হোম > খেলা > ক্রিকেট

স্কোরবোর্ড বলছে এই বিসিবির ‘গেম ইজ ওভার’!

এম. এম. কায়সার

একজন বা দুজন নয়। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত সংখ্যাটা দাঁড়াল সাতজনে।

-এখন পর্যন্ত?

সামনে তাহলে সংখ্যাটা আরো বাড়ছে? এ প্রশ্নের উত্তরে বিসিবির পরিচালক যে হাসি দিলেন, গোয়েন্দা উপন্যাসে সেই হাসির বর্ণনাকে বলে রহস্যময় হাসি! একে একে বিসিবি থেকে সাত পরিচালক পদত্যাগ করেছেন এবং কি আশ্চর্য, সবাই এই পদত্যাগের অভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন। বলেছেন, ব্যক্তিগত কারণে এই পদত্যাগ!

চলুন এবার হিসাব মেলাই।

যখন একই কারণ দেখিয়ে একে একে সাত পরিচালক পদত্যাগ করেন, তখন সেটিকে আর নিছক ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। ধারাবাহিক এই সরে দাঁড়ানো বরং স্পষ্ট করে দেয়-এ ঘটনা আকস্মিক নয়, হঠাৎ জোসের বসে কেউ এমন সিদ্ধান্ত নেবে না। তাছাড়া জায়গাটা যখন বিসিবির মতো আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ, তখন মন চাইল আর খেয়াল-খুশিমতো এই চেয়ার কেউ ছেড়ে দেবে- বিষয়টি এত সহজ কিছু নয়। একযোগে বিসিবির ওইসব পরিচালকের পদত্যাগের বিষয়টি দেখে একটি শব্দ খুব মনে পড়ছে-‘প্যাটার্ন’।

একই ভাষ্য, একই অজুহাত, একই সময়ে পদত্যাগ—এ সবকিছুকে দূর থেকে মনে হতে পারে একটি নিঃশব্দ প্রতিবাদ। তবে বিশ্লেষণ জানাচ্ছে, এই শব্দের প্রতিধ্বনি কিন্তু প্রচণ্ড! এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে পুরো বিসিবি দূর সমুদ্রের মাঝে একটি ভাসমান জাহাজ। যে জাহাজ ডুবছে ক্রমশ! চারধারের মাইক থেকে সতর্কবাণী আসছে অ্যাবানডেন্ড শিপ! সব মিলিয়ে বিসিবির চিত্র এখন অনেকের চোখে এক ‘পরিত্যক্ত জাহাজ’। যেখানে দিকনির্দেশনা অস্পষ্ট, নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ, আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত। পরিচালকরা যেন সেই জাহাজ ছেড়ে নিরাপদ তীরে ওঠার চেষ্টা করছেন। এই পদত্যাগগুলো কেবল ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়; এগুলো প্রতিষ্ঠানের গভীর সংকটে থাকার সুস্পষ্ট লক্ষণ।

সাত পরিচালকের পদত্যাগ প্যাটার্নের ধরন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি গভীর কার্যকারণ সম্পর্কের ফল। সাত পরিচালক আলাদা আলাদা ব্যক্তি হলেও তাদের সিদ্ধান্ত যেন এক সুতোয় গাঁথা। বিসিবির অভ্যন্তরে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ‘ব্যক্তিগত কারণ’ আসলে একটি আড়াল, আর প্রকৃত কারণ সবার কাছেই প্রায় স্পষ্ট। ২৫ পরিচালকের বোর্ডে সাতজনের পদত্যাগ কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বার্তার দিক থেকেও গভীর। বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল কি সেই ম্যাসেজ ডিকোড করতে পেরেছেন?

বিসিবির নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, সমন্বয়ের অভাব এবং নীতিগত স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে ভেতরে ভেতরে যে ক্ষোভ জমছিল, তা আর আড়ালে থাকেনি। পদত্যাগগুলো যেন সেই জমে থাকা ক্ষোভের সম্মিলিত স্বাক্ষর। নেতৃত্বে আস্থাহীনতা যখন পরিচালনা পর্ষদের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতি ভেঙে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বিসিবিতে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা বোর্ড নির্বাচন। নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু বিসিবির পক্ষ থেকে সে উদ্যোগের বিরোধিতা এবং পাল্টা হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামনে আনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। সরকারের সঙ্গে বোর্ডের এই টানাপোড়েন প্রশাসনিক প্রজ্ঞার পরিচয় নয়; বরং আত্মহত্যার মতোই বোকামো সিদ্ধান্ত ছিল।

মাঠের ক্রিকেটেও বর্তমান বোর্ড এই প্রশাসনিক দুর্বলতায় ভেঙেচুরে কাহিল। বিশ্বমঞ্চে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা, ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় স্থবিরতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব—সব মিলিয়ে বোর্ডের কৌশলগত ব্যর্থতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ক্রিকেট উন্নয়নের বদলে পরিচালকদের মধ্যে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও ইগো সমস্যা বিসিবিকে হাস্যকর করে তুলেছে।

ক্রিকেট কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষায় বিসিবি ভয়াবহভাবে ব্যর্থ। এক দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি—এমন ফালতু পরিকল্পনায় বিসিবি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় বন্ধুহীন! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়; সেখানে অদূরদর্শী অবস্থান বোর্ডকে একঘরে করে দিতে পারে।

উদাহরণ চান?

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার ভেন্যু বদলের বিষয়ে আইসিসির ভোটাভুটিতে ১৪-২ ভোটে বাংলাদেশের হারই যে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

পরিচালকদের একটি অংশের বেফাঁস মন্তব্য, বিতর্কিত আচরণ এবং বোর্ডকে ব্যক্তিগত প্রভাব বলয়ে আনার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো বিব্রতকর করেছে। একটি জাতীয় ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান যখন ব্যক্তিস্বার্থের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, তখন তার মর্যাদা অনিবার্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিসিবি সেই সংকটেই দাঁড়িয়ে। বর্তমান সরকারের সঙ্গে বিসিবির সম্পর্কের শীতলতাও এখন প্রকাশ্যে। ফলে ক্রীড়া প্রশাসনে সমন্বয়ের বদলে দ্বন্দ্বের চিত্র ফুটে উঠছে বারবার।

এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতিগত সংস্কার। নেতৃত্বে আস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় দূরদর্শিতা দেখানো এখন সময়ের দাবি। নইলে পদত্যাগের এই ঢেউ হয়তো আরো বড় ঝড়ের পূর্বাভাস হয়ে থাকবে।

ম্যাচ জিততে শেষ ছয় ওভারে যখন ১৫০ রান দরকার, আর ব্যাটিংয়ে কেবল লেজের সারির ব্যাটসম্যান—তখন ম্যাচের ফল জানার জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক অপেক্ষাই বাকি থাকে। স্কোরবোর্ড তখনই পরাজয়ের গল্প বলে দেয়; শেষ বল পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় শুধু নিয়মের খাতিরে। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদসহ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থাও যেন ঠিক তেমনই। এই ‘ম্যাচ’ যে তারা হেরে বসেছে, তা ক্রমশ স্পষ্ট। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। বলাই যায়—গেম ইজ ওভার।

আর এই হারের কেন্দ্রে যে কারণটি বারবার ফিরে আসে, তা হলো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়া। নিজ পছন্দের কাউন্সিলর বাছাই, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, ই-ভোটিং নিয়ে অভিযোগ, ছক সাজানো নির্বাচন—সব মিলিয়ে গত বছরের ৬ অক্টোবরের নির্বাচন এমনভাবে কলুষিত করা হয়েছে যে, সেই প্রক্রিয়া থেকে জন্ম নেওয়া বোর্ডের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল। এমন বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে তাও আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসার মধ্যে কোনো মর্যাদা থাকে না। জন্মই আমার আজন্ম পাপ-বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের গায়ে এখন যেন এই কলঙ্ক লেপ্টে আছে!

আইসিসিকে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠাবে এনএসসি

বিসিবি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদন জমা, ডাকে সাড়া দেননি আসিফ মাহমুদ

ব্যাংকার্স ক্লাব ক্রিকেটে ছক্কা বৃষ্টি

বিসিবি ছেড়ে ‘পালাচ্ছেন’ পরিচালকরা

আরও এক পরিচালকের পদত্যাগ

ফুটবলের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ক্রিকেটাররাও

আমিরকে ছাড়িয়ে টি-টোয়েন্টিতে পেসারদের শীর্ষে মুস্তাফিজ

ইমনের ঝড়ো ব্যাটিংয়ের পর মুস্তাফিজ ম্যাজিকে জিতল লাহোর

ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে হতাশ ক্রিকেটাররা

ব্যাংকার্স ক্লাব ক্রিকেটের উদ্বোধনী দিনে রান বন্যা