বিশ্ব ক্রিকেটে চলমান অচলাবস্থার অবসানে সমঝোতার ইঙ্গিত মিলছে। আইসিসি ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) মধ্যে নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ভারত এবং আইসিসি-বিসিসিআই ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গেও আলোচনার বিষয়টি এখন আর গোপন নেই। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কথাবার্তা এখন আবেগনির্ভর নয়, বরং বাস্তবমুখী ও আইনি কাঠামোর ভেতরেই এগোচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় আইসিসি প্রথম যে প্রশ্নটি তুলেছে, তা হলো জনসংযোগ বা ভাবমূর্তি সংক্রান্ত নয়। বরং আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে তারা জানতে চেয়েছে—একটি ম্যাচের ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ ধারা প্রয়োগের যৌক্তিকতা কী, যখন পুরো টুর্নামেন্ট চালু রয়েছে। আইসিসির এই প্রশ্নই ইঙ্গিত দিচ্ছে, আলোচনার টেবিলে বিষয়টি এখন গভীর পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পিসিবির অবস্থানও একমাত্রিক নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, বিদ্যমান চুক্তির শর্ত এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমান আচরণের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের যুক্তির স্তর একাধিক। ফলে আলোচনাও সহজ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতা আসতে পারে—কিন্তু সেটি যদি কেবল ভেন্যু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ বা সম্প্রচারমূল্য রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি হবে ক্রিকেটের জন্য আত্মঘাতী। কারণ, ক্রিকেট শুধু অর্থনৈতিক হিসাবের খেলা নয়। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই নতুন সমঝোতায় কিছু মৌলিক শর্ত স্পষ্টভাবে লিখিত আকারে যুক্ত করার দাবি উঠেছে। শুধু ইঙ্গিত বা ভদ্রতার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না, ম্যাচ ডে আচরণবিধি হতে হবে বাধ্যতামূলক।
প্রস্তাবিত শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—ম্যাচের আগে ও পরে আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময়, আম্পায়ার ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রতি পূর্ণ সম্মান, স্বাভাবিক সংবাদমাধ্যম কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং পুরস্কার ও উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি। এগুলোকে ‘হলে ভালো’ নয়, বরং চুক্তির অংশ হিসেবে লঙ্ঘনযোগ্য ও শাস্তিযোগ্য করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, খেলাকে রাজনৈতিক নাটক, কৃত্রিম বৈরিতা কিংবা নির্বাচিত শালীনতার হাতিয়ার বানালে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে খেলাটাই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এমন এক জায়গা, যেখানে এখনো খেলাধুলা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা রাখতে পারে যদি তাকে পরিচ্ছন্ন রাখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে—ক্রিকেট কি যুদ্ধের বিকল্প মঞ্চ হয়ে উঠবে, নাকি প্রতিযোগিতার মধ্যেও মানবিকতার জায়গা ধরে রাখবে? সমঝোতা যদি আসে, তবে সেটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা ক্রিকেটের মৌলিক সম্মানবিধি ফিরিয়ে আনবে। অন্যথায়, সমঝোতার নামে আত্মসমর্পণ ক্রিকেটকে আরো গভীর সংকটে ঠেলে দেবে।
এখন দেখার বিষয়—আইসিসি ও সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলো ক্রিকেটকে আদৌ ক্রিকেট হিসেবে রাখতে চায় কি না।