বিশ্বকাপ মানেই নির্দিষ্ট একটি দেশের উৎসব। অন্তত তিন দশক পেরোনো ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’-এ এতদিন এমনটাই দেখেছে দর্শক। একটি জাতির আবেগ, সংস্কৃতি আর আতিথেয়তার প্রদর্শনী মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় মহামঞ্চের মহারণে। কিন্তু ২০২৬ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ লিখতে যাচ্ছে এক ভিন্ন গল্প। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় একসঙ্গে বেজে উঠতে যাচ্ছে মহাযজ্ঞের হুইসেল। তাই এটি কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং তিন সীমান্তের তিন সংস্কৃতি, তিন ভূগোল এবং তিন ভিন্ন ফুটবল ঐতিহ্যের মিলনমেলা।
১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচের বাঁশি বাজতেই শুরু হবে নতুন এক অধ্যায়। যে স্টেডিয়াম একসময় পেলে আর ম্যারাডোনা বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণ করেছিল, সে অ্যাজটেকাই এবার ইতিহাস গড়বে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ উদ্বোধনের ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃতির মালা পরে। এবারের বিশ্বকাপের বিস্তার যেন একটি মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মহাকাব্য। ১৬টি শহর, তিনটি দেশ, শতাধিক ম্যাচ এবং হাজার হাজার কিলোমিটার পথ—সব মিলিয়ে এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লজিস্টিক আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে অধিকাংশ ম্যাচ। নিউ ইয়র্ক—নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, মায়ামি, আটলান্টা, সিয়াটল, কানসাস সিটি ও হিউস্টনের মতো শহরগুলো বিশ্বকাপের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে। কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার এবং মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা ও মনতেরেও নিজেদের রঙে রাঙাবে এ বৈশ্বিক উৎসবকে।
স্টেডিয়ামের দিক থেকেও এটি এক বিস্ময়ের আয়োজন। এনএফএল ও এমএলএসের আধুনিক অবকাঠামো, কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত সুবিশাল অ্যারেনা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবারের বিশ্বকাপকে নতুন মাত্রা দেবে। নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম, যেখানে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে একসঙ্গে ৮০ হাজারের বেশি দর্শক বসতে পারবেন। অন্যদিকে ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়াম আধুনিক ক্রীড়া স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ।
তবে এ মহাযজ্ঞের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও লুকিয়ে আছে এর বিশালতায়। এক শহর থেকে অন্য শহরের দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রে হাজার কিলোমিটারের বেশি। কোনো কোনো দলকে গ্রুপ পর্বেই একাধিক টাইম জোন অতিক্রম করতে হবে। নিউ ইয়র্ক থেকে ভ্যাঙ্কুভার কিংবা মেক্সিকো সিটি থেকে সিয়াটলের দূরত্ব শুধু মানচিত্রে নয়, শারীরিক প্রস্তুতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। খেলোয়াড়দের পুনরুদ্ধার, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তাই কোচদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
আবহাওয়াও হতে পারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জুন-জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত ক্লাব বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরম ও বজ্রঝড় নিয়ে উদ্বেগ দেখা গিয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিফা কুলিং জোন, মেডিকেল সাপোর্ট এবং তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিকল্পনা করেছে। তবে চ্যালেঞ্জের মধ্যেও লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য। কল্পনা করা যাক—একদিন মেক্সিকোর রঙিন রাস্তায় মারিয়াচি সংগীত বাজছে, পরদিন কানাডার শান্ত নগরীতে ফুটবল উৎসব আর কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিশাল স্টেডিয়ামে লাখো মানুষের গর্জন। এমন বৈচিত্র্য আর কোনো বিশ্বকাপে দেখা যায়নি।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি উত্তর আমেরিকার এক সাংস্কৃতিক যাত্রা। তিন দেশের সীমান্ত, ভাষা ও পরিচয়কে ছাপিয়ে ফুটবল এখানে হয়ে উঠতে যাচ্ছে এক অভিন্ন ভাষা। আর ফাইনালের রাতে বিজয়ী দলের ট্রফি হাতে উল্লাস শুধু একটি দলের জয় নয়, হয়ে উঠতে যাচ্ছে তিন দেশের সম্মিলিত স্বপ্নও। এ বিশ্বকাপের গল্প মাঠের ৯০ মিনিটের চেয়েও বড়। ভ্রমণের গল্প, স্থাপত্যের গল্প, সংস্কৃতির গল্প এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার গল্প মিলিয়ে ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহা আসর। যে আসরে তিন সীমান্তের ঢেউ এক হয়ে মিলিয়ে দেবে ৪৮ সীমান্তের উচ্ছ্বাস।