হোম > ধর্ম ও ইসলাম

একাধিক বিয়ে : প্রয়োজন ও বাস্তবতা

মুফতি উবায়দুল হক খান

মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো দাম্পত্য জীবন। পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তি এই দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইসলামে বিয়েকে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; বরং ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘একাধিক বিয়ে’ বা বহু বিয়ে একটি সংবেদনশীল ও আলোচিত বিষয়। কোরআন-হাদিসে এর অনুমোদন থাকলেও এর উদ্দেশ্য, শর্ত ও বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। তাই এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা জরুরি।

কোরআনের দৃষ্টিতে একাধিক বিয়ে

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন—‘তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে, ইয়াতিম মেয়েদের ব্যাপারে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে তোমাদের পছন্দমতো নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা নিসা : ৩) এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, একাধিক বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে তা শর্তসাপেক্ষ। মূল শর্ত হলো—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, স্ত্রীদের মধ্যে অধিকার, সময়, ভরণ-পোষণ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে সাম্য বজায় রাখতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে এক স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাদিসের আলোকে

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনে একাধিক বিয়ে করেছেন, তবে তা ছিল মূলত সামাজিক ও মানবিক প্রয়োজনের কারণে। যুদ্ধবিধবা নারীদের আশ্রয় দেওয়া, সমাজে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা—এসব ছিল তাঁর বিয়ের পেছনের উদ্দেশ্য।

একটি হাদিসে এসেছে—‘যার দুই স্ত্রী আছে, অথচ সে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করে না, কিয়ামতের দিন সে একপাশ হেলে পড়া অবস্থায় উপস্থিত হবে।’ (তিরমিজি)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বহু বিয়ের অনুমতি থাকলেও তা দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়।

একাধিক বিয়ের প্রয়োজনীয়তা

ইসলামে একাধিক বিয়ে কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়; বরং এটি একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত ব্যবস্থা। কিছু ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে—

১. সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা : যুদ্ধ, দুর্যোগ বা অন্যান্য কারণে নারীর সংখ্যা বেশি হলে তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার জন্য বহু বিয়ে একটি সমাধান হতে পারে।

২. বিধবা ও অসহায় নারীদের আশ্রয় : ইসলামের প্রাথমিক যুগে বহু নারী যুদ্ধের কারণে বিধবা হয়ে পড়তেন। তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহু বিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।

৩. পারিবারিক সমস্যা সমাধান : কখনো কখনো প্রথম স্ত্রী অসুস্থতা বা সন্তান ধারণে অক্ষম হলে, বৈধ উপায়ে পরিবার রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে একটি বিকল্প হতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা

বর্তমান সমাজে বহু বিয়ে নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি অপব্যবহার হচ্ছে, যা ইসলামের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এর কারণ বিবিধ। যথা—

এক. ন্যায়বিচারের অভাব : আজকের বাস্তবতায় অধিকাংশ মানুষ একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ফলে পারিবারিক অশান্তি, হিংসা ও ভাঙন সৃষ্টি হয়।

দুই. আর্থিক সক্ষমতা : একাধিক পরিবার পরিচালনা করার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োজন। অনেকেই তা বিবেচনা না করেই বিয়ে করে, যার ফলে স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।

তিন. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি : বর্তমান সমাজে বহু বিয়েকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এর পেছনে রয়েছে অপব্যবহার ও দায়িত্বহীনতার উদাহরণ।

চার. নারীর অধিকার : আধুনিক যুগে নারীর শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে বহু বিয়ে গ্রহণযোগ্য হয় না।

ইসলামি দৃষ্টিতে ভারসাম্য

ইসলাম কখনোই মানুষের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করে না। একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়ে ইসলাম মানবিক সমস্যার সমাধান দিয়েছে; কিন্তু একই সঙ্গে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। এ ভারসাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য। একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। যদি কেউ মনে করে, সে একাধিক স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে পারবে না, তবে তার জন্য এক স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম।

সমাধান ও করণীয়

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বহু বিয়ের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কিছু বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা যাচাই করা। আর্থিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকা। প্রথম স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব অবহেলা না করা। সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

একাধিক বিয়ে বিনোদনের জন্য নয়

একাধিক বিয়ে ইসলামে একটি অনুমোদিত ব্যবস্থা, কিন্তু তা কোনো সাধারণ বা বিনোদনমূলক বিষয় নয়। এটি একটি গুরুতর দায়িত্ব, যা পালন করতে হলে ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি থাকা আবশ্যক। বর্তমান সমাজে এর অপব্যবহার রোধ করতে হলে কোরআন-হাদিসের সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং বাস্তবতার আলোকে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সুতরাং, বহু বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে ভারসাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা, ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি পূরণ করা নয়। ইসলামের এই বিধানকে সঠিকভাবে বুঝে প্রয়োগ করলেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—তিনটিই উপকৃত হবে।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

বজ্রপাত ও ঝড়-তুফানে করণীয় আমল

পবিত্র মক্কা, জেদ্দা ও হিজাজ

প্রথম স্ত্রীর গর্ভাবস্থায় মাদানীর দ্বিতীয় বিয়ে, দিলেন সমালোচনার জবাব

বাজার দরে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির ভাড়া পুনর্নির্ধারণ হবে

মক্কার হারাম এলাকার সীমানা ও প্রবেশের আদব

পিতলের পাতে খোদাই করা কোরআন এবার জনসম্মুখে

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেসব নির্দেশনা জারি

অদৃশ্য শত্রুই আমাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে

হজ শুদ্ধি ও সমর্পণের সফর

ক্ষমতার দাপট দুদিনের বড়াই