বাংলাদেশ ২৭৮। সিলেট টেস্টের প্রথম দিনের স্কোরকার্ড সবকিছু বোঝাচ্ছে না। বাংলাদেশের ২৭৮ রানকে আপনার খুব বড় স্কোর মনে নাও হতে পারে। কিন্তু যে পরিস্থিতি থেকে উঠে, ঘুরে এবং রুখে দাঁড়িয়ে এই স্কোর করেছে দল, তাতে এই রানের মাহাত্ম্য আরো অনেক বড়। ১১৬ রানে ছয় উইকেট হারানো দল ইনিংস শেষ করেছে ২৭৮ রানে। যে স্কোরে লিটন দাসের একাই সঞ্চয় ১২৬ রান। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ৩০-এরও কম! শুরুর ছয়জনের চেয়ে শেষের চারজনের জুটিতে বেশি রান মিলল। যার পুরো কৃতিত্ব ওই একজনেরই- লিটন দাস। ম্যাচের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল সিলেটের বৃষ্টি। কিন্তু কি আশ্বর্য, টেস্টের প্রথম দিনের পুরোটা সময় এক ফোঁটা বৃষ্টির দেখাও মিলল না। যা মিলল, তার নাম পাকিস্তানের তেজি পেস বোলিং এবং জবাবে লিটন দাসের ক্লাসিক এক সেঞ্চুরি।
সবুজ উইকেট। মেঘলা আকাশ। ঝিরিঝিরি বাতাস। পেস বোলিংয়ের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি। এমন কন্ডিশনে সিলেট টেস্টে টসে জিতে বোলিং বেছে নিল পাকিস্তান। অধিনায়কের সিদ্ধান্তকে যথাযথ প্রমাণ করলেন পাকিস্তানের শুরুর দুই পেসার। মোহাম্মদ আব্বাস ও খুররম সাজ্জাদ কন্ডিশনের সহায়তায় বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন ধসিয়ে দিলেন। স্কোরবোর্ডে তখনো কোনো রান জমা পড়েনি; কিন্তু উইকেট পড়ে গেল! ম্যাচের দ্বিতীয় বলেই শূন্য রানে উইকেট হারায় বাংলাদেশ। সেই সংকট পরের উইকেটে কাটলেও স্বস্তিটা বেশিক্ষণ টেকেনি। ১১৬ রানের শুরুর ছয় উইকেট হাওয়া! শঙ্কা হচ্ছিল দেড়শও পার হবে কি না দলের স্কোর। সেই জটিলতা সরিয়ে লিটন দাস যে সেঞ্চুরির ইনিংস খেললেন, তার বর্ণনায় আপনি অসাধারণ, অনন্য, অসম্ভব সুন্দর, ক্লাসিক্যাল- এমন আরো অনেক গুণবাচক শব্দ যোগ করতে পারেন।
সিলেট টেস্টের প্রথম দিনের সেরা সৌন্দর্য হয়ে রইল লিটনের ব্যাটে ঝলমলে ১২৬ রানের সেঞ্চুরির ইনিংস।
শুরুতেই ধস। মাঝে টলে গিয়ে এলেবেলে এবং শেষে প্রতিরোধ। এ টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের প্রথম দিনের সারসংক্ষেপ এটাই। এ মাঠে এর আগের টেস্ট ম্যাচে দলের সর্বোচ্চ ১৭১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস ছিল ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়ের, গেল নভেম্বরে। সেই মাঠে পরের টেস্টে শূন্য রানে ফিরলেন জয়। তাও আবার ম্যাচের দ্বিতীয় বলে। অফস্টাম্পের ওপর থাকা কিছুটা শর্ট বলে ব্যাট দিয়ে উঁকি মারা একটা চেষ্টা করলেন জয়। বল ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপে গেল। দ্বিতীয় স্লিপে নিচু হয়ে আসা ক্যাচটি দারুণ দক্ষতায় হাতে নিলেন সালমান আগা। স্কোরবোর্ডে কোনো সঞ্চয়ের আগেই ক্ষতি বাংলাদেশের!
এমন দুঃসহ পরিস্থিতি দেখে অবশ্য ঘাবড়ে গেলেন না জীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ হাসান তামিম। এক পাশে অভিজ্ঞ মুমিনুল হক এবং অন্য প্রান্তে অভিষিক্ত তানজিদ হাসান তামিম। এ দুজন বাংলাদেশের স্কোরকে সামনে বাড়ান। পেস বোলিংয়ের পারফেক্ট কন্ডিশনে পাকিস্তানের পেসাররা তেতে উঠেছিলেন। কিন্তু তানজিদ ডেড ডিফেন্সে না গিয়ে কৌশল বদলালেন। পাল্টা আক্রমণে গেলেন। নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিংই বেছে নিলেন। টেস্ট ক্রিকেটে নিজের প্রথম যে বাউন্ডারি হাঁকালেন, সে ছবিটা সত্যিকার অর্থেই মনে রাখার মতো- ক্লাসিক্যাল কাভার ড্রাইভ। ভালো খেলতে থাকা তানজিদ হাসান হঠাৎই ভুলটা করে বসলেন। জায়গায় দাঁড়িয়ে পুল শট খেলার চেষ্টায় তার উইকেট গেল। ফিরতি ক্যাচটি নিলেন মোহাম্মদ আব্বাস। মুমিনুলকে যে বলে খুররম সাজ্জাদ বোল্ড করলেন, সেটা ছিল দিনের সেরা ডেলিভারি! অফস্টাম্পের বাইরে পড়া বল সুইংয়ের মোচড়ে ভেতরে ঢুকল। মুমিনুলের ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক গলে স্টাম্প উপড়ে দিল। নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে তিন উইকেটে ৬৩ রানের সমস্যার সমাধান মিলছিল। কিন্তু দুজনেই উইকেটে সেট হয়ে আউট হয়ে গেলেন। ব্যাট ব্যাক লিফট করে বলের লাইন থেকে সময়মতো সেটা সরাতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন শান্ত ৭৪ বলে ২৯ রান তুলে। খুররম সাজ্জাদের ইনসুইংয়ে মুশফিক রহিম এলবিডব্লু হলেন ৬৪ বলে ২৩ রান করে। খানিক বাদে খুররমের বাউন্সার সামাল দিতে পারলেন না মেহেদি হাসান মিরাজও। যে কায়দায় ব্যাটে লাগিয়ে ক্যাচ তুলে মেহেদি আউট হলেন, তাতে স্কোরকার্ডে তার নামের পাশে ‘ভয়ে আউট’- এ লেখাটা আপনি লিখতেই পারেন।
দিনের দ্বিতীয় সেশনে ১১৬ রানে ছয় উইকেট হারিয়ে দুর্দশায় পড়া দল উদ্ধার হয় লিটন দাসের ব্যাটে। সঙ্গী হিসেবে তার সামনে লেজের সারির ব্যাটারদের নিয়ে লিটন খেললেন ১১৬ রানের আলোকিত ইনিংস। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এটি তার তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি এবং ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ। শেষের সারিতে তাইজুল ও শরিফুল খুব বেশি রান করেননি। কিন্তু অনেক বল খেলে লম্বা সময় উইকেটে থেকে লিটনকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের ইনিংস উদ্ধারে সে সময় সেটাই ছিল তাদের আসল কাজ।
আজ দ্বিতীয় দিন লেজের সারির ব্যাটারদের তাদের মূল কাজ বোলিংয়ে ফিরতে হচ্ছে। আর এই দায়িত্বটা বাড়তি দক্ষতার সঙ্গে পালন করলেই বাংলাদেশের ২৭৮ রানকে আরো স্বস্তিদায়ক মনে হবে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর : বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস (প্রথম দিন শেষে) : ২৭৮/১০ (৭৭ ওভারে, তানজিদ ২৬, মুমিনুল ২২, শান্ত ২৯, মুশফিক ২৩, লিটন দাস ১২৬, মিরাজ ৪, তাইজুল ১৬, তাসকিন ৭, শরিফুল ১২, আব্বাস ৩/৪৫, খুররম সাজ্জাদ ৪/৮১, হাসান আলী ২/৪৯, সাজিদ ১/৯৬)।