কর্তৃত্ব, প্রভাব, মুন্সিয়ানা, মাস্টারি, এমনকি দাদাগিরি শব্দটা আপনি যোগ করতে পারেন। এর সবগুলোই এ সিরিজে বাংলাদেশ দেখাচ্ছে পাকিস্তানের ওপর। ব্যাটে-বলে-ফিল্ডিংয়ে-নেতৃত্বে কিংবা রিভিউ নেওয়াতে; একটি টেস্ট ম্যাচে এগিয়ে থাকার জন্য মূলত যা যা আবশ্যিক গুণাবলি প্রয়োজন, সেসব অনুষঙ্গের প্রতিটি ধাপে, স্তরে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে রয়েছে পাকিস্তানের চেয়ে।
ঢাকার পর সিলেট টেস্টেও এই অবস্থান ও পরিস্থিতি এখন এমনই!
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের জবাবে পাকিস্তান এখানে শেষ ২৩২ রানে। প্রথম ইনিংসে ৪৬ রানের লিড পাওয়া বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে তিন উইকেটে ১১০ রান তুলে সব মিলিয়ে এগিয়ে আছে ১৫৬ রানে। এটি দ্বিতীয় দিন শেষের হিসাব। আজ তৃতীয় দিনের ব্যাটিংয়ে এই লিড আরো অনেক দূর নিয়ে যেতে চায় স্বাগতিকরা।
কত দূরে?
এত দূরে, যা পাকিস্তানের সাধ্যের বাইরে। এ প্রসঙ্গে রানের কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানালেন না নাহিদ রানা। বললেন, ‘তৃতীয় দিনের পুরোটা আমরা ব্যাটিং করতে চাই। তারপর আরো দুদিন রয়েছে।’
লিড এখনই দেড়শর ওপরে। গোটা দিন ব্যাট করলে সেটা ৪০০-এর কাছাকাছি গিয়ে ঠেকবে। পাকিস্তানের এই দল ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের তেজি বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে সেই রান তুলে নেবে- এমন সম্ভাবনা আর বাজির দর খুবই কম! একটু জানিয়ে রাখি, ঢাকা টেস্টের শেষ ইনিংসে পাকিস্তান গুটিয়ে গিয়েছিল ১৬৩ রানে। তাও আবার মাত্র ৫৩ ওভারে। সিলেটে প্রথম ইনিংসে তারা শেষ ২৩২-এ, ওভার খেলল সামান্য বেশি, ৫৭.৪। চলতি সফরে টেস্ট ব্যাটিংই যেন ভুলতে বসেছে পাকিস্তান। টানা এমন ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বাবর আজমের ব্যাখ্যাটি এমন-‘আমাদের ব্যাটিংয়ের জুটিটা আসলে জমছে না। দলের সিনিয়রদের আরো দায়িত্ববান হতে হবে।’
ম্যাচের প্রথম দিন বাংলাদেশকে ২৭৮ রানে আটকে দিয়ে পাকিস্তানের পেসার খুররম শাহজাদ এ উইকেটের গুণাগুণে প্রশংসা করে জানিয়ে গিয়েছিলেন, এখানে তারা প্রথম ইনিংসে ৪০০ বা সাড়ে ৪০০ রান করতে চান। করতে চাওয়া আর করে দেখানোর মধ্যে পার্থক্য যে বিশাল, সেই চিরায়ত সত্য জানিয়ে পাকিস্তান এ উইকেটে গুটিয়ে গেল ২৩২ রানে। মিডল অর্ডারে বাবর আজম ছাড়া বাকিরা সেই আগের মতোই ফ্লপের তালিকায়। ৯ নম্বর ব্যাটার সাজিদ খান শেষদিকে চার-ছক্কায় ২৮ বলে ৩৮ রান তোলায় পাকিস্তানের ইনিংস কোনোক্রমে ২০০ পার হলো।
সকালে দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট হারায় পাকিস্তান। তাসকিন তার করা প্রথম দুই ওভারে দুটি উইকেট তুলে নেন। নাহিদ রানা, মিরাজ ও তাইজুল পাকিস্তানের মাঝের এবং লেজের সারির ব্যাটিং ছেঁটে দেন। এবারও পাকিস্তানের ইনিংস টিকল মাত্র দুই সেশন। ৪৬ রানে পিছিয়ে থেকে দিনের শেষ সেশনে বোলিংয়ে নামে পাকিস্তান। এ ম্যাচের ফলাফল হতে এখনো বাকি বেশ। কিন্তু পাকিস্তান দলের শারীরিক ভাষা, ধসে পড়া আত্মবিশ্বাস ও নুইয়ে পড়া পারফরম্যান্স জানান দিচ্ছে এ টেস্টেও হার মেনে নিচ্ছে তারা!
ঢাকায় হারের পর বাবর আজমের ওপর আস্থা রেখে সিলেট টেস্টে ভঙ্গুর ব্যাটিংয়ের সমাধান খোঁজে পাকিস্তান। সকালের সেশনেই অভিজ্ঞ বাবর আজমকে ব্যাট হাতে নামতে হয়। এই উইকেটে বাংলাদেশের বোলিং সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে তিনিই মূলত সামাল দেন এবং শুরুতে রক্ষণে বাড়তি নজর দেন। উইকেটে সেট হওয়ার পর নিজের স্বাভাবিক খেলায় ফেরেন। কিন্তু সমস্যা হলো ব্যাটিংয়ে অপর প্রান্ত থেকে সমর্থন পেলেন কই? অধিনায়ক শান মাসুদ, সাউদ শাকিল, সালমান আগা এবং মোহাম্মদ রিজওয়ান- মিডল অর্ডারের এই চার সিনিয়রের সম্মিলিত সঞ্চয় মাত্র ৬৩!
সিলেটে স্বস্তির দ্বিতীয় দিনে তানজিদ হাসান তামিমের অভিষেক টেস্ট শেষ হলো অস্বস্তি নিয়েই। যে কায়দায় তানজিদ আউট হলেন, সেটা টেস্ট ওপেনারের জন্য সুখকর কিছু নয়। ব্যাটিং টেকনিকে তার ঘাটতি স্পষ্ট। প্রথম ইনিংসে ২৬, দ্বিতীয় দফায় চার। টেস্ট অভিষেকে মনে রাখার মতো কিছু করতে পারলেন না তানজিদ। অপর ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয় প্রথম ইনিংসে শূন্য রানের ব্যর্থতা মুছলেন হাফ সেঞ্চুরি দিয়ে। কিন্তু উইকেটে সেট হয়ে তিনি যে শট খেলে ক্যাচ দিলেন, সেটা তার কৃতিত্ব কেড়ে নিচ্ছে।
সফল একটি দিনে বড় দুঃখ হয়ে রইল দিনের শেষ ওভারে মুমিনুল হকের আউট। খুররম সাজ্জাদের দুরন্ত গতির বলটি ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে লাইন থেকে ব্যাট সরাতে পারলেন না মুমিনুল। ৬০ বলে তার ধৈর্যশীল ৩০ রানের সমাপ্তি ওখানেই।
তবে বড় রানে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানের ভোগান্তির আরেক অধ্যায় শুরু হচ্ছে আজ তৃতীয় দিনে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ২৭৮ ও দ্বিতীয় ইনিংস : ২৬.৪ ওভারে ১১০/৩ (জয় ৫২, তানজিদ ৪, মুমিনুল ৩০, শান্ত ১৩*; আব্বাস ১/২৯, শাহজাদ ২/১৯)।
পাকিস্তান প্রথম ইনিংস : ৫৭.৪ ওভারে ২৩২ (আজান ১৩, মাসুদ ২১, বাবর ৬৮, সালমান ২১, রিজওয়ান ১৩, হাসান ১৮, সাজিদ ৩৮, শাহজাদ ১০; তাসকিন ২/৩৭, মিরাজ ২/২১, নাহিদ ৩/৬০, তাইজুল ৩/৬৭)।
-দ্বিতীয় দিন শেষে