাখ্যা ও বয়ানে বিশেষ আবেগ ও আন্তরিকতার আবহ সৃষ্টি হয়। বলা হয়েছে, আরবি ভাষায় এ কোরআন বক্রতামুক্ত আর বক্রতামুক্ত বলেই এর বাণী সর্বজনীন সাবধানতা অবলম্বনের জন্য, হেদায়াতের জন্য, অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট কার্যকর।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, মাহে রমজানে রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে মানুষের কাছে কোরআন হিসেবে প্রথম যে শব্দ বা বাণী অবতীর্ণ হয়েছে তাহলো ‘ইকরা’ অর্থাৎ পড়। বলা হলো, ‘পাঠ কর সেই প্রভুর নামে যিনি মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।’ কোরআন হলো মানুষকে শিক্ষার দিকে, জ্ঞান আহরণ আর উপলব্ধির দিকে অনিবার্য আহ্বানের এক ঐশী সওগাত, যা মাহে রমজানেই পাঠানো হয়েছে।

কোরআন মজিদের তাৎপর্য ও ভূমিকা প্রসঙ্গে আল-কোরআনেই এ মহান কিতাবকে বিভিন্ন বিশেষ নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন ‘আল-কিতাব’-মহাগ্রন্থ (সুরা বাকারা : ২), ‘আল ফুরকান’- ভালো ও মন্দের পার্থক্য নির্দেশকারী (সুরা আল ফুরকান : ১); ‘আয-যিকর’ মানুষের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত মহিমা স্মরণ করিয়ে দেওয়া (সুরা হিজর : ৯); ‘আল মাওইজাহ’-বিশেষ উপদেশ ও ‘আশশিফা’-আরোগ্য দানকারী (সুরা ইউনুস : ৫৭); ‘আল হুকুম’-বিচারের রায় (সুরা রাদ : ৩৭); ‘আর রহমত’- দয়া (সুরা বনি ইসরাইল : ৩২); ‘আল-হিকমাহ’-প্রজ্ঞা (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৯); ‘আলহক’-সত্য (সুরা বনি ইসরাইল : ৮১); ‘আল হুদা’-সঠিক পথপ্রদর্শক (সুরা জিন : ১৩); ‘আত-তানজিল’-অবতীর্ণ ঐশী বাণী (সুরা আশ-শোআরা : ১০২); ‘আর-রুহ’- জীবনদানকারী আত্মা (সুরা আশ-শুরা : ৫২); ‘আল খায়ের’-উত্তম স্বভাব (সুরা আলে ইমরান : ১০৩); ‘হাবলুল্লাহ’-আল্লাহর রশি (সুরা আলে ইমরান : ১০২); ‘আল-বায়ান’-উত্তম ব্যাখ্যাকারী (সুরা আলে ইমরান : ১৩৭); ‘আন নি’মাহ’-কল্যাণ (সুরা জিন : ১১); ‘আল বুরহান’-স্বচ্ছ যুক্তি (সুরা আন-নিসা : ১৭৫); ‘আল-কাইইম’-উত্তম ব্যবস্থাপক (সুরা কাহাফ : ২); ‘আল-মোহাইমিন’-উত্তম অভিভাবক (আগের কিতাবসমুহের) (সুরা আল মায়েদা : ৪৮); ‘আন-নুর’-আলো (সুরা আরাফ : ১৫৭) ইত্যাদি।

মাহে রমজানের অশেষ কল্যাণ ব্যক্তি, তথা সমাজ জীবনে নিশ্চিত করতে আল-কোরআনের মহান শিক্ষা ও নির্দেশনা এক বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আল-কোরআন ও মাহে রমজান পারস্পরিক সূত্রে গাঁথা এবং মানবতার সার্বিক কল্যাণে এক অবিনশ্বর অবলম্বন। আধুনিক বিশ্বে মানবতার আর্থসামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, নৈতিকতা ও আদর্শিক মুল্যবোধের বিকাশ অতীব প্রয়োজন।

লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

তাকওয়ার যথাযথ চর্চার মাধ্যমেই সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব

১৩ তম তারাবি: দাওয়াতের কাজে চাই অবিচলতা

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাকাত

রমজানের বরকতময় খাবার সাহরি

রমজানে পাপমুক্ত জীবনের অনুশীলন

রমজানে পাপমুক্ত জীবনের অনুশীল

দশম তারাবি: আহসানুল কাসাস, সুন্দরতম ঘটনা

ভূমিকম্প হলে যে দোয়া পড়তে বলেছেন বিশ্বনবী (সা.)

সুস্বাস্থ্য, আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের সমন্বিত দর্শন

এই রমজানে যেভাবে সন্তানকে আল্লাহভীরু বানাবেন