বিশ্বকাপের শেষ চার মানেই শুধু চারটি দেশের লড়াই নয়; এটি চারটি দর্শনের, চারটি মস্তিষ্কের এবং চারটি স্বপ্নের সংঘর্ষ। মাঠে আলো কাড়বেন মেসি, এমবাপ্পে, বেলিংহাম কিংবা ইয়ামাল। কিন্তু ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা চার কোচই আগেভাগে লিখে রাখবেন ম্যাচের অদৃশ্য চিত্রনাট্য। কেউ বিশ্বাস করেন ড্রেসিংরুমের ঐক্যে, কেউ কৌশলের নিখুঁত প্রয়োগে, কেউ ফলকেই সৌন্দর্যের চেয়ে বড় মনে করেন, আবার কেউ সাহসী ফুটবলকে ভবিষ্যতের পরিচয় বলে মানেন। আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি, ইংল্যান্ডের টমাস টুখেল, ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম এবং স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে—বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দাঁড়িয়ে ফুটবল বিশ্বের সেরা চার মাস্টার। তাদের দিকেই আজকের স্পটলাইট।
নীরব বিপ্লবের মাস্টার স্কালোনি
একসময় আর্জেন্টিনার ডাগআউট মানেই ছিল আলোচিত, ক্যারিশম্যাটিক কোচ। সিজার মেনোত্তি, কার্লোস বিলার্দো, মার্সেলো বিয়েলসা কিংবা হোর্হে সাম্পাওলি—প্রত্যেকেরই নিজস্ব নাটকীয়তা ছিল। সেই ধারার বাইরে একেবারেই ভিন্ন লিওনেল স্কালোনি। তিনি আলোচনার কেন্দ্র হতে চান না, কিন্তু তার দলই মাঠে সবচেয়ে জোরে কথা বলে।
২০১৮ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাকে অনেকেই অস্থায়ী ও অনভিজ্ঞ কোচ বলেছিলেন। অথচ কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনা ফুটবলের সংস্কৃতি। কোপা আমেরিকা ২০২১, ফিনালিসিমা ২০২২, বিশ্বকাপ ২০২২ এবং কোপা আমেরিকা ২০২৪ জিতে তিনি গড়ে তুলেছেন আধুনিক আর্জেন্টিনার স্বর্ণযুগ।
জাতীয় দলের হয়ে শতাধিক ম্যাচে স্কালোনির জয়ের হার ৭০ শতাংশের অনেক বেশি। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু ট্রফি নয়, একটি ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলা। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ফরমেশনের বন্দি নন। প্রতিপক্ষের শক্তি বুঝে কখনো ৪-৩-৩, কখনো ৪-৪-২ কিংবা ৪-২-৩-১ ব্যবহার করেন। বলের দখল ধরে রাখার পাশাপাশি দ্রুত ট্রানজিশনেও সমান কার্যকর তার দল।
স্কালোনির দর্শনের মূল কথা একটাই—ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। ড্রেসিংরুমের ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা এবং অহংবোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সংস্কৃতিই আজকের ‘স্কালোনেতা’র সবচেয়ে বড় শক্তি।
ফুটবল মাঠের গ্র্যান্ডমাস্টার টমাস টুখেল
টমাস টুখেল শুধু ম্যাচ পরিচালনা করেন না, ম্যাচের ভেতরেই নতুন ম্যাচ তৈরি করেন। প্রতিপক্ষ যখন একটি পরিকল্পনা বুঝে ওঠে, তখন তিনি নতুন কৌশল সাজিয়ে ফেলেন। যেন দাবার বোর্ডে এক চাল আগেই সব হিসাব কষে রাখেন। প্রতিপক্ষের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে মুহূর্তেই কৌশল বদলে দেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তাই বড় ম্যাচে টুখেলের সিদ্ধান্ত অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্যই বদলে দেয়।
মাইনৎস, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, পিএসজি, চেলসি ও বায়ার্ন মিউনিখে কাজ করে তিনি নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা কৌশলী কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২১ সালে চেলসিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানো তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। শুধু শিরোপাই নয়, তরুণ ফুটবলারদের সেরাটা বের করে আনার ক্ষেত্রেও টুখেলের সুনাম রয়েছে।
ইংল্যান্ডের দায়িত্ব নিয়েও বদলায়নি তার দর্শন। টুখেলের কাছে ফুটবলের মূল শব্দ ‘নিয়ন্ত্রণ’। বলের দখল, প্রেসিং, ম্যাচের গতি—সবকিছুই নিজের দলের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তিনি। পরিস্থিতি অনুযায়ী ৪-২-৩-১, ৩-৪-২-১ কিংবা ম্যাচ চলাকালেই ফরমেশন বদলে ফেলা তার জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রয়োজনে খেলোয়াড়দের অবস্থান বদলে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতেও তিনি দ্বিধা করেন না।
টুখেল দল চালান যুক্তি দিয়ে। তিনি বিশ্বাস করেন, বড় ম্যাচে সৌন্দর্যের চেয়ে ফলটাই শেষ কথা। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপের শেষ চারের এই মঞ্চে তিনি শুধু একজন কোচ নন—তিনি যেন ফুটবলের দাবার বোর্ডে বসে থাকা এক গ্র্যান্ডমাস্টার, যার প্রতিটি চালের পেছনে থাকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। প্রতিপক্ষের এক ভুলের অপেক্ষায় থেকে সেই সুযোগকে জয়ে রূপ দেওয়ার শিল্পটাই টুখেলকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ট্যাকটিশিয়ানে পরিণত করেছে।
একাগ্রতার দার্শনিক দিদিয়ের দেশম
ফুটবল কখনো কখনো কবিতা। আবার কখনো নির্মম বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার সবচেয়ে সফল শিল্পীদের একজন দিদিয়ের দেশম। তার দল সব সময় সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা? সেটাই যেন দেশমের প্রকৃত পরিচয়। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা চার কোচের মধ্যে দেশমই সবচেয়ে অভিজ্ঞ।
খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন, আবার কোচ হিসেবেও ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছেন। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ, ২০২২ সালে রানার্সআপ এবং ২০২৬ সালে আবারও সেমিফাইনাল—টানা তিন বিশ্বকাপে সাফল্য তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই প্রমাণ।
জাতীয় দলের হয়ে দেশমের জয়ের হার ৬০ শতাংশের বেশি। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় তার বাস্তববাদী দর্শন। প্রয়োজন হলে বলের দখল প্রতিপক্ষকে ছেড়ে দেন, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে কাউন্টার অ্যাটাকে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। অকারণে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েন না, আবার অযথা রক্ষণেও গুটিয়ে থাকেন না।
দিদিয়ে দেশম হয়তো সবচেয়ে রোমান্টিক ফুটবল খেলান না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় রোমান্টিকদের চেয়ে বিজয়ীদের নামই বেশি উজ্জ্বল হয়ে থাকে। আর সেই কারণেই, বিশ্বকাপের ‘সেরা চার মাস্টার’-এর একজন হিসেবে দেশমের নাম উচ্চারিত হয় নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভারী কণ্ঠে।
সৌন্দর্য আর সাহসের লুইস দে লা ফুয়েন্তে
একসময় স্পেন মানেই ছিল অন্তহীন পাস আর টিকি-টাকা। লুইস দে লা ফুয়েন্তে সেই দর্শন ভেঙে দেননি; বরং তার সঙ্গে যোগ করেছেন গতি, সরাসরি আক্রমণ ও সাহস। ফলে আজকের স্পেন শুধু বল ধরে রাখে না, সুযোগ পেলেই বজ্রগতিতে আঘাত হানে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা চার কোচের মধ্যে দে লা ফুয়েন্তে সবচেয়ে কম আলোচিত হতে পারেন, কিন্তু তার দলের ফুটবলই সবচেয়ে নান্দনিক।
২০২২ বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব নিয়ে তিনি আস্থা রাখেন নতুন প্রজন্মের ওপর। লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, গাভি, নিকো উইলিয়ামসদের ঘিরে গড়ে তোলেন নতুন স্পেন। ২০২৪ ইউরো শিরোপা এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল প্রমাণ করে, সেই সাহসী সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক।
দে লা ফুয়েন্তের জয়ের হার আন্তর্জাতিক ফুটবলে অন্যতম সেরা। তার দর্শনের মূল শব্দ ‘বিশ্বাস’। তিনি খেলোয়াড়দের সৃজনশীল হওয়ার স্বাধীনতা দেন। স্পেন এখনো বলের দখল ধরে রাখে, তবে সেই দখলের সঙ্গে যোগ হয়েছে হাই প্রেসিং, দ্রুত উইং প্লে, ফুলব্যাকদের ওভারল্যাপ এবং সরাসরি আক্রমণের ধার। বিশেষ করে ইয়ামালের মতো তরুণদের সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব দেওয়াই তার কোচিং দর্শনের প্রতিচ্ছবি।
চারজন কোচ, চারটি দর্শন, চারটি পথ। কিন্তু লক্ষ্য একটাই—বিশ্বকাপের ট্রফি। লড়াইটা শুধু মাঠের ২২ ফুটবলারের নয়; সমান গুরুত্বপূর্ণ ডাগআউটের চার মস্তিষ্কেরও। খেলোয়াড়রা গোল করেন, ম্যাচ জেতান; কিন্তু ইতিহাসের পাতায় অনেক সময় সবচেয়ে বড় গল্পটি লেখা হয় ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মাস্টারের নামেই।