মাহে রমজানের শেষদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ। ইতিকাফের শাব্দিক অর্থ অবস্থান করা। শরীয়তের পরিভাষায় ‘ইতিকাফ’কে বলা হয়Ñ পুরুষের জন্য নিয়তসহ এমন মসজিদে অবস্থান করা যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়।
আর নারীদের রমজান মাসের শেষ দশদিনের জন্য ইতিকাফ হলো, নিয়তসহ ঘরের ভেতর নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অবস্থান করা। রাসুল (সা.) রমজান মাসের শেষ দশদিনে ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফ করা সুন্নতে কেফায়া। সবার পক্ষ থেকে একজন আদায় করলে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। তবে একজনও না করলে মহল্লার সবাই গোনাহগার হবে।
ইতিকাফের জন্য রমজান মাসের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। ২৯ বা ৩০ তারিখ শাওয়ালের চাঁদ দেখার পর ইতিকাফ শেষ হয়। ইতিকাফ সহিহ হওয়ার শর্ত হলো, মুসলমান হওয়া, জ্ঞানবান হওয়া, জানাবাত (গোসল ফরজ) ও হায়েজ-নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া। ইতিকাফ অবস্থায় নেকের কথা ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা। এ সময় কোরআন মজিদ তিলাওয়াত করা, হাদিস পাঠ করা, ইলম শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া, রাসুলুল্লাহ (সা.) ও অন্যান্য নবীর সিরাত পাঠ করা ও ধর্মীয় গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করা। ইতিকাফকারী ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিমিত্তে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে তার ইবাদতে নিয়োজিত রাখবে এবং দুনিয়াবি কাজকর্ম থেকে দূরে থাকবে। এ সময় স্ত্রী সংস্রবও নিষিদ্ধ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ- ‘ওয়ালা তুবাশিরুহুন্না ওয়া আনতুম আকিফুনা ফিল মাসজিদ’। অর্থাৎÑতোমরা যখন মসজিদে ইতিকাফ করবে তখন স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করবে না। (সুরা আল-বাকারা : ১৮৭) সৈয়দ কুতুব শহীদ (রহ.) তার তাফসীর ‘ফি যিলালিল কোরআন’-এ এই নির্দেশনার ব্যাখ্যায় বলেছেন, (ইতিকাফের) সময়টি একান্তভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্যই নির্দিষ্ট। এ কারণে রোজার মাসে অন্য সময়ে রাতে স্ত্রী সম্ভোগ বৈধ হলেও ইতিকাফের সময় স্ত্রীর সঙ্গে মেলামেশাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যাতে এই সময়ে নিজেকে পুরোপুরিভাবে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা যায়।
ইতিকাফের জন্য নিয়ত করা এর অন্যতম শর্ত। বিনা নিয়তে ইতিকাফ করলে তা সহিহ হবে না। এমন মসজিদে ইতিকাফ করা উচিত, যেখানে নামাজের জামাত হয়। ইতিকাফের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান হলো মসজিদুল হারাম, এরপর মসজিদে নববী (সা.), তারপর বায়তুল মোকাদ্দাস, তারপর জামে মসজিদ। মসজিদে ইতিকাফের নিয়তের সঙ্গে অবস্থান করাই উত্তম। বিনা কারণে মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভঙ্গ হবে। বিনা ওজরে দিনে বা রাতে সামান্য সময়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হলেও, ইচ্ছা কিংবা ভুল করে, ইতিকাফ ভঙ্গ হবে। একইভাবে ইতিকাফরত নারী তার ঘরের নির্ধারিত স্থান থেকে বের হবে না। তবে প্রস্রাব, পায়খানা ও জুমার নামাজ আদায় ইত্যাদি ওজরের কারণে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে।
ইতিকাফের স্থানেই ঘুম ও পানাহার বিধেয়। এর জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন নেই। মসজিদ ভেঙে যাওয়ার কারণে কিংবা জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার কারণে ইতিকাফকারী ব্যক্তি যদি মসজিদ থেকে বের হয়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্য মসজিদে চলে যায়, তবে তার ইতিকাফ ফাসিদ বা ভঙ্গ হবে না। জান বা মালের ক্ষতির আশঙ্কা হলে একই বিধান প্রযোজ্য হবে। অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার জন্য, কোনো মৃত ব্যক্তিকে দেখার উদ্দেশ্যে কিংবা তার জানাজা আদায়ের জন্য ইতিকাফ হতে বের হলে ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। তবে কেউ ইতিকাফের নিয়তের সময় যদি রোগীর সেবা, জানাজার নামাজ ও ইলমের মজলিসে যাওয়ার মানত করে রাখে, তাহলে তার জন্য এসব জায়েজ হবে।
লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান