নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের এক সোনালি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কিউই ক্রিকেটের চেনামুখ হয়ে থাকা কেন উইলিয়ামসন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলমান টেস্ট সিরিজের মাঝপথেই ৩৫ বছর বয়সী এই ব্যাটার জানিয়ে দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাকে।
ফলে লর্ডস টেস্টই হয়ে থাকল উইলিয়ামসনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজের বাকি দুই টেস্টেও খেলবেন না তিনি। তার এই ঘোষণার মাধ্যমে সব সংস্করণ মিলিয়ে ৩৭৮ ম্যাচের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটল।
বিদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে উইলিয়ামসন জানিয়েছেন, এটি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গত কয়েক দিনে উপলব্ধি করেছেন, বিদায় বলার জন্য এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে গর্বিত উইলিয়ামসন বলেছেন, নিউজিল্যান্ডের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে তিনি সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতি নিজের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শতভাগ দিতে না পারলে খেলা চালিয়ে যাওয়াটা তার কাছে সঠিক মনে হয়নি। তিনি আরও বলেন, নিজের সিদ্ধান্তে এবং সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিতে পারছেন বলেই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন।
লর্ডসে শেষ ম্যাচটিও অবশ্য স্মরণীয় হয়ে থাকেনি উইলিয়ামসনের জন্য। সিরিজের প্রথম টেস্টে নিউজিল্যান্ড ১১৫ রানে হেরেছে ইংল্যান্ডের কাছে। প্রথম ইনিংসে মাত্র দুই বল খেলে শূন্য রানে আউট হন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসেও বড় কিছু করতে পারেননি, করেন ১৮ রান। শেষ পর্যন্ত দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ১৮ রান করেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ শেষ করতে হলো তাকে।
তবে পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে উইলিয়ামসনের নাম নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটারের তালিকায় অনেক উঁচুতেই থাকবে। ১১০ টেস্টে ৩৩টি সেঞ্চুরি ও ৩৮টি অর্ধশতকে ৫৪.০৬ গড়ে করেছেন ৯৫১৫ রান। ওয়ানডেতেও ছিলেন সমান সফল। ১৭৫ ম্যাচে ১৫টি সেঞ্চুরি ও ৪৭টি ফিফটিতে ৭২৫৬ রান করেছেন ৪৮.৬৯ গড়ে।
অধিনায়ক হিসেবেও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দখল করে আছেন তিনি। ৪০ টেস্ট, ৯১ ওয়ানডে এবং ৭৫ টি-টোয়েন্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। তার নেতৃত্বেই ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল নিউজিল্যান্ড। যদিও নাটকীয় সেই ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয়েছিল, তবু পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জিতেছিলেন উইলিয়ামসন।
দুই বছর পর ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তার নেতৃত্বে ফাইনালে পৌঁছায় কিউইরা। তবে অধিনায়ক হিসেবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন নিঃসন্দেহে ২০২১ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। সাউদাম্পটনে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ৪৯ ও অপরাজিত ৫২ রানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে নিউজিল্যান্ডকে প্রথম বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দেন তিনি।
ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলিও সমৃদ্ধ উইলিয়ামসনের। চারবার জিতেছেন নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান স্যার রিচার্ড হ্যাডলি মেডেল। ২০১৯ সালে হয়েছেন আইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ খেলার সংখ্যার দিক থেকে নিউজিল্যান্ডের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ ক্রিকেটার হিসেবেও বিদায় নিচ্ছেন তিনি।
তার অবসরের ফলে আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপেও দেখা যাবে না এই কিংবদন্তি ব্যাটারকে। ফলে একটি প্রজন্মের কাছে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখটি আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যাট হাতে নামবেন না।
তবে বিদায়ের ক্ষণেও দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী উইলিয়ামসন। তার বিশ্বাস, বর্তমান নিউজিল্যান্ড দলে প্রতিভার কোনো ঘাটতি নেই এবং বড় কিছু অর্জনের তীব্র ইচ্ছাও রয়েছে খেলোয়াড়দের মধ্যে। দলটির প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেছেন, নিউজিল্যান্ড দল সবসময়ই তার হৃদয়ের খুব কাছের থাকবে।
উইলিয়ামসনের অবসরের পর সিরিজের বাকি দুই টেস্টের জন্য শিগগিরই একজন বিকল্প ক্রিকেটারের নাম ঘোষণা করবে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ১৭ জুন, দ্য ওভালে।