নতুন সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক ফুটবলার এবং জাতীয় দলের অধিনায়ক আমিনুল হক। ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক পরিবর্তনে চারধার থেকে সবাই অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও (বিসিবি) নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রশাসনের শুভযাত্রাকে বিসিবি কর্তারা হাসিমুখে বরণ করলেও বুকের বল (শক্তি) তাদের কমে গেছে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর আমিনুল হক প্রথম যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা বিসিবিকেন্দ্রিক। ক্রীড়া সাংবাদিকদের বিসিবিতে প্রবেশে যে অন্যায্য ও অন্যায় নির্দেশনা দিয়েছিল বিসিবি, সেই বাজে সিদ্ধান্ত ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনের প্রথম প্রহরেই বাতিল করে দিয়েছেন আমিনুল হক। বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফোন করে তিনি জানিয়ে দেন, নিরাপত্তার ইস্যু তুলে সাংবাদিকদের বিসিবিতে প্রবেশের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল- সেটা বাতিল করতে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর এই যৌক্তিক নির্দেশনা প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু কলজের পানি শুকিয়ে গেছে বিসিবির কয়েকজন পরিচালকের। কারণ, যে বিতর্কিত ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে এসব পরিচালক বিসিবিতে এসেছেন, তাতে গলা উঁচু করে কিছু বলার সাহসই যে তাদের নেই! আর তাই নতুন ক্রীড়া প্রশাসনের আগমন এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আমিনুল হকের দায়িত্ব নেওয়ার পরের মুহূর্ত থেকেই বিসিবিজুড়ে সতর্কীকরণ অ্যালার্ম বাজছে ‘রেড অ্যালার্ম’! সম্ভাব্য অদল-বদলের শঙ্কায় বিসিবি পরিচালনা পরিষদে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
গত বছরের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় বিসিবির নির্বাচন। চরম বিতর্কিত এবং একতরফা সেই নির্বাচন শেষে সভাপতি হিসেবে বিসিবির দায়িত্ব পান সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বর্তমান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক তখন থেকেই বিসিবি নির্বাচনে সে সময়কার সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন। এমনকি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এখনো বিসিবির নির্বাচন নিয়ে একই ভাবনায় আছেন তিনি।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া এবং ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের কাউন্সিলর ইশরাক হোসেনও বারবার অভিযোগ তুলেছেন সবশেষ বিসিবি নির্বাচন নিয়ে। তিনিও অভিযোগ করেন, বিসিবির সবশেষ নির্বাচন হয়েছে সরকারি হস্তক্ষেপে। বিএনপি সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে স্পষ্ট, বিসিবিতে রদবদল আসতে যাচ্ছে। তবে সেই রদবদল যে সরকারি হস্তক্ষেপে হবে না- সেটা স্পষ্ট।
সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগে ইতোমধ্যে মামলাও করেছেন বিসিবি নির্বাচনে বিরোধী পক্ষে থাকা ক্লাব সংগঠকরা। আপাতত আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। সে অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে জানান বিরোধে পক্ষে থাকা ক্লাব সংগঠকরা। পাশাপাশি সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগে আইসিসি থেকে যেন কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা না আসে, সেদিকেও নজর রাখতে চান তারা।
বিরোধী পক্ষ যখন আদালতের রায়ের অপেক্ষায়, তখন বর্তমান পরিচালকরা কি ভাবছেন? একাধিক বিসিবি পরিচালকের সঙ্গে কথা হয় আমার দেশ-এর এই প্রতিবেদকের। বেশিরভাগ পরিচালকই এ মুহূর্তে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর ভাবনা নিয়ে কোনো মন্তব্য বা মতামত জানাতে নারাজ। তবে তাদের কথায় এটা পরিষ্কার- আমিনুল হক নিজের করা অভিযোগ নিয়ে কাজ করবেন। তাতে বিসিবিতে রদবদলের যে শঙ্কা আছে, সেটা সত্যি হতে পারে বলে আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
বিসিবির পরিচালক ও বোর্ডের সহসভাপতির দায়িত্বে থাকা শাখাওয়াত হোসেন আমার দেশকে বলেন, ‘সরকার যা মনে করবে, সেটাই হবে। এসব নিয়ে আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি না।’ আরেক সহসভাপতি ফারুক আহমেদ বলেন, ‘এখনই এসব বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না। গতকাল (পরশু) তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। মাত্রই আমিনুল হক দায়িত্ব নিলেন। অফিস করলে, কাজ শুরু করলে তারপর বোঝা যাবে কী হচ্ছে।’
যেহেতু বিসিবি নির্বাচনের সময়কাল থেকেই আমিনুল হক সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ করছেন, সেহেতু বোর্ডের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারেÑতা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন দুই সহসভাপতির কেউই। তবে তাদের কথাবার্তার ধরনে স্পষ্ট যে, বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত তারা দুজনেই।
শুধু বিসিবির এই দুই পরিচালকই নন, অন্যান্য পরিচালকও ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তিত। প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি না হলেও তারা শঙ্কায় আছেন যে কোনো মুহূর্তে ক্ষমতা হারানোর। এমন শঙ্কা সত্যি হলে নির্বাচন করে ফের বিসিবিতে ফিরে আসাটাও যে কঠিন তাদের জন্য, সেটাও বিশ্বাস করেন তারা। কেন ফেরত আসা কঠিন, সে বিষয়ে ক্লাব কোটায় নির্বাচিত এক পরিচালক জানান, অন্য ক্লাব অফিসিয়ালদের সঙ্গে সম্পর্কটা এখন তলানিতে। তারা তো এখন আর আমাদের রাখবে না।
আগুনের ধোঁয়ার গন্ধ পেলেই ঠিক যেভাবে সুরম্য ভবনে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠে, তেমন বিপদের অ্যালার্মই বাজছে এখন বিসিবির চারধারের সবকিছুতে!